ওবাইদুর রহমান আকাশ, খোকসা: একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান মাহবুবকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতো পিতা হারুন-অর-রশিদ। সেই স্বপ্নের অপমৃত্যু হয়েছে ২০০৪ সালের আজকের এই দিনে। এখন তিনি দিন শুরু করেন ছেলের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় নিহত তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষি কুষ্টিয়ার খোকসার মাহবুবের বৃদ্ধ বাবা হারুন অর রশিদ ফজরের নামাজের পর মোনাজাতে ছেলের খুনিদের বিচার ও দুই নাতির মঙ্গল কামনা করেন। অবসরের সময় কাটে নিহত ছেলের সমাধিকে কেন্দ্র করে। খুনিদের বিচার, কবরস্থানে যাতায়াতের রাস্তা, বিদ্যুৎ সংযোগসহ সামান্য স্বপ্নও দেখেন তিনি।

ঘাতকদের ছোঁড়া গ্রেনেড আর বুলেটে মাহাবুবের মৃত্যুতে বৃদ্ধ বাবা হারুন অর রশিদের সব স্বপ্ন লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে ছেলের রেখে যাওয়া বিবর্ণ সব স্মৃতি, স্বপ্ন আর হতাশার মধ্যেও যথেষ্ট প্রাপ্তির কথা জানালেন তিনি। গতকাল রবিবার ভোরে উপজেলার জয়ন্তিহাজরা ইউনিয়নের ফুলবাড়ি গ্রামে নিজের ছোট বাড়িতে দেখা মেলে কর্মব্যস্ত বৃদ্ধ হারুন অর রশিদের। 

নিজের বাড়ির উঠোনে বসে কথা বলছে নিহত মাহাবুবের বাবা হারুন অর রশিদ । 

ছেলের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে হারুন অর রশিদের আক্ষেপের কথাগুলো বেড়িয়ে আসছিল। অবিবাহিত ছোট মেয়ে আবিদা’র একটি সরকারী চাকরি হওয়ার খবর দিয়ে প্রাপ্তির কথা শুরু করলেন। তিনি দাবি করেন, স্ত্রী শামীমা আক্তার আসমা ও দুই পুত্র আশিক ও রবিনকে নিয়ে জীবন যুদ্ধে সফল সৈনিক ছিলেন নিহত মাহাবুব। সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নিহত সৈনিকের শৈশব স্মৃতি জড়িত ফুলবাড়ি স্কুলের পাশের কবর স্থানের সমাধি স্থলটি পাকা করে দেওয়ার পর থেকে তিনি সেখানেই অবসর সময় কাটাতেন। কিন্তু রাস্তা না থাকায় বৃষ্টির পানিতে সেখানে নিয়মিত যেতে পারছেন না।

মাহাবুবের কবর

তিনি বলেন, গ্রীল না থাকায় দৃষ্টিনন্দন সমাধি স্থলটির উপর শেয়াল-কুকুর চলাফেরা করছে। সমাধিস্থলটির সৃষ্ট সংরক্ষণের জন্য করবস্থানের সীমান প্রাচীর, রাস্তা ও বিদ্যুতের সংযোগ খুবই জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে। কথা বলেন গ্রেনেড হামলার বিচার নিয়েও।

তিনি বলেন, ইতিহাসের নিকৃষ্টতম হামলা এটি। কিন্তু বিচার হচ্ছে না। বিচার বিলম্বিত হওয়ায় তিনি বড়ই হতাশ বলেও জানান। মামলাটির দ্রুত বিচার ও দোষীদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি বাস্তবায়ন দেখে মরতে চান তিনি। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে তেমন কোন সহায়তা পাননি বলেও তিনি জানান। 

মাহাবুবের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে বাবা হারুন অর রশিদ ও বড় ভাই শাজাহান।

নিহত মাহাবুবের বয়োবৃদ্ধ মা হাসিনা বেগম ও অবিবাহিত মেয়ের (মাহাবুবেব বোন) আবিদাকে নিয়ে যতটুকু দুঃশ্চিন্তায় করেন তার থেকে বেশী ভাবনা তার দুই নাতি ও পুত্র বধূর ভবিষৎ নিয়ে। শত কষ্ট ও হতাশার মধ্যেও নিহত ছেলে মাহাবুবকে নিয়ে গর্বিত এই বাবা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘাতকদের বুলেট থেকে রক্ষায় তার ছেলের জীবন উৎসর্গ করার ঘটনাটি এখনো গর্বের সাথে উচ্চারণ করেন হারুন অর রশিদ। 

মাহাবুবের ছবি হাতে বাবা-মা। 

এক সময়ের বিড়ি তৈরীর কারিগর পিতা হারুন অর রশিদের দ্বিতীয় পুত্র মাহাবুব। বাড়ির পাশের ফুলবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার লেখা পড়ার হাতে খড়ি। পাশের উপজেলা পাংশার বাহাদুরপুর শহীদ খবির উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে এসএসসি পাশ করেন। নিজের চেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সেনা বাহিনীতে সাধারণ সৈনিক পদে নিয়োগ পান। 

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা নিহত মাহবুবের ফাইল ফটো

এতে দরিদ্র বাবার সংসারে এক মাত্র আশার প্রদীপ জ্বলে ওঠে। ছোট চাকুরির আয়ে সংসারের উল্লেখ যোগ্য উন্নতি না করতে পারলেও তিন বেলা খাবারের নিশ্চয়তা হয়। পাঁচ বোনের তিন বোনকে বিয়েও দেন। ছোটদের লেখা পড়ার খরচ চালাতেন তিনি। সতির্থ সৈনিকদের মাধ্যমে খবর পেয়ে ২০০০ সালের দিকে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ড্রাইভার হিসাবে যোগদান করেন। বিশ্বস্ততা অর্জন করায় অল্প সময়ের মধ্যে নেতৃর ব্যক্তিগত দেহরক্ষির দায়িত্ব পান। ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এ ২১ আগস্টের বর্বর গ্রেনেড হামলার সময় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মাহাবুব নিহত হয়।

৭৮ কুষ্টিয়া ৪  (খোকসা-কুমারখালী) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুর রউফ জানান, নিহত দেহরক্ষী মাহাবুবের লাশ গ্রহণ থেকে শুরু করে সমাধিটিও তার টাকায় নির্মিত হয়েছে। অবশ্য সমাধির গায়ে লাগানো ফলকে বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসনের নাম লেখা রয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে কবরস্থানে যাওয়ার রাস্তা করার প্রকল্প নিয়েছেন বলেও জানান। তিনি সব সময়ই নিহত মাহাবুবেবর পরিবারের পাশে রয়েছেন বলে দাবি করেন। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিনা বানু বলেন, নিহত দেহরক্ষী মাহাবুবের সমাধিস্থল ও কবর স্থানের উন্নয়নের জন্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ চেয়ে পাঠানো হয়েছে। নিহতের ভাই বোনদের চাকুরি, বৃদ্ধ বাবার নামে আজীবন ভিজিডি ও বয়স্ক ভাতাসহ  অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হয়েছে।