banglanewspaper

শিরোনাম দেখে আশ্চর্য লাগছে? আপনার আশ্চর্য লাগলেও লাগতে পারে, কিন্তু এটাই সত্যি! আকাশ ছুঁয়েছে মাটিকে। মেঘ ছুঁয়েছে পাহাড়। ঝর্ণা ছুঁয়ে গেছে নদীকে। মেলেছে দু’হাত প্রকৃতির আধার। পাহাড়ের পিঠ বেয়ে চলা প্রশস্ত ঢাল মিলিয়ে গেছে সমতল ভূমি হয়ে। বিস্তৃত উঁচু পাহাড় জুড়ে বসেছে সবুজ প্রান্তর। সবুজে ঘেরা আর পাখপাখালিতে ভরা বন-বাঁদাড়। নূুয়েছে মেঘবালিকা। পৃথিবীর এ যেন এক মনোরম ভূ-স্বর্গ। সেটি এখন নতুন পর্যটন জোন। ওই স্পটটির নাম সাজেকভ্যালি। বাংলাদেশের পর্যটনের জন্য অপার সম্ভাবনা। সম্ভাবনাময় ওই সাজেকভ্যালি কাজে লাগালে সেটি হতে পারে বাংলাদেশের দার্জিলিং।

সাম্প্রতিক সময়ে কল্পনাতীত পরিবর্তন ঘটেছে সাজেকের। নতুন অনেক কিছুই যোগ হয়েছে সেখানে। বিদ্যুৎ নেই ঠিকই; আছে সোডিয়াম লাইট, বায়ো-বিদ্যুৎ। মসৃণ সড়ক, থ্রি স্টার মানের হোটেল, রিসোর্ট, ক্লাবও গড়ে উঠেছে। আর সে কারণেই প্রাকৃতিক নিসর্গে সাজানো সাজেক এখন পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। পর্যটনবান্ধব সাজেক প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এক সময়ের দূর্গম সাজেকে এখন রাতের চিত্রও ভিন্ন। রুইলুইপাড়াতে রাতে জ্বলছে সোডিয়াম বাতি, তাও আবার স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির সোলার সিস্টেমের মাধ্যমে। সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ মেলে তাকালেই মনে হবে, মেঘের চাদর ঢেখে রেখেছে সাজেককে। 


এক নজরে সাজেক: সাজেক ইউনিয়ন রাঙামাটি জেলায় অর্ন্তগত হলেও সড়ক পথে যোগাযোগ করতে হয় খাগড়াছড়ি দিয়ে। খাগড়াছড়ি জেলা শহর থেকে সাজেকের দূরত্ব আনুমানিক ৭৫ কিলোমিটার। আঁকাবাঁকা সর্পিল পাহাড়ি পথ ফেরিয়ে যেতে হয় সাজেকে। যেতে যেতে চোখ ও মন আটকে যাবে পাহাড়ি নদী কাচালং-মাচালং এর বয়ে চলা ও পাহাড়-ঝর্ণা দেখতে দেখতে। রুইলুই থেকে সাজেক পর্যটন কেন্দ্র শুরু। রুইলুই গ্রামে পাংখো, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠির বসতি গুলো সম্প্রদায়ের বসবাস। তাদের বসতিগুলো(মাচাং) নির্মিত বাংলাদেশের পতাকার আদলে। ছনের ছাউনি ও চারদিকে বাঁশের তৈরী লাল-সবুজ রঙের বেঁড়া। বাড়িতে বাড়িতে সোলার প্যানেল। দেখেই মনে হবে এঁরা কতটুকু সাশ্রয়ী ও দেশপ্রেমিক। প্রাকৃতিক নৈসর্গিক জীবনে তাদের মাঝে নেই জটিলতার কোন ছোঁয়া। সাজেকে গিয়ে অনেকে হারিয়ে যেতে পারেন আপন মনের কোন এক স্বপ্নিল রাজ্যে।

পর্যটকদের জন্য সাজেকে রয়েছে: রুইলুই পাড়ায় সেনাবাহিনী ও স্থানীয়দের সার্বিক সহযোগিতায় পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে বেশকিছু স্পট। কংলাকের পাথর দিয়ে স্টোন গার্ডেন, অ্যাডভেঞ্চার পার্ক, হেলিপ্যাড, ছায়াবীথি, রংধনু ব্রীজ ও কফি হাউস। এছাড়া রাস্তার দুই পাশে রয়েছে আরো বেশকিছু বিনোদন স্পট।

কংলাক থেকে সাজেক: সাজেকের সর্বোচ্চ পাহাড় কংলাক পাহাড়। কংলাকের পর থেকে ভারতের সীমান্ত শুরু। রুইলুই পর্যটন স্পট থেকে ঘন্টা-দেড়েক এর পথ কংলাক পাহাড়। কিছুটা গাড়ি চেপে গেলেও অনেকটা পথ পায়ে হাটঁতে হয়। কংলাক পাহাড়ে ২০-২৫টি পাংখোয়া (আদিবাসি) পরিবার বাস করে। দীর্ঘ পথ হেটে ও পাহাড় ঠপকিয়ে পাংখোয়াদের কংলাকে বসবাসের কারণ হচ্ছে ধর্মীয় বিশ্বাস। তাদের ধর্মীয় পুরাণ মতে সর্বোচ্চ চূড়ায় সৃষ্টিকর্তা সর্বদা বিরাজ করে। কংলাকে বেশকিছু পাথরের সমাধি রয়েছে। যেগুলো ব্রিট্টিশ আমলে নির্মিত বলে ধারণা সেখানকার অদিবাসীদের। কংলাক পাহাড় থেকে সাজেকের মূল সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়।

সাজেকে রাত্রিযাপন: সাজেকে রাত্রিযাপন না করলে ষোল আনায় বৃথা। কারণ সাজেকের মূল সৌন্দর্য্যতা দেখা যায় রাতে ও ভোরে। রাতের সাজেকে যেন সহস্রাধিক তারার(স্টার) মেলা বসে। মাঝে মাঝে চোখে পড়ে দ্রুতগতিতে তারা খসে পড়া। আর ভোরের সাজেকে যেন অন্য এক আবহ সৃষ্টি হয় প্রকৃতিতে। উচুঁ-নিচুঁ পাহাড়ের সারিগুলোকে শুভ্র মেঘ যেন  স্নান করিয়ে দিয়ে যায়। এই রূপ সত্যই অপরূপ। যা না দেখলে সাজেক দেখা অপূর্ণ রয়ে যায় বটে। সাজেকে রাত্রিযাপন করতে চাইলে আগে থেকে রিসোর্ট-হোটেলগুলোতে বুকিং করে রাখতে হয়। রিসোর্ট ছাড়াও সাজেকে রাত্রিযাপনে কমিউনিটি ট্যুরিজম ব্যবস্থাও চালু রয়েছে। ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখোয়া আদিবাসীদের মাচাং ঘরে আপনি/আপনারা হতে পারেন রাত্রিযাপনের অতিথি। পেয়িং গেষ্ট হিসেবে আপনাকে রাখবে এরা।

সাজেক যাওয়ার পরিবহন ব্যবস্থা: ঢাকা কিংবা যেকোন স্থান থেকে প্রথমে আসতে হবে খাগড়াছড়ি। খাগড়াছড়ি থেকে মাইক্রো, কার, জীপগাড়িতে চেপে সাজেক যাওয়া যায়। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকের গাড়ী ভাড়া- জীপ গাড়ী আসা যাওয়ায় ৫ হাজার টাকা তবে রাত্রিযাপন করলে গুণতে হবে ৭-৮ হাজার টাকা। এছাড়া মাইক্রো-কার ভাড়া ৭-৮ হাজার টাকা।

কম খরচে ও উন্নত পরিবেশে থাকতে-খেতে চাইলে সেনি লুসাই রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্টে। এখানে জনপ্রতি ১০০-২০০ টাকার মধ্যে দুপুরের খাবার বা রাতের খাবার পাবেন।

অগ্রিম বুকিং ও খাবারের অর্ডার দিতে ফোন করতে পারেন এই নম্বরে—০১৮৭৯৪৫৬২৩৩, ০১৮৮১৬৮৪৮৩১।

এ ছাড়া আরো রয়েছে, যেমন—ডোর ইন রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, জলবুক রিসোর্ট, য়ারুং রিসোর্ট (০১৮৭৬১০০৬৫৬, ০১৮৬৫০৫৪৫০৫, ০১৭৩৭৪৪৩৩০৯), নিরিবিলি রিসোর্ট (০১৮৬৬৯৫৯৭৭৯, ০১৮৬৬০৩৫৮২৫), আলো রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি। সাজেকের রুইলুই পর্যটনকেন্দ্রটি মূলত একটি আদিবাসী গ্রাম। গ্রামটিকেই পর্যটনকেন্দ্র ঘোষণা করে গ্রামের মাঝখানে সুউচ্চ সাজেক রিসোর্ট নির্মাণ করে পর্যটনে রূপ দেওয়া হয়েছে। ত্রিপুরা ও লুসাই জনগোষ্ঠীরা এখানে সেই ১৮০০ সাল থেকে বসবাস করে আসছে বলে জানা যায়। বর্তমানে এ পর্যটন এলাকায় দুটো গ্রাম (দক্ষিণ রুইলুই ও উত্তর রুইলুই) মিলে ৯০ ত্রিপুরা পরিবার ও ১৭ লুসাই পরিবার রয়েছে বলে জানিয়েছেন উত্তর রুইলুইপাড়ার বাসিন্দা কুকিন্দ্র ত্রিপুরা। পর্যটনটি সরাসরি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে বলেও জানা যায়। নামে রুইলুই পর্যটনকেন্দ্র হলেও এর বিস্তৃতি প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের কংলকপাড়া পর্যন্ত। দর্শনার্থীদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানের মধ্যে কংলক পাহাড়টি।

ট্যাগ: