banglanewspaper

এস. এম. মনিরুজ্জামান মিলন, ঠাকুরগাঁও : গত ক'দিন থেকে ফেসবুক ওয়াল ঘাটলেই চোখে পড়ছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আবেগপ্রবণ স্ট্যাটাস, ফটোতে আবেগপ্রবণ ক্যাপশন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, তাদের সবাই নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিদায়ী শিক্ষার্থী অর্থাৎ ২০১৮ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী।

কেউবা বন্ধুবৃত্তের সাথে কাটানো ৮টি বছরের স্মৃতিচারণ করছে, কেউবা শিক্ষাগুরুদের। আবার অনেকে ক্লাসরুম, বাথরুম, মাঠ, বটতলা, মসজিদ, পুকুর কিংবা হোস্টেলের স্মৃতিচারণও করছে।

বুঝতে পারলাম, একেকজনের স্মৃতিগুলো একেকরকম। তাই একেকজনের স্মৃতির এলবামগুলোও হবে একেক রঙে রাঙা। হয়তো একারণেই প্রতিটি মানুষ একে অন্যের থেকে আলাদা।

তাদের স্মৃতিচারণগুলো দেখে হারিয়ে গেলাম ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহটায়। ডায়েরীর পাতা ভরানোর অভ্যেসটা ৯বছর পর আজও রয়ে গেছে। তাই বসে পড়লাম ডায়েরী-কলম হাতে, স্মৃতিচারণে।

সেসময় আমার স্কুলজীবনের শেষসময় চলছিল। ১লা অক্টোবর থেকে টেস্ট পরীক্ষা। তাই, শেষদিনগুলো ছিলো অনেক বেশি স্মৃতিময়।

প্লে-কেজি ক্লাসঃ বাবার কাছ থেকে পড়ালেখার প্রাথমিক ধারণা পুরোপুরি রপ্ত করে ২০০১ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্লেতে ভর্তি হতে বাবার সাথে মর্নিংসান কিন্টারগার্ডেনে যাই। প্রতিষ্ঠান প্রধানের বেশকিছু প্রশ্নের জবাব সহজভাবে দেই।

স্যার: আপনার ছেলেকে তো প্লেতে ভর্তি করানো যাবে না।
বাবা: কেন স্যার?
স্যার: ওর বেসিক ভালো, ওকে কেজিতে ভর্তি করান।

কেজিতেও বেশিদিন পড়া হলোনা। ২৫ ডিসেম্বর স্যার বাবাকে ডেকে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করাতে বললেন।

প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণীঃ ২০০২ সালের ২রা জানুয়ারি প্রাইমারী ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ইন্টার্ভিউ দিয়ে ৩৭তম হয়ে ভর্তি হই প্রথম শ্রেণীতে। ২ বছর পড়াশোনা করি সেখানে।

তৃতীয়-দশম শ্রেণীঃ ২০০৪ সালের ৪ঠা জানুয়ারি তৃতীয় শ্রেণীতে ইন্টার্ভিউ দিয়ে ৪৪তম হয়ে ভর্তি হই ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে। আমার স্পষ্ট মনে আছে ভর্তির দিন প্রধান শিক্ষক খলিফা স্যার আমার চড় মেরেছিলেন পকেটে হাত ঢুকিয়ে কথা বলার জন্য।

সময় এগোতে থাকে, বছর পেরোতে থাকে, শেষ হয়ে আসে স্কুলজীবনের একেকটি বছর।

নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার্থী হওয়ায় বিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। আজও প্রতিটি শিক্ষার্থীর সাথে রয়েছে আত্মার সম্পর্ক।

২০১১ সালের ১লা অক্টোবর টেস্ট পরীক্ষা শুরু। সেপ্টেম্বরে হঠাৎ সবার মন যেন কেমন হয়ে গেলো, মনেহয় কোন এক বিষাদের ঘনঘটা আচ্ছন্ন করেছে আমাদের সবার ওপর।

সেসময় আমিসহ ক্লাসের ৪-৫জন ফেসবুক চালাতাম। নোকিয়া ব্রেন্ডের XpressMusic, Classic আর N73 মডেলের সেট চালাতো কয়েকজন।

সেপ্টেম্বরে তার সেসব ফোন দিয়ে ছবি তোলার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়তাম সবাই। স্কুলজীবনের শেষ স্মৃতিগুলো ধরে রাখতে চাই সবাই। কেউ একজন একটি ডিজিটাল ক্যামেরা নিয়ে এসে আমাদের ছবি তোলার আগ্রহটাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছিল।

৩১ সেপ্টেম্বর ছিল স্কুলজীবনের শেষ দিন। আমরা ক'জন পিটি পরিচালনা করেছিলাম। পিটি শেষে আমাদের কেউ একজন আমানুল্লাহ স্যারকে জড়িয়ে কেঁদেছিল। সেদিন সব স্যারের মুখে ছিল আবেগময় বিদায়ের সুর।

স্কুলজীবনের শেষ দিনে র‍্যাগ ডে (Rag Day) পালনের প্রথা থাকলেও আমাদের বিদ্যালয়ে প্রচলিত ছিল রঙ মেখে ছেঁড়াছিঁড়ি ডে। আমরাও সেই প্রথায় হেঁটেছিলাম। ২ ঘন্টা পুরো বিদ্যালয় ক্যাম্পাস দাপিয়ে ছেঁড়া শার্ট নিয়ে বাসায় ফিরি।

২০১১ সালের অক্টোবরে বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শেষবারের মতো পরীক্ষা দেই। তবে সেটি ছিল আমাদের স্কুলজীবনে প্রথম স্কুলড্রেস পরিধানের বাঁধাধরাবিহীন কোন পরীক্ষা।

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষা দেই। লিখিত পরীক্ষার পরে ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রিয় বিদ্যালয়ের শার্ট, প্যান্ট, ব্যাচ, শোল্ডার ব্যাচ, জুতা-মোজা তুলে রাখি আজীবনের জন্য।

৭ই মে ফলাফল প্রকাশের পর ২১শে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। বিদ্যালয় তৎকালীন কয়েকজন শিক্ষার্থী দাওয়াত কার্ড নিয়ে বাসায় এসে বলে, "ভাইয়া, তোমাদের জন্য বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এসো কিন্তু।"

২০১২ সালের ২১শে মে বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শেষবারের মতো আমার নামের পাশে উচ্চারিত হয়েছিল "বিদ্যালয় পড়ুয়া" শব্দটি।

আজ বিভিন্ন বিদ্যালয়ের পরিচিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ফোন পেয়ে নিউজ রিপোর্টিং সহ বিভিন্ন কাজে বিদ্যালয়গুলোতে যাই। তখন মনের মধ্যে থাকা লুকোনো আবেগগুলো জাগ্রত হয়ে ওঠে বারবার।

 

 

 

 

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: