banglanewspaper

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের বীর সন্তানদের আত্মত্যাগের ইতিহাস ভবিষ্যত প্রজন্মকে জানানো এবং মুক্তিযুদ্ধে প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে জনসচেতনতা গড়ে তোলার জন্য সম্মুখ সমরের স্থানগুলো সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। কিন্তু অনিয়মের কবলে পড়ে দায়সারাভাবে শেষ করা হয়েছে ১০ জেলার ১৪টি উল্লেখযোগ্য সম্মুখসমরের স্থান সংরক্ষণের কাজ।

কোথাও কোথাও কাজ এখনো বাকি রয়ে গেছে
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে নিম্নমানের রড ও বালু ব্যবহার, অদক্ষতা, ঠিকাদারদের অনিয়ম, নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ এমনকি স্মৃতিস্তম্ভে বাংলাদেশের মানচিত্র উল্টোভাবে তৈরি করা হয়েছে বলেও প্রমাণ পেয়েছে বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।

তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অযৌক্তিকভাবে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধকালীন উল্লেখযোগ্য সম্মুখ সমরের স্থানগুলো সংরক্ষণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের কাজ।

জানা যায়, ২০০৮ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া দুই বছর মেয়াদি এ প্রকল্পটির ব্যয় ছিলো ৫ কোটি ১১ লাখ টাকা। পরে মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত আর প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০ কোটি ১০ লাখ টাকা। এ সময়েও শেষ হয়নি প্রকল্পের সব কাজ। কিন্তু টাকা শেষ হয়ে গেছে। অব্যাহতি নিয়েছেন প্রকল্প পরিচালকও। 
তবে প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ মুজিবুল হক বলেন, প্রকল্পের সব কাজ মোটামুটি শেষ হয়েছে। কিন্তু ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হক মারা যাওয়ার কারণে ছাগলনাইয়া ও পরশুরাম প্রকল্পের কিছু ‍অংশের কাজ এখনো বাকি আছে।

প্রকল্পের অনিয়ম বিষয়ে তিনি পিডব্লিউডি’র ওপর দায়ভার ‍চাপিয়ে দিয়ে বলেন, এখন আমি আর এ প্রকল্পে নেই।

প্রকল্প স্থানের মধ্যে রয়েছে- চট্টগ্রামের কুমিরা, ফেনীর ছাগলনাইয়ার সলিয়া ও পরশুরামের শুভপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ, কসবা ও আখাউড়া, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ, জামালপুরের কামালপুর, টাঙ্গাইলের জাহাজমারা, দিনাজপুরের হিলি, খুলনার শিরোমণি, কুড়িগ্রামের চিলমারী এবং গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী।

আইএমইডি’র প্রতিবেদনে টাঙ্গাইলের জাহাজমারা, ফেনীর সলিয়া ও শুভপুর স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ তদারকি করে বলা হয়, এসব প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। এছাড়াও নির্মাণ পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ ও হস্তান্তর নিয়েও রয়েছে সংশয়।

এ তিনটি কাজেরই প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবে (ডিপিপি) অনুমোদনের চেয়ে বেশি টাকায় কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও এসব স্থানে নির্মাণ কাজে ৪০ গ্রেডের রড ব্যবহার করা হলেও এগুলো বাজারে প্রচলিত কোনো নামকরা ব্র্যান্ডের নয়। এমনকি এগুলো কোন ব্র্যান্ডের তাও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী বা ঠিকাদার জানাতে পারেননি।

সলিয়া স্মৃতিস্তম্ভে মানচিত্র উল্টো করে তৈরি
ফেনীর পরশুরামের সলিয়া স্মৃতিস্তম্ভে বাংলাদেশের মানচিত্র উল্টো করে তৈরি করা হয়েছ। আইএমইডি কর্তৃপক্ষ পরিদর্শনের সময় এটি সংশ্লিষ্টদের নজরে আনা হলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী মানচিত্রটি ভেঙে সঠিকভাবে নির্মাণের নিশ্চয়তা দেন।

নির্মাণ কাজে ধীরগতি
ফেনীর পরশুরামের সলিয়া স্মৃতিস্তম্ভের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের জন্য ২০১২ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে  ঠিকাদারকে ৬ (ছয়) মাস মেয়াদি কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ফেনীর গণপূর্ত অধিদফতরের কার্যালয়ের অগ্রগতির প্রতিবেদনে দেখা যায়, সীমানা প্রাচীর নির্মাণের বাস্তব অগ্রগতি ৮০ শতাংশ।

এছাড়াও মূল স্মৃতিস্তম্ভের বাইরে এবং সীমানা প্রাচীরের ভেতরে স্মৃতিস্তম্ভের পুরো জায়গায় ভূমি থেকে ১০ ফুট উঁচু পর্যন্ত বালু দিয়ে ভর্তি করার কথা। এ বালু ভরাটের কাজটি গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের আগেই সম্পন্ন করার কথা থাকলেও পরিদর্শনের দিনেও এ কাজ শুরু হয়নি।

জানা গেছে, প্রায় ১ কিলোমিটার দূরের নদী থেকে ড্রেজিং করে পাইপলাইনের মাধ্যমে এখানে বালি আনার কথা থাকলেও তার কোনো প্রস্তুতি দেখা যায়নি।
এছাড়াও শুভপুরে মূল স্মৃতিস্তম্ভ ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের জন্য ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদও ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। কিন্তু এ দুটি নির্মাণ কাজের বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে যথাক্রমে ৯০ শতাংশ ও ৪০ শতাংশ।

শুভপুর স্মৃতিস্তম্ভের সীমানা প্রাচীরে বালু না থাকা
ডিজাইন অনুসারে চিত্রে চিহ্নিত স্থানটি বালি দ্বারা ভরাট করার কথা। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী জানান, স্থানটি বালি দিয়ে ভরাট করা হয়েছিল কিন্তু গত বছরের বর্ষার সময় সীমানা প্রাচীর না থাকায় বালি সরে গিয়েছে।

যদিও পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল বলে আসছেন, প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। অহেতুক কালক্ষেপণ করা যাবে ‍না। দরকার হয়, অল্প প্রকল্প হাতে নিয়ে যথাসময়ে বাস্তবায়ন করবো। বেশি প্রকল্প হাতে নিয়ে বার বার সংশোধনের কোনো মানে হয় না।

ট্যাগ: