আমাদের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি নাম নয়; আমাদের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি নিঃশর্ত আবেগের নাম। অভাব এবং নানা প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে একমাত্র মেধার উপর ভর করে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্তরা পড়তে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এক বুক আশা আর চোখে সীমাহীন স্বপ্ন নিয়ে।

 

যারা এখানে পড়তে আসে তাদের অধিকাংশই সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে না। সেই শিশুকাল থেকেই পিতা-মাতার কঠোর পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থের সুসম বণ্টন দেখে পরিশ্রমী এবং দায়িত্বশীল মানসিকতা নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রাখে তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর গর্ব এবং অনুপ্রেণার প্রধান হাতিয়ার হলো অদম্য মেধা, কলম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গৌরবময় অতীত ইতিহাস।

 

ইতিহাসের পাতায় পাতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রক্তের লালচে দাগ সময়ের বিবর্তনে মুছে গিয়ে হয় দৃষ্টিগোচর হয় না কিন্তু তা অস্বীকার করার সুযোগ কারোই নেই তা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধ পরবর্তী গন মানুষের অধিকার আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের ভূমিকা ছিল আপোষহীন। শুধু এখানেই শেষ নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ সব সময় সবার জন্য রয়েছে উন্মুক্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাঙ্গণ সর্ব সাধারণের জন্য যতোটা উন্মুক্ত এবং নিরাপদ তা অন্য কোথাও আছে কিনা সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

 

ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রচুর বহিরাগত যান চলাচলে আমাদের স্বাভাবিক চলাফেরা বাধাগ্রস্ত হলেও আমরা তা মানিয়ে নেই। আপনারা যখন কেউ অসুস্থ হয়ে অর্থের অভাবে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তখন আমরা কিছু না ভেবেই দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াই আপনাদের চিকিৎসার অর্থ সংগ্রের জন্য। পলাশী, নীলক্ষেত থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসের যে কোন যায়গায় যখন দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে নিথর দেহ নিয়ে পড়ে থাকেন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সস্তা ছেলে গুলোই আপনাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। পকেটে প্রচুর টাকা থাকার পরেও যখন কোথাও রক্তের ব্যবস্থা হয় না তখন সারাদিন ক্লাস-টিউশনি করে আসা এই সস্তা ছেলে-মেয়ে গুলোই ক্লান্ত শরীর নিয়ে আপনাকে রক্তের ব্যবস্থা করে দেয় কিছু পাওয়ার জন্য নয়; শুধু আপনাকে সাহায্য করার জন্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সস্তা ছেলে মেয়ে গুলোর মাত্র কয়েকটা সস্তা কাজের কথা উল্লেখ করলাম মাত্র। এই সস্তা কাজ গুলোর উপর ভর করে আপনি হয়তো আপনার স্বার্থ ঠিকই উদ্ধার করে নিয়েছেন। অথবা এই সস্তা শিক্ষার্থীদের সস্তা রক্ত আপনার অথবা আপনার আপনজনের কারো শরীরে নিয়ে দিব্বি সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন। 

আর অন্যদিকে এই সস্তা শিক্ষার্থীরা কী পাচ্ছে সেটাও একটু ভেবে দেখা দরকার। বিনিময়ে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই যখন ঢাকা মেডিকেলে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা নিতে যায় তারা বেদম প্রহারের স্বীকার হয়। আমাদের পুলিশ ভাইদের গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর গুলিবিদ্ধ নিথর দেহ পড়ে থাকে। পারমিতা হিমের মতো ব্যক্তিদের মুখে ফকিন্নির পুত বলে গালি শুনতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বহন করা গাড়ী থামিয়ে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। ছুটিতে বাড়ি গেলে ডাকাত কিংবা দুষ্কৃতকারীদের হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধামী ছাত্রের হামলার স্বীকার হতে হয়। এমন আরো অনেক অজানা অপ্রকাশিত ঘটনা থাকে যা কেবল পর্দার আড়ালেই থেকে যায়।


সব থেকে আশ্চর্য লাগে তখন যখন এই সব সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষ শুধু দুঃখ প্রকাশ করেই দায়িত্ব এড়িয়ে যায় অথবা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সব ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়া হয়। এতকিছুর পরেও আমরা বুকে আশা নিয়ে পথ চলি এবং আমাদের উপর হামলাকারীদের বিপদে এগিয়ে আসি শুধু মানবতার জয়গান করে। কারণ "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি নাম নয়; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলো গৌরবময় অতীত ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ড"।

 

লেখকঃ

আসিফ তালুকদার
সাংগঠনিক সম্পাদক
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ,  শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।