banglanewspaper

১৯৭১, মহান মুক্তিযুদ্ধের বছর। যাদের অংশগ্রহণে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয় তারাই তো মুক্তিযোদ্ধা? স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গুটিকয়েক পাকিস্তানি প্রেমিক ছাড়া প্রায় সবাই কোনো না কোনভাবে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

তবে মুক্তিযুদ্ধে যারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন তাদেরকে সম্মানিত করতেই দেওয়া হয় মুক্তিযোদ্ধা সনদ। বিভিন্ন সরকারের সময় মুক্তিযোদ্ধার তালিকা সংশোধন ও পরিবর্ধন হয়েছে, এখনও হচ্ছে।
সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই দেশের শীর্ষ ছয় আমলার (সচিব) মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়াকে কেন্দ্র করে চলছে নানা সমালোচনা। অভিযোগ রয়েছে, ছয় আমলা চাকরি ক্ষেত্রে নানা সুবিধা নেওয়ার জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভুয়া সনদ নিয়েছেন।

অলোচিত ছয় সচিব হলেন- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেন, স্বাস্থ্যসচিব এম এম নিয়াজ উদ্দিন মিঞা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসচিব এ কে এম আমির হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রাক্তন সচিব ও প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের চেয়ারম্যান মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামান এবং মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব আবুল কাশেম তালুকদার।

ইতোমধ্যে এমন অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শেষে গত সপ্তাহে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন দুদকের সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধান কর্মকর্তা।

চাকরির শেষ সময় মুক্তিযোদ্ধার সনদ গ্রহণকারী ছয় আমলার মধ্যে প্রবাসী কল্যাণ সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেন ছাড়া বাকি পাঁচ জনের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কোনো প্রমাণ পাননি তিনি।

সচিব খোন্দকার শওকত মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও চাকরিতে যোগদানকালে ঘোষণা দেননি। একজনের দালিলিক প্রমাণ রয়েছে যুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার। দুদকের অনুসন্ধানে এ তথ্য প্রমাণিত হয়েছে। তাই পাঁচ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও সনদ বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ছয় সচিবের মধ্যে প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের চেয়ারম্যান মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামান ছাড়া সকলের বয়স ছিল ওই সময় ১৬ বছরে নিচে। এদের মধ্যে এমন একজন রয়েছেন যার বয়স ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ছিল ১১ বছর ৯ মাস ২৬ দিন।

অথচ ২০১০ সালের ২০ এপ্রিল জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের দ্বিতীয় সভায় নেওয়া ৪.১(খ) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধকালীন বয়স অবশ্যই ১৬ বছর হতে হবে। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এ বয়স শিথিলযোগ্য। এ ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল শুনানি শেষে যাবতীয় প্রমাণাদি দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। সে ক্ষেত্রে বয়স প্রমাণের জন্য এস.এস.সি সনদ অথবা জন্মনিবন্ধন সনদ গ্রহণযোগ্য হবে।

এস.এস.সি সদন অনুযায়ী ছয় মুক্তিযোদ্ধা সচিবের বয়স ও জন্মতারিখ হলো
স্বাস্থ্যসচিব এম এম নিয়াজ উদ্দিন মিঞা যার বয়স ছিল (২৬ মার্চ ১৯৭১ হিসেবে) ১৫ বছর ২ মাস ২৬দিন। সার্টিফিকেটে তার জন্মতারিখ দেওয়া রয়েছে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৫৫।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব (বর্তমানে ওএসডি) কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকীর বয়স ছিল ১৫ বছর চার মাস ২৬দিন। সার্টিফিকেটে তার জন্ম তারিখ দেওয়া রয়েছে ১৯৫৫ সালের ১ নভেম্বর।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসচিব এ কে এম আমির হোসেনের বয়স ছিল ১৪ বছর ২ মাস ১৬ দিন। তার জন্ম তারিখ হলো ১৯৫৭ সালের ১ জানুয়ারি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রাক্তন সচিব ও প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের চেয়ারম্যান মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামানের বয়স ১৭ বছর ২ মাস ৯ দিন। যার জন্মতারিখ ১৯৫৪ সালের ১৮ জানুয়ারি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ওএসডি হওয়া যুগ্ম-সচিব আবুল কাসেম তালুকদারের বয়স ছিল ১১ বছর ৯ মাস ২৬দিন। যার জন্মতারিখ হলো ১৯৫৯ সালের ১ জুন।

প্রবাসী কল্যাণ সচিব ড. শওকত হোসেনর মুক্তিযুদ্ধকালীন বয়স ছিল ১৫ বছর ১১ মাস ২১ দিন। সার্টিফিকেটে তার জন্ম তারিখ দেওয়া রয়েছে ১৯৫৫ সালের ৬ এপ্রিল।

পাচঁ সচিবে যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়ে দুদক সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্যসচিব এম এম নিয়াজ উদ্দিন মিঞার গাজীপুর সদর, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকীর নেত্রকোনার কেন্দুয়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসচিব এ কে এম আমির হোসেনের শরীয়তপুরের নড়িয়া, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রাক্তন সচিব ও প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের চেয়ারম্যান মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামানের নরসিংদীর মনোহরদী ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব আবুল কাশেম তালুকদারের মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

তবে তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট এলাকার কেউ সাক্ষী দিতে রাজি হননি। কারণ হিসেবে অধিকাংশরা দুদককে জানিয়েছেন, অভিযুক্তরা সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা। তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিলে এলাকা ছাড়া হতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এ সনদ ব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের প্রমাণ না পাওয়ায় দুদক বাদী হয়ে ওই সচিবদের বিরুদ্ধে মামলা করবে না।

তিনি আরো বলেন, প্রতিবেদনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে (পিএসসি) বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পাঁচজনের সনদ ও গেজেট সঠিক না হওয়ায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল ২০০২-এর ৭(ঝ) ধারা অনুসারে সনদ বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।

৬ মাসের অনুসন্ধন প্রক্রিয়ায় দুদকের উপপরিচালক মো. জুলফিকার আলী ৬ আমলার ডোসিয়ার, পিডিএস (পার্সোনাল ডাটাশিট), মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাখিলকৃত সনদ, চাকরিতে যোগদানকালে পূরণকৃত ফরমের সত্যায়িত অনুলিপিসহ সহস্রাধিক পৃষ্ঠার নথি যাচাই করেন। পরে সকল সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ট্যাগ: