মনিরুল ইসলাম মনি, পদ্মার চর ঘুরে: একদিকে কুষ্টিয়া, অন্যদিকে পাবনা ও রাজবাড়ি; শুধু তিন জেলা’ই নয় তিন বিভাগীয় সীমান্তের মধ্য সীমানায় বাস কয়েক হাজার পদ্মাপারের চরবাসীর। অবহেলিত প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর প্রধান পেশা মাছ ধরা ও কৃষি কাজ হলেও গরু চড়ানোও বেশ জনপ্রিয়।

এই চরটিতে প্রায় ২০ সহস্রাধিক গরু-ভেড়া ও ছাগল থাকলেও এখানে নেই গবাদীপশু চিকিৎসাকেন্দ্র। ফলে প্রতিবছর অনেক পশু মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে কৃষকরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

এখানকার খামারীরা বলছে, সীমানা জটিলতায় আমরা আটকে গেছি। এর কোন সমাধান হচ্ছে না। তবে আমাদের ক্ষতির পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে দিন।

বর্তমান প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগেও চিকিৎসাভাবে গবাদীপশু মারা যাওয়া অবাক ব্যাপার। এখানে ভেটেনারী সার্জনেরও কোন খোঁজ নেই। এই উপজেলার সরকারি পশু চিকিৎসক কে- তা কেউ-ই জানে না। খামারীদের একমাত্র ভরসা স্থানীয় পশু চিকিৎসক।

গরুর নিরাপদ চারণভূমি পদ্মার চর

গরুর বাথান নিয়ে পদ্মা নদীর এ চর-সে চর ঘুরে ইসলাম শেখের জীবনের ৫০ বছর কেটেছে। চলতি বছর তার গোবাথানে ছয় কৃষকের সাড়ে পাঁচশ' গরু রয়েছে। যার মধ্যে ৯০ শতাংশই গাভী। এই গোবাথান থেকে প্রতিদিন দুই বেলায় প্রায় পাঁচ মণ দুধ হয়। কাশবন ও নদীর নতুন চরে প্রভাবশালীদের আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধের মধ্যেও বাথানে গরু পালন করে নিজেদের ভাগ্য বদলেছে পদ্মা চরের মানুষ।

কুষ্টিয়ার খোকসা, কুমারখালী, রাজবাড়ীর পাংশা, কালুখালী; অপর পাড়ে পাবনা সদর, সুজানগর উপজেলায় পদ্মা নদীর ১৫ বর্গকিলোমিটার চরে দুই হাজার কৃষক তিন শতাধিক গরুর বাথান (খামার) গড়ে তুলেছেন। বর্ষা মৌসুমে পদ্মা নদীতে ডাকাতের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ গোবাথানের মালিক চর থেকে গরু তুলে নিতে বাধ্য হয়।

গত পাঁচ বছরে আটবার গোবাথানে ডাকাতরা হামলা চালিয়ে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা মূল্যের গরু লুট করে নিয়ে গেছে বলে কৃষকরা জানান। এ ছাড়া কাশবনে প্রভাবশালীদের আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধে লুটপাটের ঘটনাও ঘটে থাকে। পদ্মার চরের গোবাথানগুলো থেকে প্রতি বছর ৫-৭ কোটি টাকার দুধ ও গরু বিক্রি হয় বলে কৃষকরা জানান।

উপজেলার খাসচরে খোলা আকাশের নিচে বাঁধা গরুর পাল দেখে যে কারোই চোখ আটকে যাবে। প্রকৃতিনির্ভর এসব খামারের গরুগুলো সারা বছরই রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করেই টিকে আছে। ইসলাম শেখ, নন্তু প্রামাণিক ও মলো প্রামাণিকের বাথানের মতো একটি বাথানেও রাতে অথবা ঝড়-বৃষ্টিতে গরু রাখার ঘর বা শেড নেই। নেই খাবার পানির ব্যবস্থা।

পদ্মার বিস্তির্ণ চরে এভাবেই বাথানের গরু খাবার সংগ্রহ করে

কোনো গরুর অসুখ হলে ঝাড়-ফুঁক আর পানি পড়া দিয়েই চলে চিকিৎসা। বড়জোর নদী তীরের বাজারের গ্রাম্য ডাক্তার ডাকা হয়। চরের কাশ দিয়ে রাখালদের থাকার জন্য তৈরি করা খুপরি ঘরের পাশেই সদ্য প্রসূত বাছুরগুলোকে গাদাগাদি করে রাখা হয়।

বাথান মালিক ইসলাম শেখ বলেন, তিন পুরুষ ধরে পদ্মা চরে গরুর বাথানের ব্যবসা করে আসছেন। এ ব্যবসা করে ছোট তিন ভাইকে বিশ্ববিদ্যালয় পাস করিয়েছেন। গরুর খাবার সংকট দেখা দিলে তখন বাথানের গরুগুলো নিয়ে কখনও পাবনার চর গঙ্গাধরদিয়া, চরমাছপাড়া, আমবাড়িয়ার চর, চর ভবানীপুর, পীরপুর চর, চর গাজনার বিল; আবার কখনও চর সাদিপুরের হজরত বাঙালের চরসহ বিভিন্ন চরে ছোটেন। এভাবেই তার জীবনের ৫০ বছর কেটে গেছে।