banglanewspaper

মো. খাইরুল ইসলাম: শিক্ষার সব থেকে বড় শক্তি এবং বড় উদ্দেশ্য হল ভাল মন্দ বিচার করার ক্ষমতা। শিক্ষা  মানুষকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে শেখায়। সব মিলে শিক্ষার বিশেষণ বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আমার নাই। কিন্তু যাদের হাতে শিক্ষার মশাল, যারা জাতির পথপ্রদর্শক, জাতির বিবেক তাদের যথাযত মূল্যায়ন করার সংস্কৃতিটা আমাদের দেশ থেকে বিলুপ্তপ্রায়।

এর জন্য আমাদের দরিদ্র শিক্ষা ব্যবস্থা দায়ী। আমাদের কর্পোরেট চিন্তা ভাবনা দায়ী। যাইহোক বর্তমান সময়ে শিক্ষা কোচিং ব্যবসা, প্রাইভেট সেন্টার খুবই আলোচিত বিষয়। সরকার শিক্ষার মান উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে লক্ষ্য একটাই একটা সৃজনশীল, সুশিক্ষিত জাতি উপহার দেওয়া। শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকার যতটা না নিয়মের পর নিয়ম তৈরি করছেন তার খুবই কমই শিক্ষার উন্নয়ন আমাদের চোখে পড়ছে। এর পিছনে প্রধান কারণ হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে শিক্ষকতা পেশাকে সবাই তাচ্ছিল্যর চোখে দেখে।

চাকরির বাজারে আপনার মান নির্ভর করবে বেতনের উপর। যে চাকরির বেতন যত বেশি, যে চাকরির আয়ের উৎস যত বেশি সে চাকরি তত বেশি পছন্দনীয়! শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধার অনেক ঘাটতি আছে বাংলাদেশে যার কারণে বিসিএস শিক্ষা সবার শেষ পছন্দের তালিকায় থাকে। কিন্তু কেন?

শিক্ষকতা পেশায় বিমুখ কেন মেধাবীরা??? আমার মনে হয় একমাত্র শিক্ষকতা পেশায় ঘুষ খাওয়ার সুযোগ নাই। যে চাকরিতে যত বেশি ঘুষ খাওয়ার সুযোগ সে চাকরি তত বেশি লোভনীয়। ঘুষ জাতীয় আহার বিশেষ করে বাংলাদেশের চাকরির বাজারে। কিন্তু শিক্ষকতা পেশায় সেটার সুযোগ নাই বলেই মেধাবীরা শিক্ষক হতে চায় না। এরপরও সামান্য বেতনে কিছু মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষকতা পেশায় যায় প্রাইভেট কোচিং থেকে কিছু বাড়তি আয়ের সুযোগের আশায়। কোচিং প্রাইভেট ব্যবসা সরকার বন্ধের জন্য উঠে পড়ে লাগছে কিন্তু কোচিং প্রাইভেট ব্যবসার সাথে জড়িত কারা?

সব কোচিংগুলো কিন্তু পরিচালনা করে বেকার ছাত্ররা। হঠাৎ কোচিং বন্ধের এমন সিদ্ধান্তেেএসব শিক্ষার্থীরা কি করবে?

শিক্ষা এখন পশ্চিমা বিশ্বের সব থেকে লাভজনক ব্যবসা; বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবসাটিও বেশ জমজমাট। এতদিন শুধুমাত্র বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা ব্যবসাটি রমরমা ছিল। এখন বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যাকালীন কোর্স খুলে শিক্ষা ব্যবসা করছে। একজন সায়ত্বশাসিত শিক্ষকের বেতন কত? ১৫-২০ হাজার টাকা। একটি জেলা শহরে সে যদি পরিবারসহ থাকতে চাই তাহলে তার বাসা ভাড়া বাবদ ৮-১০ হাজার টাকা দেওয়া লাগবে। পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য হলেও তার ২০ হাজার টাকা দরকার কমপক্ষে। এখন তার সন্তানের পড়ালেখা বাবদ তার বৃদ্ধ বাবা মাকে দেখাশোনা। অনেক শিক্ষক আছে যারা তাদের ভাই-বোনদের পড়ালেখার খরচ পর্যন্ত চালায়। সামান্য বেতনে কোনভাবেই একটা পরিবার সুস্থ ভাবে চালানো সম্ভব না।

তাছাড়া নিন্ম-মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর হিসেব কষে চলা প্রতিদিনে বড় একটা গড়মিলের কারণে তারা বড় ধরনের বিপাকে পড়েছে! তারা যদি মাসিক ৩০ টাকায় চলতে অভ্যস্ত হয় হঠাৎ তারা কেমন করে ১৫-২০ টাকায় সংসার চালাবে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক ৫ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে সায়ত্বশাসিত একটা স্কুলে সহকারি ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে চাকরি নিয়েছে। তার পরিবারের সামর্থ্য ছিলো না তাকে এত টাকা দিয়ে চাকরি দেওয়ার কিন্তু সে বিভিন্ন বেসরকারি এনজিও থেকে লোন করে ক্ষেতের জমি বিক্রি করে সে চাকরিটি নেয়। তার চাকরি পরিবারের জন্য খুবই জরুরী ছিল কারণ তার ছোট দুইটা ভাই ভার্সিটিতে পড়ালেখা করে এবং তাদের ব্যয়ভার টিউশন করে এতদিন বহন করে আসছিল। এই টিউশন প্রাইভেটকে মাথায় রেখে সে চাকরিতে জয়েন করে। এখন সে যে মাসিক বেতন পায় সেটা লোনের টাকা পরিশোধ করতেই শেষ। টিউশনের টাকা দিয়েই সে দুই ভাইয়ের পড়ালেখার খরচ দেয় এবং পরিবারের খরচ চালায়। হঠাৎ টিউশন নিষিদ্ধ করায় চরম হতাশার মধ্যে আছে সে; না পারছে পরিবারে টাকা দিতে না পারছে ভাইদের টাকা দিতে।

এভাবে হঠাৎ টিউশন বন্ধ করায় হাজারো পরিবার চরম সমস্যার মধ্যে পড়েছে। জেলা শহরের সরকারি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা চেষ্টা করে পরিবার থেকে বেড়িয়ে এসে ছাত্রাবস্থায় নিজের টাকায় নিজে চলার একমাত্র মাধ্যম কোচিং বা টিউশন। আপনি কোচিং বন্ধ করতে পারবেন গৃহে পড়ানো বন্ধ করতে পারবেন? আপনার ছেলের দুর্বলতাগুলো আপনি গৃহে শিক্ষক রেখে মাসে ৫-১০ হাজার টাকা দিয়ে পূরণ করতে পারছেন কিন্তু যে ছেলের বাবার মাসিক আয় ৫-১০ হাজার টাকা তার ছেলে কি করবে?  

আমি কোচিং ব্যবসাকে উৎসাহ দিচ্ছি না কিন্তু আপনি আজ কোচিং ব্যবসা বন্ধ করে নিজের বাসায় ১০ হাজার টাকার টিউটর রেখে আপনি কি নিয়ম ভঙ্গ করছেন না? গ্রামের অনেক স্কুল কলেজ এখনো সরকারি স্বীকৃতি পায়নি; তাদের বেতনেরও নিশ্চয়তা নাই,  তারা স্কুল থেকে সামান্য বেতনের পাশাপাশি প্রাইভেট টিউশনের উপর নির্ভরশীল। টিউশন বন্ধ হলে তাদের ক্ষেতে খামারে কাজ করা ছাড়া আর উপায় থাকবে না।
 
শিক্ষার মান উন্নয়নে স্কুলে নিয়মিত ক্লাস করার বিকল্প নাই। হ্যাঁ এটা সত্যি প্রাইভেট কোচিং স্কুল কলেজের ছাত্রদের উপস্থিত সংখ্যা কমিয়ে দেয় স্কুলের শিক্ষকদের সাথে বড় ধরনের সম্পর্কের ঘাটতি তৈরি করে। কিন্তু এর জন্য দায়ী কি কোচিং প্রাইভেটের নাকি স্কুল কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা। ছাত্রদের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য স্কুল কলেজ কি পদক্ষেপ নিচ্ছে সেগুলো তো দেখতে হবে। স্কুল কলেজের যে পরিবেশ তাতে এমন অনেক স্কুল আছে একসাথে ১৫০-২০০ জন ক্লাস করতে হয়। স্কুল পর্যায়ে কোলাহল পরিবেশে এত ছাত্র-ছাত্রীর সুস্থ পাঠদান কি সম্ভব?

কোচিং-প্রাইভেট বন্ধ করা হোক এটা মঙ্গলজনক কিন্তু স্কুল কলেজের পরিবেশ সুস্থ পাঠদানের উপযোগী করা, শিক্ষকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাড়িয়ে দেওয়া হোক যাতে পরিবার পরিজন নিয়ে বিপদে না পড়তে হয়। শিক্ষাকে বাণিজ্যকরণ থেকে মুক্ত করতে হলে ভূক্তভোগীদের দিকেও নজর দিতে হবে। সুস্থ শিক্ষার প্রসার ঘটুক এই কামনায় করি।

লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: