হেমাঙ্গ বিশ্বাস ছিলেন লোকসঙ্গীত কেন্দ্রিক গণসঙ্গীত সৃষ্টির অনন্য কারিগর। অনুবাদে, লোকসুরের ব্যবহারে, গণসঙ্গীত রচনায়, সুর সংযোজনার দক্ষতায় হেমাঙ্গ বিশ্বাস বাংলা গণনাট্য সঙ্গীতে এক নতুন ধারার সৃষ্টি করেন। ২২ নভেম্বর তার ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। স্বাধীকার প্রতিষ্ঠায় আমৃত্যু সংগ্রামী এ মানুষটির কথা ভুলতে বসেছেন এলাকাবাসী। তার জন্মভিটাও হয়ে গেছে বেদখল।


১৯১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। কলেজ জীবন জড়িয়ে পড়েন স্বাধীনতা আন্দোলনে। কারাবরণ করেন বেশ কয়েক বার। আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন গণসঙ্গীত। লোকসঙ্গীতকে কেন্দ্র করে তার গণসঙ্গীত ক্রমেই উজ্জীবিত করে সাধারণ মানুষদের। সাধারণ মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে নেমে জমিদারী বিসর্জন দিতে হয়েছিল তাকে। এমনকি অভিভাবকরা তাকে ঘর থেকেও বের করে দিয়েছিলেন তাকে। তিনি আরাম আয়েশ ছেড়ে নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোকেই ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন।


তেলেঙ্গানা আন্দোলনে তাঁর গান “তোমার কাস্তেটারে দিও শান/ কিষাণ ভাই তোর সোনার ধানে বর্গী নামে” প্রভৃতি আসাম ও বাংলায় সাড়া ফেলে দেয়। পঞ্চাশের দশকে তাঁর গান দেশ বিভাগের যন্ত্রণার পাশাপাশি সংগ্রামের কঠিন শপথে উদ্দীপ্ত হওয়ার প্রেরণা যোগায়। কলকাতায় বসবাস করলেও ভুলতে পারেননি দেশকে, দেশের মাটি ও মানুষকে। লিখেন, ‘হবিগঞ্জের জালালি কইতর, সুনামগঞ্জে কোরা’।


১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে তিনি লিখলেন, “শোন দেশের ভাই ভগিনী শোন আচানক কাহিনী, কাঁদো বাংলা জননী’। ১৯৬৫ খ্রীস্টাব্দে অনুবাদ করেন ‘আমরা করবো জয়’ মার্কিন লোকসঙ্গীত শিল্পী পিট সিগারের গাওয়া সেই জনপ্রিয় গানটি। ১৯৬৪-তে পারমাণবিক যুদ্ধের প্রতিবাদে রচনা করেন শঙ্খচিল গানটি। এরকম অসংখ্য রচনায় সমৃদ্ধ তিনি।


বাংলাদেশের প্রতি অসীম টানের এই মানুষটির জন্মভিটার এখন বেদখল। হবিগঞ্জে তার সম্পর্কে লোকজন তেমন কিছু জানেন না। তাকে নিয়ে পর্যাপ্ত চর্চা নেই বলে অভিযোগ গবেষকদের। জন্মভিটা উদ্ধার ও এলাকার একটি সড়ক তার নামে নামকরণের দাবি এলাকাবাসীর। এখনই সময় হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে নিয়ে আমাদের গর্বিত হওয়ার।


২০১২ সালের ২৪ ডিসেম্বর চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশী গ্রামে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের বাড়ির সামনে আয়োজন করা হয়েছিল ৫দিন ব্যাপি তার জন্মশত বার্ষিকী অনুষ্ঠানের। সেখানে এসেছিলেন তার মেয়ে রঙিলি বিশ্বাস। মন্ত্রীসহ উচ্চপদস্থ অনেক লোকের আগমন ঘটে সেখানে। তখন হেমাঙ্গ বিশ্বাসের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য অনেক দাবি উঠলেও এর পরের চার বছর চলে যায় অনেকটাই নিরবে।