ডেস্ক রিপোর্ট : আমাদের পড়শী আপার কথা বলছি। তার প্রথম সন্তানটি হয় মেয়ে। সেজন্য শশুরবাড়ির সবাই তার ওপর নারাজ হলো। বছরখানেক পেরিয়ে দ্বিতীয় সন্তান এলো তার কোলজুড়ে। সেটিও মেয়ে। এইবার তার স্বামী সোজা আঁতুড়ঘরে এলো। আপা ভয়ে ঐ নাজুক পরিস্থিতিতেই দরোজার আড়ালে লুকিয়ে রইলেন।

পাষন্ড স্বামী সেখান থেকে তাকে টেনে হেঁচড়ে বের করে আনলো। রাগে ক্ষোভে প্রচন্ড বেগে তার পেটে লাথি মারতে লাগলো। সঙ্গে ঘর ফাটিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো, ‘আর কখনও মাইয়া জন্ম দিবি ক? যদি তোর পেটে আবারও মাইয়া অয়, তাইলে তোরে তিন তালাক দেবো।’ আপা দুঃখে, ভয়ে অনেকদিন আর শশুরবাড়ি যাননি। ওরাও কেউ আর দেখতে আসতো না। এমনটা করে অনেকদিন পেরোয়।

শেষ মেষ আমাদের সবার মতামতে আবার শশুরবাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হন তিনি। এর দু’বছর পরের কথা। আবার সন্তানসম্ভবা হন আপা। পাগলের মতো সবাইকে ফোন করে বলতে লাগলেন, ‘তোমরা এবার আমার জন্য একটুখানি দোয়া কইরো, আল্লাহ যেনো এবার আমারে একটা ছেলে দিয়ে রক্ষা করে।’ একদিন আমি তাকে দেখতে যাই। তখন আমায় জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘বোন রে! তুই একটু দোয়া কর আমার জন্য, যেনো এবার অন্তত ছেলে হয়।’ সেদিন আমি তাকে দেখেছি বুকে মেয়ে জন্মাবার ঘৃণা পুষতে।

হঠাৎ করে একদিন পাল্টে গেলো তার শশুরবাড়ির দৃশ্যপট। সাউন্ডবক্সে গান বাজলো। নেচে খেলে বড় উল্লাসে সাজলো তার শ্বশুরালয়। শশুরকূলের সব স্বজন হাজির হলো। বাড়ি বাড়ি মিষ্টি বিতরণ করা হলো। আমাদের আর বুঝতে বাকি রইলো না, আপা এবার একটা ছেলে সন্তানের মা হয়েছেন।

কন্যাসন্তানকে এখনও সমাজে অবহেলার চোখে দেখা হয়। সদ্য প্রসবিত কন্যাসন্তান এবং তার জননীকে এই আধুনিক যুগেও প্রতিনিয়ত পোহাতে হচ্ছে লাঞ্চনার গ্লানি। অথচ প্রিয় নবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘কারোর কন্যা সন্তান ভূমিষ্ট হলে আল্লাহ তায়ালা একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। যিনি এসে ঘোষণা দেন, হে ঘরের অধিবাসীরা! তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এরপর ঐ ফেরেশতা কন্যাশিশুটিকে তার রহমতের কোলে নেন। তার মাথায় হাত রেখে বলতে থাকেন, এই সন্তান দুর্বল। দুর্বল প্রাণ থেকেই এর সৃষ্টি। 

যে ব্যক্তি মেয়েটিকে প্রতিপালন করবে, কেয়ামত অবধি মহান আল্লাহর সাহায্য তার সঙ্গে থাকবে।’ হাদিসটি দ্বারা বোঝা যায়, যে ঘরে কন্যাসন্তান জন্মলাভ করে, সেই ঘর আল্লাহ ও তার ফেরেশতাদের কাছে অত্যন্ত বরকতময়। রাসুল (সা.) কন্যাসন্তানদের খুব ভালবাসতেন।

এরশাদ করেন, ‘যার তিনটে কন্যাসন্তান জন্মে এবং সে তাদের উত্তমভাবে লালনপালন করে, সে ঐ কন্যাসন্তানদের উসিলায় জান্নাতে যাবে।’ কন্যাসন্তান কেবল দুনিয়ার জন্যই নয়, আখেরাতের জন্যও কল্যাণবাহক। পরিবারে বাবা-মায়ের খেদমত সাধারণত কন্যাসন্তানরাই বেশি করে। তাই হেলা না করে তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা আবশ্যক। আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের অধিকার, দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করা জরুরি।

কন্যাসন্তানরা সমাজের বোঝা নয়, তাদের মাধ্যমেই ইসলামে ঘর-পরিবারের বড় বড় কাজ আঞ্জাম হয়েছে, আজও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে।