বরাবরের মত আমার আজকের বিষয় নিয়ে কেউ মন থেকে একবার হলেও ভেবে আমার পক্ষ নিবে। আবার উলটো দিকে আরেক পক্ষ আমার লেখার নানা রকম খুত খুঁজতে ব্যাস্ত হয়ে পরবে।তাই বলে কি আমি সত্যি টা থামিয়ে রাখবো! নাকি লেখা বন্ধ করে মুখ লুকিয়ে চুপ করে থাকবো ?
না আমি দু"টোর কোন টা ই করব না আমি আগের মতই সত্যির তীর ছুড়েই যাব, প্রকৃত বোদ্ধাজনের বিবেকের দাড় অবধি। তাতে খুব একটা ফল যে হবে সে আশাও করিণা, কারণ আমি সত্যি হতাশ আজকাল মানুষের জাগ্রত বিবেকের বার্ধক্য দেখে। 
বছরের একটা দিন নারী দিবস নিয়ে বিভিন্ন রঙ এ ঢং এ যতই উচ্ছ্বাস দেখি সারা দেশ জুড়ে, ঠিক তারপর দিন থেকে ফুটো হওয়া বেলুনের মত চুপসে যেতে দেখি সেই মানুষ গুলোকেই। আবার দেখি কেউ কেউ জুম্মার নামাজের খুদবায় পর্যন্ত দেশে ভূমীকম্পের কারণ হিসেবে সেই নারীদের দায়ী করতেও দ্বিধাবোধ করেণা। ওদের আমি মূর্খ বলে পাস কাটিয়ে যাই তবে আপনারা !
হ্যা সেই আপনারা যাদের আমরা শিক্ষিত বলে সম্মান করি তারা কি করছেন? ভেবে দেখুন তো যে দেশের সরকার প্রধান একজন নারী, বিরোধী নেতা নারী, স্পিকার নারী, মন্ত্রি পরিষদে আছে নারী, মুক্তিযুদ্ধে ছিল নারী, সাংবাদিকতায় নারী, পাইলট আছে নারী, সেনা বাহিনীতে আছে নারী, ডাকতার নারী, ইঞ্জিনিয়ার নারী, নার্সিং এ আছে নারী, অভিনয়ে আছে নারী, ডিরেকশনে নারী, নৃত্যে নারী, সংগীতে নারী, কৃষিতে আছে নারী, গার্মেন্টস এ আছে লক্ষ লক্ষ নারী, পর্বত আরোহনে আছে নারী, স্যুটার আছে নারী, সাতারে নারী, দাবাতে নারী, হকিতে নারী, ক্রিকেটে আছে নারী, ফুটবলে আছে নারী, বক্সিং এ ও আছে নারী।
এই যে নারী এত নারী নারী বলে কি বোর্ড ভাংছি এরা কেউ সাধারণ নারী বোঝাচ্ছি ভুল করেও যেন সেটা ভাববেন না। এ সব নারীরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সাথে পাল্লা দিয়ে স্ব মহিমায় এগিয়ে যাওয়া নারী। তবে অন্য ভাবে চিন্তা করলে সাধারণ নারী বলতে কোন লেভেলিং করাই সমিচিন নয়।। কারণ যে নারী দশ মাস গর্ভে ধারণ করে পুত্র সন্তানের জন্ম থেকে শুরু করে জীবনের শেষ মুহূর্ত অবধি ঘর, বাহির, স্বামী, সন্তান, পারিবারিক শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সহ নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র সুদক্ষ হাতে পরিচালনা করেণ। তাদের কে ই বা আপনি আমি আমরা সাধারণ বলি কোন মুখে ! আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে বোধ করি, তাদের প্রত্যকেই সম্মানীত।
তবে আজকের মূল বিষয় সেই সব নারীদের নিয়ে, যারা এত কিছু সামলেও বাড়তি সব বিশাল বিশাল অর্জন গুলো দিয়ে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের নাম শ্রেষ্ঠত্বের তালিকায় এনে দিচ্ছে। তাদের নিয়ে দু"কলম লিখতে অধিকাংশ পুরুষদের এত কার্পণ্য কেন ? কেন নারীদের কোন বিশাল অর্জনকে তেমন ভাবে প্রচার করা হয়না, যেমন হয় কোন পুরুষদের তার থেকে নিচু মানের অর্জন কে? কেন নারী ক্রিকেটার রা যখন শিরোপা জয় করে আনে তখন সারা মিডিয়ায় বা বর্তমানের সব থেকে জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুকে দু" এক জন সচেতন পুরুষ ছাড়া কারো ওয়ালে দেখিনা একবারের জন্যও নারীদের অসামান্য কৃতিত্বে সামান্য সাধুবাদ টুকু জানাতে ?
ঠিক উলটো দিকে কোন পুরুষের অর্জনের সাথে সাথেই আপনাদের গর্জনে ফেসবুকের ওয়াল ভেংগে যাওয়ার উপক্রম তো অনেক দেখেছি। কেউ কেউ বিভিন্ন স্টিকার, টিকার, লিফলেট, পোষ্টার এমন কি গলিতে, মহল্লায়, দেয়ালে, রাজপথে, বাস স্টান্ডে, লঞ্চ টার্মিনালে, ট্রেন স্টেশনে, বিমান বন্দরের আসপাশ পর্যন্ত নিয়ন সাইন লাগিয়ে তাদের সাথে নিজেদের ছবি জুড়ে দিয়ে শুভেচ্ছা বানী দিয়ে ভরে ফেলেন। আগের কথা বাদ দিলাম কিন্তু এই যে গত পরশু অনুর্ধ চৌদ্দ বছরের খুদে বাচ্চা মেয়ে গুলো টানা দ্বিতীয় বারের মত, বাংলাদেশের জন্য ইন্ডিয়ার মত ঘাগু দেশ গুলোকে হারিয়ে ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি নিয়ে এলো কই আমি তো আপনাদের তেমন উচ্ছ্বাস দেখিনি। তবে যে আগেই বলেছি, খুব সামান্য কিছু মানুষ সেটা তাদের ওয়ালে পোষ্ট দিয়ে অন্তত চেষ্টা করেছে আপনাদের জাগ্রত বিবেকের বার্ধক্যে, যৌবনের উদ্দিপনা ফিরিয়ে দিতে কিন্তু তাতেও আপনাদের হুশ এসেছে বলে দেখিনি। আমি স্বশ্রোদ্ধ কৃতজ্ঞতা জানাই তাদের যারা অন্তত সেই চেষ্টা টুকু করেছিলেন। এর মাঝে টানা ৩৯ ঘন্টা ধরে শুধু দেখেছি আপনারা কি করেণ ! নারী দিবসের কথার ফুলঝুড়িতে উতলে ওঠা মানুষ গুলো আসলে মন থেকে নারীদের জন্য কি করে ? বা আসলেই কতটুকু সম্মান তারা দেয় বাংলাদেশের নারীদের। যথারিতি আমি আবার হতাশ হয়েই আবার লিখতে বসা।
আচ্ছা জানেন তো ভাই সব গতকাল ও কিন্তু বাংলাদেশের এক নারী বক্সিং এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। কি হলো শুনেননি বুঝি ! আহারে কি করবো বলুন উনি তো নারী। উনি নারী হয়ে বক্সিং এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ছিঃ ছিঃ কি লজ্জা, কি লজ্জা ! দেশের নারী গুলো সব উচ্ছন্যে গেলো, নারী হয়ে ব্যাটাদের মত বক্সিং (মারামারি) করবে তাতে আবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশের জন্য শিরোপা এনেছে এটাই তো এখন কিছু মূর্খদের আগামী জুম্মায় খুদবার বিষয় হতে পারে। সেখানে আপনাদের মত শিক্ষিত লোকদের কি এসব নিয়ে সাধুবাদ দেয়া মানায়।! কিসের এত দায় পরেছে নিজের ওয়ালে এত কষ্ট করে ঐ মেয়েটির প্রতি সামান্য কৃতজ্ঞতার সাথে সাধুবাদ জানিয়ে একটি মাত্র পোষ্ট দিতে ! আরে কি যা তা বলছি দেশে কি স্টাটাস ইস্যুর অভাব পরেছে নাকি কত বিষয় ই তো আছে তিল কে তাল বানিয়ে নিজেকে মহা জ্ঞানী প্রমানের।
আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে হ্যা সেটা বলেই ফেলি। না বললে নিজের বিবেকের ঘুণ পোকা গুলো আবার কুড়ে খেতে চাইবে তাই বলছি, সন্দেহ হচ্ছে আমাদের দেশের এই জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুক মনে হয় ধীরে ধীরে সেই একাত্তরের নারী মাংস ক্ষেকো হায়নাদের আয়ত্বে চলে যাচ্ছে। যাদের বাংলাদেশের কোন উন্নয়নে গা জ্বলে, যারা হামেশাই নারীদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকানোয় পাপ দেখেনা। ভূমীকম্পের কারণ হিসেবে নারীদের দায়ী করে, যারা মায়ের পেটে জন্ম নিয়ে সেই মায়ের জাত তুলে গালি দিতে দ্বিধা করেণা। যারা নারী পোষাকের আড়ালের দেহের ভাজ গুনতে ব্যাস্ত থাকে।
আমাকে দয়াকরে আপনারা ভুল বুঝবেন না, আমি সব পুরুষদের অসম্মান করতে লিখছি না, আমি কেবল চাইছি আপনাদের ভেতরের সত্যিকারের ভালো বিবেক গুলোকে জাগিয়ে তুলতে। আমি জানি আমার সোনার বাংলায় গুটি কতক দুষ্ট লম্পট ছাড়া বেশীর ভাগ ই ভাল মনের পুরুষ যারা আমাদের কারো ভাই, কারো স্বামী, কারো সন্তান। আর সেই সব ভাইদের ভালো বিবেক গুলোকে জাগিয়ে তোলা একজন বোনের দায়িত্ব নিয়ে লিখছি। আমি যা লিখি সব ই যে আপনাদের মেনে নিতে হবে তাও বলছি না । তবে একটু অনুরোধ করছি আপনার চিন্তার সাথে মিলিয়ে দেখুন তো আদৌ আমি এক বিন্দু মিথ্যে বলছি কি না ! 
যে দেশের সরকার তেলের মূল্য লিটারে ১০ টাকা পর্যন্ত কমালেও ফেসবুকে স্টাটাস এর ঝড় ওঠে না কিন্তু ১০ পয়সা বাড়লে সিডর আসে। যে দেশে বাসের ভাড়া কমানোর সরকারী সিদ্ধান্তে বাহবা পায় না। যে দেশে গার্মেন্টস ধ্বশে, বা বৈদ্যুতিক গোলযোগে কোথাও কিছু দুর্ঘটনা ঘটলে ( তবে সবাই যে সাধু তাও বলছি না, কিছু নষ্ট মানুষ সর্বক্ষন সরকার কে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার জন্য ইচ্ছে করেও যে নষ্টামী কিছু করে সেটাও আপনারা আমার থেকে ভালোই জানেন) ফেসবুক থেকে শুরু করে বিভিন্ন মিডিয়ায় মানুষের খিস্তি খেউরে সরকারের ভীত নড়ে যায়। যে দেশে শত শত কলকারখানা বিশ্বমানের করলেও সরকার বা সংশ্লিষ্ট কারো সুনাম ছড়ায় না। কিন্তু কোন যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে কখনো কখনো দু তিন ঘন্টা ইলেক্ট্রিসিটি গেলো তো আবার নব উদ্দমে শুরু সারকারের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করা স্টাটাসের বাহার।
আমার / আপনার সেই প্রিয় বাংলাদেশে যদি এভাবেই চলতে থাকে তাহলে আর কত সহ্য হয় বলুন ? আর সেখানে নারীদের অর্জনের কথা কেন ই বা দায়িত্ব নিয়ে ফলাও করে পোষ্টার বানিয়ে প্রচারের আশা করি। আমি আসলে কিছু টা নির্বোধ তো তাই প্রতি মুহূর্তে ভাবি, বাংলাদেশে আসলেই নারী পুরুষ কোন ভেদাভেদ নেই। এটা যে আমার কত বড় আহাম্মকি ভাবনা তা নিশ্চয়ই আপনারা অনেকেই এ লেখা পড়ে একমত হবেন তাইনা ? আর হবেন না ই বা কেন আমরা নারী ই তো এখনো নিজেদের কোন লিংগভেদে নয় শুধু মানুষ হিসেবে পরিচিতি পেতে শিখিনি। যেমন আমার লেখার আগে প্রায় সকলেই নিজের ইচ্ছে মত জুড়ে দেন নারী সাংবাদিক ওমুক। তবে আজ আমি আর ক্ষেপছিনা কারণ আপনারা চান আমাদের নামের সামনে নারী শব্দটা জুড়ে দিয়ে ভেদাভেদ গড়ে দিতে । পাছে কিছুটা কম গুরুত্বপুর্ণতা পায় সেটাও হয়ত মনে মনে কেউ চাইলেও চাইতে পারেণ। আর সেই এক ই কারণেই হয়ত আমাদের কোন অর্জন ই আপনাদের কাছে তেমন গুরুত্ব বহন করেণা।
যাক গে অনেক চেচালাম, ভয় পাচ্ছি আজ ই হয়ত আমায় কোন দুষ্ট চক্র তসলিমা নাসরিনের কাতারে ফেলে আমার আটাশ জেনারেশন উদ্ধারের চেষ্টায় ব্যাস্ত হয়ে পরবে। তবে সাবধান যারা আমায় নিয়ে কোন রকম বাজে কিছু চিন্তা করবে তাদের জন্য আমার আল্লাহ্‌র তরফ থেকেই শাস্তি চলে আসবে। কারণ আমি এক আল্লাহ্‌ ছাড়া এই পৃথিবীর কাউকে ভয় পাইনা বলেই আমার লেখায় এক বিন্দু মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সস্তা বাহবা কুড়ানোর মত কোন ইস্যু নিয়ে টিস্যু পেপার মার্কা লেখা লিখিনা।
সব শেষে আমি আবারো আমার সকল ভাইদের কাছে বিনিত অনুরোধ করছি। আপনারা আপনাদের সদা জাগ্রত বিবেকের বার্ধক্য থেকে বেড়িয়ে আসুন। বাংলাদেশের সকল নারীদের সকল অর্জনে সমান ভাবে অভিনন্দিত করুণ, শুধু দৈহিক গড়ণে নারী বলে নয়। একজন সফল মানুষ হিসেবে তাদের প্রাপ্য সম্মান টুকু বুঝিয়ে দিন, তবেই ভাববো আমার দেশের পুরুষেরা দিতে জানেন সম্মান, দিতে জানেন ভালোবাসা অফুরাণ ।।

 

 

লেখিকা

সাংবাদিক

মাকসুদা সুলতানা ঐক্য