আজ অভিশপ্ত নাগাসাকি দিবস। নাগাসাকি জাপানের ব্যস্ততম একটি নগরী। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে এইদিনে জাপানের স্থানীয় সময় রাত ৩টা ৪৭ মিনিটে নাগাসাকির ঘুমন্ত মানুষের ওপর পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। ফ্যাটম্যান নামের বোমাটি বিস্ফোরিত হয়ে নাগাসাকি শহরকে চোখের পলকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে।

এর দুইদিন আগেও জাপানের রাজধানী টোকিও থেকে ৫০০ মাইল দূরের হিরোশিমা শহরে ঠিক এমনই আরেকটি ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এই হামলাটি হয়েছিল সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে। সে দিন জীবিকার সন্ধানে ছুটে চলা পথে নিরপরাধ অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ঘটে। এই বোমাটির নাম ছিল ‘লিটল বয়’। কারণ, বোমা প্রস্তুত ও নিক্ষেপের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ছিলেন আকারে অপেক্ষাকৃত খাটো।

এই দুটি বোমা হামলার মধ্যদিয়ে সভ্যতার আবিস্কারে কালিমা লেপন করা হয়। যা বিশ্বব্যপি এক ঘৃণার ইতিহাস সৃষ্টি করে। বোমার তাৎক্ষণিক বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর মিছিলে শামিল হয় এক লাখ ১০ হাজার নিরীহ জাপানি। দীর্ঘমেয়াদি তেজস্ক্রিয়তার কারণে পরের বেশ কয়েকটি বছর ক্রমাগত মৃত্যুর কোলে শামিল আরো এক লাখ ৩০ হাজার লোক। এখনো জাপানের অধিবাসী সেই তেজস্ক্রিয়তার মাশুল দিয়ে যাচ্ছেন।

জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আণবিক বোমা হামলার পর পার হয়েছে ৬৯ বছর। প্রতি বছর ৬ ও ৯ আগস্ট ঘুরে ঘুরে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের নিমর্মতার কথা জাপানিরা কোনো দিন ভুলতে পারবে না।

আণবিক বোমা লিটল বয়ের ধ্বংসযজ্ঞ এতই নির্মম ছিল যে, সে দিন এ বোমাটি দুই কিলোমিটারের মধ্যে যতগুলো কাঠের স্থাপনা ছিল সবগুলোকে মাটির সাথে সমতল করে দেয়। সেখানে ৫০০ মিটার বৃত্তের মধ্যে আলিশান দালানগুলো চোখের পলকে নেতিয়ে পড়ে। পাঁচ বর্গমাইল এলাকা মোটামুটি ছাই এবং ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল।

বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার সময়ে হিরোশিমা নগরীর লোকসংখ্যা ছিল প্রায় তিন লাখ ৫০ হাজার। সেই সময় থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত ৫ দিনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে এক লাখ ১৮ হাজার ৬৬১ জন নিরীহ মানুষ । ২০ হাজার সামরিক লোকও নিহত হয়। মোট কথা, আণবিক বোমা প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার জাপানির জীবন কেড়ে  নেয়।

আণবিক বোমা জাতির জন্য অভিশাপ। এ বোমার ভয়াবহতা বর্ণনাতীত। জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকির এই ধ্বংসযজ্ঞ বিশ্ব ইতিহাসে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। হিরোশিমা-নাগাসাকি দিবস এলে প্রতিবছর জাপানিরা নানা উপাসনায় শামিল হয়। প্রদীপ জ্বালিয়ে তারা মৃত্যুবরণকারীদের পারলৌকিক সদগতি কামনা করে। পঙ্গুত্ব বরণকারীদের জানায় সমবেদনা।

পারমাণবিক শক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর অঙ্গীকার নিয়ে নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার বার্ষিকী পালন হয় প্রতি বছর। তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ভয়াবহতা আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন নাগাসাকির লাখ লাখ মানুষ। আজও সেখানে জন্ম হচ্ছে বিকলাঙ্গ শিশুর। সে দুঃসহ স্মৃতি বিশ্ব শক্তিধরদের পারমাণবিক শক্তির নির্ভরতা কমিয়ে আনার পথে ফিরিয়ে আনতে পারবে তো!