banglanewspaper

ডেস্ক রিপোর্ট: রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার আগে দুর্ধর্ষ জঙ্গি নুরুল ইসলাম মারজান তার সহযোগীদের নিয়ে নতুন হামলার স্থান রেকি করতে বেরিয়েছিল। পুলিশের দায়ের করা মামলায় এমনটি দাবি করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার শেষ রাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সদস্যদের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় নব্য জেএমবির শীর্ষস্থানীয় কমান্ডার মারজান ও সাদ্দাম হোসেন ওরফে রাহুল।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে গতকাল শনিবার ওই দুই জঙ্গির লাশের ময়নাতদন্ত হয়েছে। পরে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, একাধিক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে দুই জঙ্গি।

দুর্ধর্ষ দুই জঙ্গি নিহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় বলা হয়েছে, মারজান ও সাদ্দাম অপর সহযোগীকে নিয়ে একটি কালো রঙের টিভিএস মোটরসাইকেলে করে মোহাম্মদপুরের দিক থেকে বেড়িবাঁধ হয়ে রায়েরবাজার-হাজারীবাগের দিকে যাচ্ছিল নতুন হামলার স্থান রেকি করতে। তাদের এই রেকির খবর পেয়ে রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পূর্ব পাশের রাস্তায় চেকপোস্ট বসায় সিটিটিসি ইউনিট। সেখানে সিগন্যাল অমান্য করে গুলি ও গ্রেনেড ছুড়ে জঙ্গিরা। ওই সময় পুলিশও গুলি ছোড়ে। এতে মারজান ও সাদ্দামের শরীরে গুলিবিদ্ধ হয়। তবে তাদের এক সঙ্গী দৌড়ে পালিয়ে যায়।

ডিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী জানান, গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় গত শুক্রবার রাতে সিটিটিসি ইউনিটের উপপরিদর্শক আজগর আলী বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন। ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা ওই মামলায় অভিযানে নিহত মারজান, সাদ্দাম ও তাদের পালিয়ে যাওয়া সহযোগীকে আসামি করা হয়ছে।

এজাহারে বলা হয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে যে নব্য জেএমবির কিছু সদস্য মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় জঙ্গি হামলা করতে পারে। মোটরসাইকেলে করে জঙ্গিরা বেরিবাঁধ এলাকায় রেকি করতে বেরিয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে গত ৫ জানুয়ারি সহকারী কমিশনার আহসানুল হকের নেতৃত্বে সিটিটিসি ইউনিটের একটি দল মোহাম্মদপুরে যায়। এরপর বুলেটপ্রুপ জ্যাকেট পরে তারা রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পূর্ব পাশের পাকা রাস্তার ওপর তল্লাশিচৌকি বসায়। রাত পৌনে ৩টার দিকে কালো রঙের একটি মোটরসাইকেলে করে আসা তিন আরোহীকে থামার সংকেত দেয় পুলিশ। সংকেত অগ্রাহ্য করে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে দুটি গ্রেনেড ছোড়ার পাশাপাশি গুলি করতে থাকে। পুলিশ পাল্টা গুলি করলে আরোহীরা চিৎকার করে মোটরসাইকেলসহ রাস্তায় পড়ে যায়।

তিন আরোহীর মধ্যে একজন দৌড়ে পালিয়ে যায়। একপর্যায়ে গুলি ছোড়া বন্ধ করলে চেকপোস্টে কর্তব্যরত পুলিশ আনুমানিক ৩টার দিকে কাউন্টার টেররিজমের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে খবর দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় থানাকে বিষয়টি জানায়। বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের পরিদর্শক মোহাম্মদ শফিউদ্দিন শেখ এবং উপপরিদর্শক এস এম রাইসুল ইসলাম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। দুজনের কাছে বিস্ফোরক বা বোমাজাতীয় কোনো বস্তু আছে কি না তা পরীক্ষার পর মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক মো. ইয়াহিয়া তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, এই অভিযানে পুলিশ মোট ৪০টি গুলি করেছে। এর মধ্যে পিস্তল থেকে গুলি করা হয়েছে ২৭টি। বাকিগুলো শটগানের। উপপরিদর্শক সাইফুল ইসলামের তাঁর নাইন এম এম পিস্তল থেকে সাতটি, সহকারী উপপরিদর্শক ছালাহ উদ্দিন তাঁর নাইন এম এম পিস্তল থেকে আটটি, আলিফ খান তাঁর সেভেন পয়েন্ট সিক্স টু পিস্তল থেকে সাতটি, রেজাউল ইসলাম তাঁর সেভেন পয়েন্ট সিক্স টু পিস্তল থেকে পাঁচটি এবং কনস্টেবল গাজী সাখাওয়াত হোসেন তাঁর শটগান থেকে ছয়টি, হারুন অর রশীদ তাঁর শাটগান থেকে সাতটি গুলি করেন। ওই অভিযানে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের হামলায় পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক জসিম উদ্দিন খান ও কনস্টেবল গাজী সাখাওয়াত হোসেন আহত হন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়। তাঁদের কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

যেসব আলামত উদ্ধার : এজাহার অনুযায়ী দুই ‘জঙ্গি’র কাছ থেকে একটি সেভেন পয়েন্ট সিক্স ফাইভ এমএম পিস্তল পাওয়া গেছে। অস্ত্রটির গায়ে ‘মেইড ইন ইউএসএ’ লেখা আছে। আরো উদ্ধার হয়েছে একটি ম্যাগজিন যাতে দুটি গুলি পাওয়া গেছে। ওই সময় ১২ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের একটি চাকুও উদ্ধার করা হয়। অভিযান শেষে দুটি বিস্ফোরিত গ্রেনেডের অংশবিশেষ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি জঙ্গিদের ব্যবহার করা নিবন্ধনহীন কালো রঙের টিভিএস স্টার ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল এবং একটি কালো রঙের হেলমেট পাওয়া গেছে।

সিটিটিসি ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দুজন নিহত হওয়ার কারণে তাদের সঙ্গে থাকা সহযোগীর পরিচয় এখনো জানা যায়নি। এই দলটি কোথায়, কী ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তাদের সক্রিয় কোনো সহযোগীর ব্যাপারে এখনো তথ্য মেলেনি। ’

একাধিক গুলিতে মৃত্যু : মারজান ও সাদ্দামের দেহে একাধিক গুলির চিহ্ন পেয়েছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, গুলিতেই দুজনের মৃত্যু হয়েছে। সাদ্দামের দেহ থেকে তিনটি গুলি বের করা হয়েছে। মারজানের দেহেও ছিল একাধিক গুলি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিহতদের শরীর থেকে মাংসপেশি সংগ্রহ করা হয়েছে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ে জন্য। অন্যদিকে ভিসেরা, রক্ত ও প্রসাব সংগ্রহ করা হয়েছে রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য।

ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গেই রাখা হয়েছে দুই জঙ্গির লাশ। গতকাল পর্যন্ত তাদের কোনো স্বজন লাশ নিতে যায়নি।

সিটিটিসি ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, নিহত দুই সন্দেহভাজন জঙ্গির লাশ আপাতত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গেই থাকবে। তাদের পরিবার মরদেহ নিতে চাইলে প্রথমে এসে শনাক্ত করতে হবে। এরপর তারা আবেদন করলেই তা হস্তান্তর করা হবে।

জানা গেছে, গুলশানে রেস্তোরাঁয় হামলার পর পুলিশের অভিযানে যে ৩৮ জন সন্দেহভাজন জঙ্গি নিহত হয়েছে তাদের মধ্যে ছয়জনের মরদেহ এখনো ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে রয়েছে। তিনজনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকিদের বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম জুরাইন কবরস্থানে দাফন করে।

তদন্তে গুলশান হামলার ‘অপারেশন কমান্ডার’ হিসেবে মারজানকে শনাক্ত করে পুলিশ। মারজানের বাড়ি পাবনা সদর উপজেলার হেমায়েতপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আফুরিয়ায়। গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে সে পাবনা শহরের পুরাতন বাঁশবাজার আহলে হাদিস কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি পাবনা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে জিপিএ ৫ পেয়ে দাখিল ও আলিম পাস করে। এরপর ২০১৪ সালে ভর্তি হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সে ছাত্রশিবিরের সাথী ছিল।

অন্যদিকে ২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর কাউনিয়ায় জাপানের নাগরিক কুনিও হোশিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। জুলাই মাসে পুলিশ আদালতে যে অভিযোগপত্র দেয় তাতে সাদ্দামের নাম আছে। ওই ঘটনাসহ অন্তত ১০টি হামলায় জড়িত ছিল সাদ্দাম।