ঢাকা: শেষ হচ্ছে বছর ২০১৬। বছরের বিভিন্ন সময়ে কিছু অর্জন ও উদ্ভাবনে বিশ্ব মিডিয়ার শিরোনাম হয়েছে বাংলাদেশ। তবে ২০১৬ সাল জুড়েই বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রভাবশালী মিডিয়ার অন্যতম শিরোনাম ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম হ্যাক করে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে হ্যাকারদের ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি। এছাড়া চলতি বছরে আলোচিত ছিল মেশিন রিডেবল স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ও উবারের মত কিছু ঘটনা। এমনকি অর্জন হিসেবে সজিব ওয়াজেদ জয়ের আইসিটি বিভাগে পুরস্কার অর্জনও ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

 ‘ফিরে দেখা ২০১৬’ আয়োজনে পাঠকদের জন্য আজকের বিষয় প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ। লিখেছেন মো, জুবাইর।

হ্যাক করে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা চুরি

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ছুটির দিনে সার্ভার হ্যাক করে ১০ কোটি ডলার বা ৮০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় হ্যাকাররা। চক্রটি প্রথমে পাসওয়ার্ড হ্যাক করে। পরে আন্তর্জাতিক লেনদেনের নিয়ম অনুসরণের মধ্য দিয়ে জালিয়াতির কাজ সম্পন্ন করে। একপ্রকার বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মতিতে টাকাগুলো নিয়ে যায়। অবশ্য তখনও বাংলাদেশ ব্যাংক বুঝতে পারেনি আসল ঘটনা। বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যেভাবে লেনদেন করে সেভাবে লেনদেন হয়েছে। প্রথমে টাকার পরিমাণ চেয়ে একটি আবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে জমা হয়। আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রাক্কালে যেভাবে আবেদন করা হয় এ আবেদনটিও ছিল অনুরূপ। যে কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক টের পায়নি। নির্ধারিত হিসাবে টাকা চলে যায় এবং নির্ধারিত সময় শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকও বুঝতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে দুই কর্মকর্তাকে পাঠানো হয় তিন দিনের জন্য। কিন্তু তারা টাকার কোনো হদিস পাননি। সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা ১০ থেকে ১২ দিন পর খালি হাতে ফেরেন।

মেশিন রিডেবল স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র

দেশের ১০ কোটি নাগরিককে মেশিন রিডেবল স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কার্ড দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তারই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ২ অক্টোবর থেকে এই কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। ওই দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে এই কার্ড বিতরণের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।

নির্বাচন কমিশনের এক সুমারী অনুযায়ী দেশের ১০ কোটি ভোটারের কাছ থেকে তাদের দুই হাতের ১০ আঙুলের ছাপ, আইরিশ বা চোখের মণির ছবি সংগ্রহ করে এই কার্ডং বিতরন করা হবে। এরই মধ্যে কয়েকটি ছিটমহলে এই কার্ডে বিতরন করা হয়। এমনকি ঢাকা জেলার উত্তর সিটি কর্পোরেশনের কয়েকটি এলাকায় স্মার্ট কার্ড বিতরনের কার্যক্রম চলছে। এই কার্ড বিতরনের মূল কারণ হল সঠিক ভোটার নির্ধারন করা ও দেশ ও দশের স্বার্থ রক্ষা করো। এনআইডির তথ্যভান্ডারে নাগরিকদের হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর ছাপ রয়েছে। ২০০৮ সালে ওই ছাপ সংগ্রহে অনেক ত্রুটি ছিল। সিম নিবন্ধনের সময় দেখা গেছে অনেকের আঙুলের ছাপ মিলছে না। নতুন করে দুই হাতের দশ আঙুলের ছাপ সংগৃহীত হলে এ সমস্যার সমাধান হবে। স্মার্ট কার্ডটি মেশিন রিডেবল হওয়ায় জালিয়াতির হাত থেকে বাড়তি নিরাপত্তা প্রদান করবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প

বিশ্বে সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে বাংলাদেশের প্রধান ও আলোচিত উদ্ভাবন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প। বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ প্রকল্প এটি। এটি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন কর্তৃক বাস্তবায়িত হবে প্রকল্পটি। যার উৎক্ষেপনের খরচ ৩ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ১ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা নিজেদের তহবিল থেকে এবং বাকি ১ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে ঋণ হিসাবে নেওয়া হবে। এক্সিম ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্র, এইচএসবিসি ফ্রান্স, জাপান ব্যাংক অব ইন্টারন্যাশনাল, সিডব্লিউজি গালফ ইন্টারন্যাশনাল অব ইউকে এবং চায়ন গ্রেটওয়াল ইন্ড্রাস্ট্রি করপোরেশন এ প্রকল্পে ঋণ দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। ডিপিপিতে এ প্রকল্পের মেয়াদ জুন ২০১৬।

বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পার করে অনুমোদন পায় এই প্রকল্পটি। এরই ধারাবাহিকতায় আইটিইউ টেলিকম ওয়ার্ল্ড অ্যাওয়ার্ড পায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প। আইটিইউ টেলিকম ওয়ার্ল্ড-২০১৬ মেলায় ইনোভেটিভ আইসিটি সলিউশন উপস্থাপন, প্রচার-প্রচারণা এবং সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট তৈরির কৃতিত্বে এ স্বীকৃতি দেয়া হয়। টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের হাতে এ পুরস্কার তুলে দেন আইটিইউর মহাসচিব হাউলিন ঝাউ। আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন আয়োজিত এ মেলায় পৃথিবীর সম্ভাবনাময় উদ্ভাবনগুলোকে পুরস্কৃত করা হয়। গ্লোবাল এসএমই অ্যাওয়ার্ড, থিমেটিক অ্যাওয়ার্ড, রিকগনিশন অব এক্সিলেন্স সার্টিফিকেট ও হোস্ট কান্ট্রি এসএমই অ্যাওয়ার্ড নামে চারটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেয়া হয়ে থাকে। মেলায় অংশগ্রহণকারী জাতীয় প্যাভিলিয়নগুলোর মধ্যে সেরা উদ্ভাবনী প্রদর্শক হিসেবে রিকগনিশন অব এক্সিলেন্স সার্টিফিকেট অ্যাওয়ার্ডটি পায় বাংলাদেশ।

আইসিটিতে বাংলাদেশের অর্জন

চলতি বছরের ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন অব গভার্নেন্স অ্যান্ড কম্পিটিটিভনেস,  প্লান ট্রিফিনিও, গ্লোবাল ফ্যাশন ফর ডেভেলপমেন্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট প্রদেশের নিউ হেভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস হতে ‘আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর ডিজিটাল বিশ্বের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তাকে এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়।

‘ইয়াং গ্লোবাল লিডার’ ও ‘ভয়েস অব গ্লোবাল আইসিটি’ বিভাগে ‘দ্যা ওয়ার্ল্ড ইকোনমি ফোরাম’(ডব্লিউইএফ) হতে দুটি পুরস্কার লাভ করেন বাংলাদেশ তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক।

এ বছর এশিয়া-ওশেনিয়া অঞ্চলের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংগঠনগুলোর সংস্থা অ্যাসোসিওর দেওয়া দুটি পুরস্কারের আসে বাংলাদেশে। মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে অ্যাসোসিও সামিট ২০১৬-এর নৈশভোজে তিনটি বিভাগে অ্যাসোসিও পুরস্কার দেওয়া হয়। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ পায় অ্যাসোসিও ডিজিটাল সরকার পুরস্কার ও আউটস্ট্যান্ডিং আইসিটি কোম্পানি হিসেবে বাংলাদেশের স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেড পুরস্কার।

উবার

চলতি ২৫ নভেম্বর বাংলাদেশে অ্যাপভিত্তিক ট্যাক্সি সেবার নেটওয়ার্ক উবার কার্যক্রম ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা- বিআরটিএ। কিন্তু ২রা ডিসেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছিলেন, স্মার্টফোনে ট্যাক্সি সেবার অ্যাপ ‘উবার’কে একটি প্রক্রিয়ায় এনে বাস্তবসম্মত সমাধান করা হবে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এটি বেআইনি ঘোষণা করলেও মন্ত্রী আভাস দিয়েছিলেন, নিয়মের আওতায় এনে উবারের বৈধতা দেওয়া হবে। এর পর আগে পরের বিভিন্ন মামলা মোকদ্দমা, সমাজ ব্যাবস্থাপকদের সমালোচনা ও বিআরটিএর নির্দেশনামা নিয়ে বিভিন্ন দেশে আলোচিত স্মার্টফোন অ্যাপভিত্তিক ট্যাক্সি সেবার নেটওয়ার্ক উবারের কার্যক্রম শুরু হয় বাংলাদেশে।

বাংলাদেশের জন্য তাদের অ্যাপও চালু করেছে উবার। যা ডাউনলোড করা যাচ্ছে অ্যাপল স্টোর এবং গুগল প্লে স্টোর থেকে। ওই অ্যাপ ব্যবহার করে নেওয়া যাচ্ছে উবারের ব্যতিক্রমী ট্যাক্সি সেবা। বাংলাদেশে এই সেবার জন্য উবারের নিজস্ব কোনো ট্যাক্সি নেই। ব্যক্তিগত গাড়ি আছে এমন যে কেউ অ্যাপ ডাউনলোড করে নিবন্ধনের মাধ্যমে উবারের চালক হয়ে যেতে পারেন। একই অ্যাপ ব্যবহার করে সেবা পাবেন যাত্রীরা। উবার ম্যাপে যাত্রীরা চালকদের তাৎক্ষণিক অবস্থান জেনে নিয়ে তাকে ডাকতে পারবেন। গাড়ির গতি, দূরত্ব, সময় অনুযায়ী উবার ম্যাপ তাদের মাণদণ্ড অনুযায়ী ভাড়া হিসাব করে দেবে। বাজে আচরণের জন্য যাত্রী বা চালক অ্যাপে রেটিং দিতে পারবেন।

উবারের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ‘অন-ডিমান্ড’ এই পরিবহন সেবা মাত্র একটি বাটন চেপে যাত্রীদের নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি চালক-পার্টনারদের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুবিধাজনক সুযোগ তৈরি করবে।

লিখেছেন, মো. জুবাইর
সহ-সম্পাদক
দৈনিক আমাদের সময়