banglanewspaper

মনিরুজ্জামান মনির (খৈয়াছড়া থেকে ফিরে) : মায়াবী এক ঝর্ণা, যার নাম খৈয়াছড়া। যার পরতে পরতে ছুঁয়ে আছে প্রকৃতির এক অনাবিল পরশ। যার পরশ পেতে আমরা চলে যাই এই জলপ্রপাতে। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের (Mirsharai) পাহাড়ে অবস্থিত এই জলপ্রপাত। বিস্ময়কর এই ঝর্ণাটির নয়টি স্টেপ। খৈয়াছড়া আকার আকৃতি ও গঠনশৈলির দিক দিয়ে এটা নিঃসন্দেহে এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝর্ণাগুলোর একটি।

এর মোট নয়টি মূলধাপ এবং অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন ধাপ প্রমাণ করে যে এমন আর একটি ঝর্ণাও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।

 

খৈয়াছড়াতে সব সময় জ্বলে (এমন কি বৃষ্টিতেও) এমন একটি পাহাড় আছে, সেখানে আগুন কখনও নিভে না। প্রকৃতির এই রহস্য মানুষের কাছে এখনো অজানা। প্রকৃতির নান্দনিক তুলিতে আঁকা সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছে দেশের ভ্রমণপিয়াসী মানুষ। অনেকে রাতের বেলায় চাঁদের আলোয় ঝর্ণার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পাহাড়ের পাদদেশে তাবু টাঙ্গিয়ে অবস্থান করেন। ঝুম ঝুম শব্দে বয়ে চলা ঝর্ণাধারায় গা ভিজিয়ে মানুষ যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ থেকে নিজেকে ধুয়ে সজীব করে তুলছে খৈয়াছরা ঝর্ণায়।

 

দুর্গম পাহাড়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখিন হতে পারেন।

 

তবে উপরে উঠে সবাই সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে অসাবধানতাবসতঃ নিজের বিপদ ডেকে আনবেন না। কারণ নিচে পড়ে গেলে বাঁচার কোন পথই খোলা থাকবে না।

জায়গাটা মিরসরাই ঠাকুরদা দিঘির আগেই পড়ে। গ্রামের সবুজ শ্যামল আঁকাবাঁকা মেঠো পথ পেরিয়ে শরীরটা একটু হলেও ভিজিয়ে নেয়া যায় নিঃসন্দেহে। মিরসরাইয়ের এই খৈয়াছড়ায় নয় স্তরের ঝর্ণা দেখতে দেশি বিদেশি পর্যটকের ভিড় জমে। দেশের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক ঝর্ণাটি দেখতে প্রতিদিন ছুটে যাচ্ছে হাজার হাজার দেশি বিদেশি পর্যটক। খৈয়াছড়া এলাকার পাহাড়ে অবস্থান বলে এর নামকরণ করা হয়েছে খৈয়াছড়া ঝর্ণা। মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪.২ কিলোমিটার পূর্বে ঝর্ণার অবস্থান। এর মধ্যে এক কিলোমিটার পথ গাড়িতে যাওয়ার পর বাকি পথ যেতে হবে পায়ে হেঁটে।

 

বাঁশের সাকো, ক্ষেতের আইল, আঁকাবাকা পাহাড়ি পথ, অন্তত চারটি পাহাড় পেরিয়ে যখন ঝর্ণার স্বচ্ছ জলে যখন গা ভিজাবেন, তখন মনে হবে পথের এই দূরত্ব খুব সামান্যই।

সত্যি এটা এতটাই অপরুপ যে প্রকৃতিপ্রেমীদের মনকে নাড়া দিয়ে যাবে।

 

তবে নবম স্তরে যাওয়াটা বেশ কষ্টসাধ্য বটে। এর জন্য ট্র্যাকিং এর অভিজ্ঞতা না থাকলে বিপদ যেকোনো সময় হানা দিতে পারে। রশি বেয়ে গাছের শিকড় ধরে আপনাকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে। এর শেষের দিকে নবম স্তরে পাবেন প্রকৃতির তৈরি বাথটাব যেটাতে সবাই গা ভেজাতে পারবেন অনায়াসেই।

 

নবম স্তর থেকে নামার সময় সোজা উপরের দিকে একটা পাহাড় আছে যার উপর উঠলে পুরো শহরের চমৎকার এক ছবি দেখতে পাবেন।

 

ফিরে আসার পথে ক্লান্ত হয়ে যখন খাবার জন্য হোটেলে বসবেন তখন ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ এরকম কিছু মনে হতে পারে। ক্ষুধাটা এতো বেশি লাগবে যে সামনে যা পাবেন তাই খেতে ইচ্ছে করবে। এখানে অনেকগুলো হোটেল পাবেন ছোট ছোট টঙ ঘরের মতো। যেমন ঝর্না হোটেল, সালাউদ্দিন হোটেল ইত্যাদি। তবে যাওয়ার পূর্বে খাবার অর্ডার দিয়ে যাবেন।

ছুটির দিনগুলোতে এখঅনে পর্যটকেরা সবুজের সমারোহ, পাহাড় আর ঝর্ণার অপরূপ মেলবন্ধন দেখতে ভিড় করেন। পাহাড়ের সবুজ রং আর ঝর্ণার স্বচ্ছ জল মিলেমিশে একাকার হয়েছে মিরসরাইয়ের প্রাকৃতিক জলপ্রপাত খৈয়াছড়া ঝর্ণায়। প্রকৃতির নান্দনিক তুলিতে আঁকা এ ছবি দেখে মুগ্ধ হচ্ছে দেশের ভ্রমণপিয়াসী মানুষ।

যাওয়ার উপায় :

ঢাকার যেকোনো বাস কাউন্টার থেকে চট্টগ্রামগামী বাসে উঠবেন। যাওয়ার পথে ঢাকা চট্টগ্রাম রোডে চট্টগ্রামের মিরসরাই পার হয়ে বড়তাকিয়া বাজারের আগে খৈয়াছড়া আইডিয়াল স্কুলের সামনে নামবেন। পথে যানজট না থাকলে ৪/৫ ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন মিরেরসরাই। ঢাকার ফকিরাপুল, সায়দাবাদ থেকে সোহাগ পরিবহন, গ্রীন লাইন পরিবহন, সৌদিয়া পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, টিআর ট্রাভেলসের এসি বাস চলাচল করে চট্টগ্রামে। এসি বাস ভাড়া ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকা। এছাড়া শ্যামলী, হানিফ, সৌদিয়া, ইউনিক, এস আলম ইত্যাদি পরিবহনের নন এসি বাসও চলে এ পথে। ভাড়া ৪৮০ টাকা।

বড়তাকিয়া বাজারে খৈয়াছড়া আইডিয়াল স্কুলের কাছে গিয়ে স্থানীয় লোকদের জিজ্ঞাসা করলেই তারা বলে দেবে কোন পথে যেতে হবে। ঢাকা চট্টগ্রাম রোডে নেমে পূর্বদিকে গ্রামের রাস্তা ধরে দশ মিনিট হাঁটলে পথে রেললাইন পড়বে, রেললাইন পার হয়ে আরো দশ মিনিট হাঁটলে ঝিরি পাবেন। ইচ্ছে করলে ঢাকা চট্টগ্রাম রোড থেকে ঝিরি পর্যন্ত আপনি সিএনজি নিয়ে (১০০ টাকা লাগবে) যেতে পারবেন। ঐখান থেকে আপনাকে খৈয়াছড়া ঝর্ণার মূল ট্র্যাকিং শুরু করতে হবে।

জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পাহাড়ি ঝিরিপথ ধরে প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটলে দেখা পাবেন ঝর্ণার। হাতে সময় নিয়ে যাওয়া ভালো, ঝর্ণা দেখে ফিরতে ফিরতে বেশ সময় লাগবে। খাবার সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারেন, তবে ঝর্ণায় যাওয়ার পথেই অন্তত তিনটি জায়গায় দেখা মিলবে স্থানীয় হোটেলের, চাইলে সেখান থেকেও খেয়ে নিতে পারেন। খাবারের দাম তুলনামূলক সস্তাই হবে।

যদি দুই দিন সময় নিয়ে যান তবে সাথে ঘুরে আসতে পারেন নাপিত্তাছড়ার তিনটি ঝর্ণা, সীতাকুন্ড ইকো পার্কে সুপ্তধারা ঝর্ণা, সহস্রধারা ঝর্ণা, মহামায়া লেক ও ঝর্ণা, মহুরী প্রজেক্ট ও উইন্ডমিল। এছাড়াও আরো সময় থাকলে যেতে পারেন চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ওপরে যেখান থেকে বঙ্গোপসাগর দেখা যায়।

থাকার জায়গা :

বড়তাকিয়া বাজারে থাকার কোন হোটেল নেই। চট্রগ্রাম যাওয়ার পথে ছোট্ট একটা বাজার। কিন্তু আপনি চাইলে চেয়ারম্যানের বাংলোয় উঠতে পারেন। মিরসরাই বা সীতাকুন্ডে থাকার জন্য বেশ কিছু স্থানীয় হোটেল পাবেন। মিরসরাই বা সীতাকুন্ডে খাওয়ার জন্য অনেক রেস্টুরেন্টও পাবেন।

গাইড পাবেন যেভাবে :

খৈয়াছড়া যাবার আগে পথে বেশ কিছু দোকান পাবেন। আর দোকানগুলোতে যোগাযোগ করলেই পেয়ে যাবেন গাইড। তবে দরদাম করে নিবেন। এখানে ১৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দর হাকাতে পারে। আমরা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ২৫০ টাকা আকবর নামের নবম শ্রেণি পড়ুয়া এক ছেলেকে গাইড হিসেবে ভাড়া করি। সে-ই আমাদের ছবি তোলা থেকে শুরু করে আমাদের ব্যাগ বহনের কাজ করে। তবে গাইড না নিলে যারা প্রথমবার যাবেন তারা অনেক কিছুই মিস করতে পারেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :
ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তা বেশ দুর্গম এবং পাথরের জায়গা পিচ্ছিল থাকতে পারে। তাই সতর্ক হয়ে পথ চলবেন। মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ওই দুর্গম রাস্তা পাড়ি দিয়ে ফিরে আসা অনেক কঠিন হবে। তাই ট্র্যাকিং সহায়ক জুতা নিতে ভুলবেন না। তবে অবশ্যই পরিবেশ নোংরা করবেন না। সাথে নেয়া চিপস, পানির বোতল ইত্যাদি ফেলে আসবেন না।

ট্যাগ: