এবিএম আতিকুর রহমান বাশার : দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আলোকিত নারীদের জাতীয় সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সরকার  স্থাপন করেছে ‘জয়িতা’ বিপনন কেন্দ্র। এ সংস্থার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য ও সেবা বিপণন এবং বাজারজাত করণের লক্ষ্যে জয়িতার মাধ্যমে একটি নারী উদ্যোক্তা বান্ধব আলাদা প্রতিষ্ঠান পর্যায়ক্রমে সারা দেশব্যপী গড়ে তোলার প্রয়াস নেয়া হয়েছে। এতে করে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে গতি সঞ্চারিত হবে; নারীর কর্মসংস্তানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। নারী পুরুষের বৈষম্য হ্রাস পাবে। সর্বোপরি নারীর ক্ষমতায়ন এবং পর্যায়ক্রমে দেশের দরিদ্র বিমোচন হবে। 

সম্প্রতি জয়িতাদের অন্বেষণে মহিলা অধিদপ্তর দেবীদ্বার দপ্তর কর্তৃক অর্থনৈতিক ভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী, শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী, সফল জননী নারী, নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছে যে নারী, সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী এই ৫ ক্যাটগরিতে জয়িতা সম্মাননা পেয়েছেন তারা হলেন-

১) অর্থনৈতিক ভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী শাহিনূর বেগম : 

দেবীদ্বার উপজেলার রসুলপুর গ্রামের শাহিনূর বেগম, অর্থনৈতিক ভাবে সাফল্য অর্জনকারী একজন সফল নারী। স্বামী মোঃ জাকির হোসেনও একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। মাতা হোসনেয়ারা বেগম একজন গৃহিনী। শাহিনূর তার পারিবারিক আর্থিক স্বচ্ছলতা আনয়নে নিজ উদ্যোগে গাভী পালন শুরু করেন। পাশাপাশি এলাকার পুকুর, দিঘী ইজারা নিয়ে মাছ চাষও শুরু করেন।

এখন তিনি খামারী হিসেবে তার গাভী ও মৎস খামারে একা শ্রমদানে কুলিয়ে উঠতে পারেন না। তাই তিনি তার খামারগুলো দেখাশোনার জন্য এলাকার দরিদ্র ২ জন মহিলা ও ২জন পুরুষ কর্মচারি নিয়োগ করেছেন।

তার এ উদ্যোগে আগ্রহী হয়ে এলাকার আরো ৪ উদ্যোক্তা গরু মোটাতাজাকরণ ও দুগ্ধ খামার তৈরি করেছেন।

২) শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী মোসা: কুহীনূর আক্তার :

কুহীনূর আক্তার একজন প্রতিবাদী নারী। সে দেবীদ্বার উপজেলার ওয়াহেদপুর গ্রামের অধিবাসী। স্বামী- মোঃ বাহাদূর হোসেন, মাতা- নিলুফা হক। ১৯৯৮ সাল থেকে ‘ব্র্যাক সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচীর ওয়াহেদপুর ২নং পল্লী সমাজের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। যেখানে সমস্যা সেখানেই ছুটে যান।

এলাকার উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ড ছাড়াও যৌতুক, বাল্য বিয়ে, ইভটিজিং, মাদক, সন্ত্রাস, নারী ও শিশু নির্যাতন সহ মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত কর্মকান্ড প্রতিরোধ এবং এসব বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে একজন সফল নারী হিসেবে এলাকায় সমাদৃত। মাটি ও মানুষের পাশে থাকা এ নারী বর্তমানে সুবিল ইউনিয়ন পরিষদ’র ৪, ৫, ৬নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা আসনের নির্বাচিত সদস্য।

তার এ ধরনের জাতীয় সামাজিক কর্মকান্ডে এলাকার নারী সমাজের অধিকার ও ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে।

৩) সফল জননী নারী অহিদা বেগম : 

অহিদা বেগম দারিদ্রের কুন্ডলীতে বসবাস করে এবং পারিবারিক স্বাস্থ্য সেবা অধিদপ্তর থেকে দাইয়ের প্রশিক্ষণ নিয়ে অদ্যবধি এলাকার প্রসূতী নারীদের বাচ্চা প্রসবে সাহায্য করে আসছেন। তিনি এলাকার প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রসূতীর নিরাপদ বাচ্চা প্রসবে সহায়তা করেছেন। পাশাপাশি মাত্র একটি সেলাই মেশিনকে পরিবারে আয়ের উৎস হিসেবে নিয়ে ৩ পুত্র ও ১ কন্যাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন, মানসিক দৃঢ়তা ও শক্তিতে হয়েছেন একজন আদর্শ মা।

অহিদা বেগম দেবীদ্বার উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের তালতলা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মৃত: আদুল খালেক’র স্ত্রী। মাতা হাজেরা বেগম। তার বড় ছেলে মোঃ আজিমুল হায়দার এম.এ (ইসলামের ইতিহাস) বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রথম শ্রেণীর সার্জেন্ট হিসেবে কর্মরত। মেজো ছেলে মোঃ নাজিমুল হায়দার বি.বি.এ, এম.বি.এ সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ছোট ছেলে মোঃ ওয়াশিমুর হায়দার এম.কম হিসাব বিজ্ঞান, বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে উপ-পরিদর্শক (এস,আই) পদে কর্মরত আছেন। একমাত্র কন্যা খালেদা আক্তার বি.এস.এস পাশ করেছেন।

তার সন্তানেরা অত্যন্ত মেধাবী হওয়ায় শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ধাপে তাদের বৃত্তি প্রাপ্ত আর্থিক অনুদান শিক্ষা ও পারিবারিক জীবনে অনন্য অবদান রেখেছে।

৪) নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা নারী মোসা: রাশিদা বেগম : রাশিদা বেগম উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের গোপালনগর গ্রামের মৃত: আবু জাহের’র স্ত্রী, মাতার নাম হাজেরা বেগম। আর্থিক অনটনে পারিবারিক ভাবে নির্যাতিতা নারী হয়েও দৃঢ়তা, ধৈর্য আর মনোবল নিয়ে ঘুরে দাড়াতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।

ভূমিহীন সমিতির সাথে যুক্ত হয়ে সমাজের নির্যাতন, বৈষম্য প্রতিরোধ এবং উন্নয়নে নিজেকে একজন সংগঠক হিসেবেও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। রাশিদা বেগম নারী নির্যাতন, যৌতুক, বাল্য ও বহুবিবাহ প্রতিরোধ সম্পর্কে উঠোন বৈঠকে নারীদের সচেতন করে থাকেন। তিনি শিক্ষার আলো থেকে ঝরে পড়া শিশুদের বিদ্যালয়মূখী করা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উল্লেখযোগ্য দিবসগুলোর তাৎপর্য তুলে ধরে সচেতন করা এবং দিবসগুলো নিয়মিত পালন করা, খুন, ধর্ষণ, ইভটিজিং, ফতোয়া সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, ভূমিহীনদের খাস জমি পাইয়ে দেয়াসহ নানা অনিয়ম, দূর্নীতি প্রতিরোধ, অধিকার বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা আর সংগ্রামে লড়াকু ভূমিকা রাখার আন্দোলনে প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

তার অগ্রসর কর্মকান্ডের সামাজিক স্বীকৃতি স্বরূপ রসুলপুর ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়াও আব্দুল্লাহপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ সদস্য, আব্দুল্লাহপুর হাজী আমির উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ সদস্য, গোপালপুর কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনা কমিটির সদস্যসহ বিভিন্ন সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

৫) সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা নারী শিরিন সুলতানা : শিরিন সুলতানা দেবীদ্বার সদরের থানা গেইট এলাকার ‘লন্ডন হাউজ’র বাসিন্দা। পিতা মৃত: ডাঃ সালেহ আহমদ, মাতা অজুফা বেগম। গ্রামের বাড়ি উপজেলার নারায়নপুর।

তিনি প্রায় ৫০ জন নির্যাতিত নারীকে সামাজিক সালিসের মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। প্রায় ৩০টি বিদ্যালয়ে মেয়েদের স্যানিটেশনের ওপর সচেতন করার জন্য ক্যাম্পেইন করেছেন। ২৫০ জন জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সম্মান ও উৎসাহ প্রদানে আনুষ্ঠানিকভাবে ফুল ও উপহার দিয়ে বরণ করেছেন। অনেক দরিদ্র ছাত্রীকে আর্থিক সাহায্য করে লেখাপড়া করার সুযোগ করে দিয়েছেন।

এছাড়াও তিনি সবসময় চেষ্টা করেন অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে।