banglanewspaper

কত বড় সাহস, যে ১৫ আগস্ট ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস নেন একজন শিক্ষক! কি ভাবছেন? আমি একজন শিক্ষক হয়ে কেমন করে আরেকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে লিখছি? কেন লিখবো না যদি তিনি বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করার মতো এমন কঠিনতম অপরাধ করে থাকেন? বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসি জন্মের পর থেকেই। কারণ জন্মের পর বুঝতে শিখলেই দেখে আসছি আমার জন্মদাতা আব্বা-মা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে অনেক অত্যাচার সহ্য করেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করে আসছেন। যেহেতু তাদের রক্ত আমার শরীরে প্রবাহিত তাই এই ভালোবাসা জন্মগতভাবেই বিধাতা কতৃক প্রদত্ত। সেই ভালোবাসা থেকে বলছি, যদি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক, জনাব মাহবুবুল হক তারেক ১৫ আগস্টে সত্যিই ছাত্রছাত্রীদেরকে ফোর্স করে এবং শোক দিবসের প্রোগ্রামে যোগদান না করে ক্লাসে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করে থাকেন তাহলে আমি তাকে নিয়ম অনুযায়ী যে কঠোর শাস্তি হওয়া দরকার সেটাই দাবি করছি। তবে সেটি অবশ্যই হতে হবে উপযুক্ত তদন্তসাপেক্ষে।

আর যদি এমনটা হয় যে, তিনি জাতীয় শোক দিবসের প্রোগ্রামে যোগদান করেছেন এবং ছাত্রছাত্রীদেরকে প্রোগ্রামে যোগদানের বিষয়ে কোনোরকম ব্যাঘাত ঘটাননি বরং একজন শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই ছাত্রছাত্রীদের সমস্যা সমাধান করে দেওয়ার লক্ষে তাদের সঙ্গে আনফিসিয়াল ভাবে কথাবার্তা বলেছেন, (হোক সেটা ক্লাস রুমে) তাহলে আমি একজন শিক্ষক হিসেবে কোনোদিন তাকে শাস্তি দেওয়ার পক্ষে না। কারণ আমিও একজন শিক্ষক, আমি জানি যে আমাদের চাকরী ৯ টা থেকে ৫ টা না। এমনকি কোনো সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও আমাদের হাত পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলে না। ছাত্রছাত্রীদের কল্যানের কথা চিন্তা করে রাত ২/৩ টা পর্যন্ত স্টাডি করতে হয়, পরীক্ষার খাতা দেখতে হয়। এমনটা হওয়ার পরেও যদি তাকে এমনভাবে কোনো তদন্ত ছাড়াই শাস্তির ব্যাবস্থা করা হয়, তাহলে সেটা হবে সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজের জন্য এক কলঙ্কজনক ঘটনা। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজের কথা বললাম কেনো সেটা শুনবেন না? কারণ, স্কুল কলেজের শিক্ষকরা আজকাল ক্লাস টাইমের পরে বেশির ভাগ সময়ে টিউশনি নামক ব্যবসার উদ্দেশ্যে ছাত্রছাত্রীদেরকে শিক্ষা দিয়ে থাকেন, কিন্তু একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কি কখনো এমনটা করে থাকেন? তিনি/তারা কোনোরকম ব্যবসা ছাড়াই শুধুমাত্র নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই ছাত্রছাত্রীদের যেকোনো সমস্যা সমাধান করে থাকেন।

প্রকৃতপক্ষে কি ঘটেছে সেদিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে? জানার আগ্রহ থেকেই জনাব মাহবুবুল হক তারেকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হলো আমার। কথা বলে জানতে পারলাম যে, ১৫ আগস্ট শোক দিবসের প্রোগ্রামে গিয়ে জাতির পিতা ও তার পরিবারের সকল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদানের পরে কয়েকজন স্টুডেন্ট তাকে একটা বিষয়ে একটু বুঝিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করে। তারপরে উনি একজন শিক্ষক হিসেবে উনার নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই বলেছেন যে, ‘ঠিক আছে তোমরা একটু আমার অফিস রুমের সামনে গিয়ে ওয়েট করো, আমি আসছি’। তারপরে মাহবুব সাহেব যখন উনার রুমের সামনে যান তখন দেখেন সেখানে ১০-১২ জন স্টুডেন্ট দাঁড়ানো। এছাড়া উনার আরো ৩ জন সহকর্মী সেই মূহুর্তে উনার রুমে আসেন। তখন উনি চিন্তা করলেন যে, এতোগুলো স্টুডেন্টের সঙ্গে উনার রুমে একত্রে কথা বলার মতো স্থান সংকুলান হবেনা। তাই তিনি বলেছেন, ‘তোমরা একটা ক্লাস রুমে গিয়ে বসো, আমি ওখানে আসছি’। তারপরে উনি ক্লাসরুমে গিয়ে সেই বিষয়ে কিছু বুঝাচ্ছিলেন। উল্লেখ থাকে যে, ওই সময়ে কোনো হাজিরা খাতাও তিনি সঙ্গে নেননি। নেওয়ার প্রশ্নও উঠেনা। কারণ, এটা তো কোনো অফিসিয়াল ক্লাস না। ওই ব্যাচের ছাত্রছাত্রীদের অলরেডি ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। ক্লাস আরো কয়েকদিন আগে ক্লোজ হয়ে গেছে।

জনাব মাহবুবুল হককে জাতীয় শোক দিবসকে অবমাননা করার কথা জিজ্ঞাসা করলে উনি জাতির জনকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখেই বলেন, ‘ জাতীয় শোক দিবসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সকল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলী প্রদানের জন্য আমি নিজে সকাল পর্যন্ত ফুল সংগ্রহ করার কাজে ছাত্রছাত্রীদেরকে মনিটরিং করেছি’। তাই জাতীয় শোক দিবসকে অবমাননা করার কোনো প্রশ্নই আসেনা। তাছাড়া ওই ডিপার্টমেন্টের ছাত্ররাও ক্লাস নেওয়ার অভিযোগ মিথ্যা বলে এ বিষয়ে ইতোমধ্যে একটি বিবৃতি প্রদান করেছে।

তাহলে কেনো তাকে কোনো তদন্ত ছাড়াই এক মাসের জন্য বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হলো? এটা কি গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজকে কলঙ্কিত করা হলো না? যেখানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হাত ধরেই তৈরি হবে জাতির সোনার ছেলে, সেখানে সেই দেশের সর্বোচ্চ লেভেলের শিক্ষকদেরকে যদি এমনভাবে অপমান অপদস্ত করা হয় তাহলে কোথায় যাবে এ জাতি? শিক্ষক সমাজ ধ্বংস হলে তো এ জাতিও ধ্বংস হয়ে যাবে!

তাই বলতে চাই, কোনো  তদন্ত ছাড়াই শুধুমাত্র অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইচ্ছা মতোই এমন একজন সম্মানিত ব্যক্তিকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অভিভাবকের নিকট থেকে শাস্তি দেওয়ার মতো লিখিত নোটিশ কোনোভাবেই কাম্য না। কতৃপক্ষ যদি উপযুক্ত তদন্ত ছাড়া এমন বিচার প্রদান করে থাকেন তাহলে তা অবৈধ হবে বলে আমার বোধগম্য। আশাকরি, যথাযত কতৃপক্ষের নজরে আমার এ লেখাটা আসলে জনাব মাহবুবুল হক তারেকের বিরুদ্ধে প্রকাশিত শাস্তির নোটিস প্রত্যাহার করে সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। তা না হলে যে বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করার মতো কঠিন অপরাধ কর্তৃপক্ষের গায়ে পড়বে, কারণ বঙ্গবন্ধু ইতিহাসে কখনো কোনো অবৈধ বিচার করেননি।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধুকণ্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমার আকূল আবেদন, প্রিয় নেত্রী, যদি প্রয়োজন পড়ে তাহলে প্লিজ এদেশের শিক্ষক সমাজকে যথাযত সম্মান প্রদান করার স্বার্থে আপনি সরাসরি হস্তক্ষেপ করে হলেও বিষয়টার সঠিক সমাধানের চেষ্টা করেন।

লেখক : মোঃ সোলাইমান হোসাইন

সহকারী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ,

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: