banglanewspaper

জি. এম. শাহিন হোসেন : ইন্টারনেট, মানবসৃষ্টির এক বিস্ময়কর আবিষ্কার, যেটার অবদানে বদলিয়েছি মানবজাতির ভাগ্যের মোর বলবত করে তুলেছে অনঃদৃষ্টি। কথাটির চাক্ষুষ প্রমান মেলে বর্তমান সভ্যতার দিকে তাকালে। আমাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমের সিংহভাগ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইন্টারনেট কতৃক পরিচালিত বা প্রভাবিত হচ্ছে। কিন্তু দেশীয় সমাজ বা রাষ্ট্রব্যাবস্থায় মূল্যবান এই বস্তুটির কতটুকু মূল্যমান আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি, সেটাই এখনকার বিবেচ্য।

দেশের অগ্রসরমান ধাবমানতাকে ধাপে ধাপে আরো এগিয়ে নিতে এবং ইন্টারনেটের অপরিমেয়তা বিবেচনা করে ২০০৬ সালের ২১ মে সিমিইউ-৪ লাইনে যুক্ত করে কক্সবাজারে প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ (ব্যান্ডউইথ বলতে একটি নেটওয়ার্ক বা মডেম কানেকশনের মধ্যদিয়ে কি পরিমাণ ডাটা প্রেরিত হচ্ছে তা বোঝায়। এটি সাধারণত  “বিটস পারসেকেন্ড” বা বিপিএস দ্বারা পরিমাপ করা হয়) ক্ষমতাসম্পন্ন দেশের প্রথম সাবমেরিন ক্যাবল।

এখন আসা যাক সাবমেরিন ক্যাবল কি, এই প্রসঙ্গে সাবমেরিন ক্যাবল বলতে সাধারন অর্থে গতানুগতিক মহাকাশের স্যাটেলাইট যোগাযোগ পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে সাগরতল দিয়ে একদেশ থেকে আরেক দেশ কিংবা এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে পর্যন্ত যে বিস্তৃত অত্যন্ত দ্রুতগতি সম্পন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে সেটি বোঝাই| মূলত সাগরতল বা সাবমেরিন থেকেই এই ক্যাবলটির নামকরণ হয়েছে।

যাই হোক, প্রথম প্রতিষ্ঠিত এই ক্যাবলটি গতি ও দেশিয় চাহিদামানে চাহিদামাফিক ছিল না, তাই শরণাপন্ন হতে হত প্রতিবেশি রাষ্ট্রের কাছে। চাহিদার অসম্পূরকতারর কথাচিন্তা করে সূদীর্ঘ ১১বছর পর আওয়ামিলীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বার সকাল ১০টার দিকে গনভবন থেকে ভিডিও কনফারেঞ্চিং এর মাধ্যমে পটুয়াখালি জেলার কুয়াকাটার মাইটভাঙ্গা আমখোলাপাড়ায় ১০ একর জমির উপর নির্মিত এবং ২০-২৫ বছর মেয়াদি দেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল উদ্বোধন করেন। যেটা ২০ হাজার মাইল দীর্ঘ এবং কুয়াকাটা উপজেলা থেকে মাত্র ৯ মাইল দূরে অবস্থিত সাইথইষ্ট এশিয়া মিডলইষ্ট ওয়েষ্টার্ন ইউরোপ (এস ই এ-এম ই-ডব্লিউই-৫) আনর্জাতিক কন্সোর্টিয়াম সাবমেরিন ক্যাবল এর সাথে সংযুক্ত, আন্তর্জাতিক এই ক্যাবলটি মোট ১৭টি দেশের সাথে যূক্ত এবং ১৮টি ল্যান্ডিং পয়েন্ট বিশিষ্ট। ৬৬০ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত দ্বিতীয় এই সাবমেরিন ক্যাবলটি ১৫০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং এটার অবদানে পুর্বের তুলনায় ৮গুন বেশি ইন্টারনেট স্পিড পাবার কথা বাংলাদেশের।

নতুন এই সাবমেরিন ক্যাবল সংযোজনে ইন্টারনেট ক্ষেত্রে এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এবং  নিত্য নতুন দ্বার করেছে উন্মেচিত, কিন্তু অনুরুপ আশার প্রতিষ্ফলন ঘটাতে পারেনি। চাহিদা ও যোগান অনুযায়ি সরকার ইন্টারনেটের দাম কমাচ্ছে বলে জানা যাই, কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে তার কতটুকু প্রতিফলন ঘটেছে সেটা আদৌ নিশ্চিত করেনি কেউ।

বাংলাদেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬ কোটি ৭২ লাখ (প্রায়), যার ভেতর মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর কারির সংখ্যা ৬ কোটি ৩১ লাখ(প্রায়), যা মোট ব্যবহারকারীর ৯৪ শতাংশ।

কিন্তু ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোবাইল সিম ব্যবহার ভয়েস কল, এসএমএস, ইন্টারনেট সহ সকল ধরনের সেবার উপর সম্পূরক শুল্ক ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫শতাংশ করা হয়, নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ি মোবাইল ফোনের সিমের প্রতিটি সেবার সাথে যোগ হবে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযজন কর, ১০শতাংশ সারচার্য এবং ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক। এর ফলে ১০০টাকার টকটাইম বা ইন্টারনেট কিনতে গুনতে হবে ১২১ টাকা ৭৫ পয়সা, ১৭-১৮ অর্থবছরেও যেটা কমেনি (সূত্রঃ ভোরের কাগজ)।

একাধিক গবেষনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যাবহারকারীদের ভেতর ৫০% শিক্ষার্থী, ১২%কম্পিউটার প্রফেশনাল, ১০%প্রকৌশলি, ৮% ফিজিশিয়ান, ৬% ম্যানেজার, ৫%শিক্ষক, ৪%ব্যাবসায়ি, ৩%আইঞ্জীবি এবং ২% সরকারী কর্মকর্তা (প্রায়)।

ফলে ইটারনেটের এই উর্ধমানতা শিক্ষার্থীদের উপর বাড়তি মূল্য হিসাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার বলেন, বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে। এখন ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর থেকে ভ্যাট, ট্যাক্স সার্বিকভাবে প্রত্যাহার করা উচিত। সেখানে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারে প্রতি বছর বাড়তি করের বোঝা চাপিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত ভ্রান্তনীতির ফল। এর ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ ব্যাহত হবে।

এবার আসি সাবমেরিন ক্যাবলের ব্যাপারে, ২০১৫ সালে ৮ম বারের মতো ব্যান্ডউইথের দাম কমিয়েছে সরকার। দাম কমানোর ফলে আশার আলো দেখেন ইন্টারনেট গ্রাহকরা। তাদের ধারণা ছিল ব্যান্ডউইথের দাম কমানোর ফলে গ্রাহক পর্যায়ে কমবে ইন্টারনেটের দাম। ব্যান্ডউইথের দাম কমানোর ২৪ মাস অতিবাহিত হলেও কমেনি গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এ নিয়ে নানা বক্তব্য দিলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। দাম কমিয়ে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) আশা প্রকাশ করে বলেছিল গ্রাহক পর্যায়ে এর সুফল পৌঁছাবে। এজন্য তারা বিটিআরসির ওপর দায়িত্ব বর্তান। বিএসসিসিএলের যুক্তি, পাইকারি হিসেবে আমরা ব্যান্ডউইথের দাম কমিয়েছি। এখন গ্রাহকরা এর সুবিধা পাবেন কি-না সে বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে নিশ্চিত করবে বিটিআরসি। পাল্টা যুক্তি দেখিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, বিএসসিসিএল দাম কমানোর মধ্যে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। তারা দাম কমিয়েছে শর্ত জুড়ে দিয়ে। প্রথম শর্ত যারা ন্যূনতম ১০ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ কিনবে কেবল তারাই ৬২৫ টাকায় ১ এমবিপিএস ব্যান্ডউইথ পাবে। দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে, নতুন এ মূল্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের জন্য প্রযোজ্য হবে। বিটিআরসি জানিয়েছে, মোবাইল অপারেটর ছাড়া আর কেউই এ পরিমাণ ব্যান্ডউইথ কেনার সামর্থ্য রাখে না। এছাড়া তিন জেলার বাইরেও কিন্তু ইন্টারনেটের অনেক গ্রাহক রয়েছে। মূলত এ দুটি কারণে গ্রাহক পর্যায়ে ব্যান্ডউইথের দাম কমানোর প্রভাব ইতিবাচক হচ্ছে না।

ইন্টারনেটের দাম কমানো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা সমালোচনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি গণজাগরণ মঞ্চের ইমরান এইচ সরকার তার ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাসে এ নিয়ে একটি হিসাব তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বলেন, বাংলাদেশে গড়ে প্রতি সেকেন্ডে ইন্টারনেট ব্যবহৃত হয় ৪০০ জিবি। প্রতিদিন ইন্টারনেট ব্যবহৃত হয় ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৬০ হাজার জিবি। প্রতি জিবি গড়ে ২০০ টাকা হিসেবে প্রতিদিন ব্যবহৃত ইন্টারনেটের দাম ৬৯১ দশমিক ২ কোটি টাকা। সরকারের কাছে প্রতি জিবি ২৬ পয়সা হিসেবে প্রতিদিন ব্যবহৃত ইন্টারনেটের ক্রয়মূল্য ৮৯ দশমিক ৮৬ লাখ টাকা। তার মানে দাঁড়ালো প্রতিদিন ৮৯ দশমিক ৮৬ লাখ টাকায় কেনা ইন্টারনেট জনগণের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে ৬৯১ দশমিক ২ কোটি টাকায়। প্রতিদিন ইন্টারনেট খাত থেকে মুনাফা হয় ৬৯০ দশমিক ৩ কোটি টাকা। প্রতি বছর ইন্টারনেট খাত থেকে মুনাফা ২ লাখ ৫১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। অপারেটরদের কাছ থেকে প্রতি বছর ইন্টারনেটের দাম হিসেবে সরকার পায় ৩২৮ কোটি টাকা মাত্র (প্রায়)। তিনি আরো বলেন, ২০১৬-২০১৭ সালে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট ছিল ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। দেখা যাচ্ছে, শুধুমাত্র ইন্টারনেট খাতের এই টাকা যোগ হলেও জাতীয় বাজেট দাঁড়াতো ৬ লাখ কোটি টাকা, প্রায় দুই গুণ। অথচ এই আড়াই লাখ কোটি টাকার পুরোটাই নিয়ে গেছে বিদেশি বেনিয়ারা। এ তথ্য সম্পর্কে মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসি জানায়, হিসাবটি একেবারে নির্ভুল নয়। কাছাকাছি।

গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম না কমায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘ব্যান্ডউইথের দাম কমানোর সুফলভোগী হচ্ছেন অপারেটররা, কিন্তু গ্রাহকরা এর কোনো সুফল পাচ্ছে না। সরকার ৭৮ হাজার টাকা ব্যান্ডউইথের দাম মাত্র ৬২৫ টাকায় নামিয়ে এনেছে, যা যুগান্তকারী ঘটনা। কিন্তু মোবাইল ইন্টারনেটে ব্যবহারকারীরা কোনোভাবেই এর সুফল পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ভূমিকা খুবই হতাশাজনক। ভয়েস কলের ক্ষেত্রে বিটিআরসি যে দর নির্ধারণ করে দিয়েছে তা ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে দ্রুত কার্যকর করা প্রয়োজন।’

মোস্তাফা জব্বার আরো বলেন, সরকার ব্যান্ডউইথের দাম কমিয়েছে, সেটিও আবার ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের জন্য। দেশের বাকি অংশ কি মানচিত্রের বাইরে? প্রধানমন্ত্রী প্রত্যন্ত গ্রামে ইন্টারনেট দিতে বলেছেন এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতায় দিতে বলেছেন, অথচ ইন্টারনেট গ্রামের জন্য নয়।

পরিশেষে বলা চলে, কূপমন্ডুক প্রানীর সমুদ্রের বিশালতা স্বচোখে দেখার জন্যে যেমন পারাবার তটে যাওয়া প্রয়োজন, তেমনি সুবিশাল পৃথিবীর জ্ঞ্যানের গরীমাই বিশাল বিশারদ হতে এবং উন্নয়নমুলক বিভিন্ন কাজে অবগাহনে ইন্টারনেটের গুরুত্ব অত্যান্ত তাতপর্যমন্ডিত। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতির মত ইন্টারনেটের উচ্চমূল্যের জন্যে অনেকেই আজ জীবনসমুদ্রের সাতারের সঞ্চারনপথ নিরূপন করতে অকৃতকার্য। তাইতো ফ্রি ওয়াইফাই এর সন্ধানে সন্ধানি থাকে এদেশের অধিকাংশ যুবক, ইন্টারনেটের নেশা খারাপ কিছু না, কিন্তু তার দূর্লভতা নেশাকে আসক্তি বানিয়ে ফেলতেই পারে। বাংলাদেশ ছাড়াও অন্যান্য উন্নয়নশিল দেশে আজ এই সেবা নিরাবিচ্ছিন্ন, এবং হাতের নাগালে যার মূল্যমান, তাইতো তারা উন্নয়নের দিকে এগচ্ছে তড়িৎ গতিতে, আর এটার অপ্রতুলতার জন্যে আজও আমরা অনেকেই ই-লার্নিং, ই-কমার্স ইত্যাদি সুযোগ থেকেই শুধু বঞ্চিত না, চিন্তার ও বাইরে।

একটি দেশকে এগিয়ে নিতে সর্বপ্রথমে তার আইসিটি খাতকে ত্বরান্বিত করতে হয়, যার প্রধান নিয়ামক ইন্টারনেট, কিন্তু বর্তমান ইন্টারনেটের এই তান্ডব লীলাখেলা দেখে আমরা হতভম্ব।

জানিনা উত্তরন হবে কবে! শুধু ভাবি সামাজিক যোগাযোগটা যদি ফ্রি না হত, তাহলে আমাদের মৌলিক চাহিদার লিস্টটা আরেকটু ভারি হত, ইন্টারনেট নামক শব্দের যোগফলে। দেশের উন্নয়নের জন্যে সূলভমূল্যে তাই আজ ইন্টারনেটের গতি ও স্ফিতি প্রত্যাশি এদেশের আপামর ভোক্তা।

লেখক : জি এম শাহিন হোসেন,
সি এস ই বিভাগ, দ্বিতীয় বর্ষ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রাহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: