banglanewspaper

এস. এম. মনিরুজ্জামান মিলন, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞরাই বলে, “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”।

মুসলিমরা যারা এই দাবির পক্ষে কন্ঠ মিলিয়ে বলে তারা দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ। মনে রাখতে হবে ইসলাম কখনো নীতিগতভাবেই এধরণের বিষয় স্বীকার করেনা।

মহান আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা সূরা কাফিরূনের শেষ আয়াতেই স্পষ্ট করেছেন, যার যার দ্বীন তার এবং রাসুল (সাঃ) কে কাফেরদের উদ্দেশ্যে বলতে বলেছেনঃ

لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ

Meaning: To you be your way,  and to me mine.

অর্থ: তোমাদের কর্ম ও কর্মফল তোমাদের জন্যে এবং আমার কর্ম ও কর্মফল আমার জন্যে। (সুরা কাফিরূন-১০৯:৬)

যদি সত্যি এমন হত তাহলে রাসুল (সাঃ) ইহুদি খ্রিষ্ঠানদের উৎসব বাতিল করে মুসলমানদের শুধুমাত্র দুই ঈদের সুসংবাদ দিলেন কেন? যদি জায়েজ হত উনি তখন সাহাবিদেরকে সেই সকল উৎসব উদযাপনে নিষেধ করতেন না। এখানেই রয়েছে ঈমানের পরীক্ষা। যার অনুষ্ঠান সে পালন করুক তাতে মুসলমানের কিছু আসে যায় না, যার প্রেক্ষিতে সুরা ক্বাফিরুন নাজিল হলো।

যদি কাফেরদের এই সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যাওয়া বা শরিক হওয়া বা তাতে সমর্থন দেওয়া জায়েজই হত তাহলে তো সুরা কাফিরুন রহিত ঘোষিত হত। কাজেই কাফির-মুশরিকরা কখনোই মুসলমানের দ্বীন ইসলামের বিষয়গুলো পালন করতে পারে না। তদ্রুপ মুসলমানদের জন্য কাফির-মুশরিকদের ধর্মের নিয়ম-নীতি, তর্জ-তরীক্বা, কৃষ্টি-কালচার, আদর্শ, পরামর্শ কোনোটাই গ্রহণ করা জায়েজ নেই। আপনি বলতে চান আমি তো সেখানে পূজা করতে যাচ্ছি না, শুধুমাত্র দেখতে যাচ্ছি। কিন্তু কেন?

কেউ যদি নিজেকে সত্যিকারের মুসলমান মনে করে তাহলে সে কখনো আল্লাহ পাকের আদেশের খেলাপ কাজ করতে পারেনা। আল্লাহ কোরআনে এরশাদ করেনঃ

قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاء رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا

Meaning: I am but a man like yourselves, (but) the inspiration has come to me, that your Allah is one Allah. whoever expects to meet his Lord, let him work righteousness, and, in the worship of his Lord, admit no one as partner.

অর্থঃ আমি ও তোমাদের মতই একজন মানুষ, আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের ইলাহই একমাত্র ইলাহ। যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার এবাদতে কাউকে শরীক না করে। (সুরা কাহফ-১৮:১১০)

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেছেনঃ “তোমরা মুশরিকদের উপাসনালয়ে তাদের উৎসবের দিনগুলোতে প্রবেশ করোনা। কারণ সেই সময় তাদের উপর আল্লাহর গযব নাযিল হতে থাকে।” (বায়হাকি)

আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবেই মুমিনকে সতর্ক করেছেনঃ

لاَّ يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاء مِن دُوْنِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللّهِ فِي شَيْءٍ إِلاَّ أَن تَتَّقُواْ مِنْهُمْ تُقَاةً وَيُحَذِّرُكُمُ اللّهُ نَفْسَهُ وَإِلَى اللّهِ الْمَصِيرُ

Meaning: Let not the believers Take for friends or helpers Unbelievers rather than believers: if any do that, in nothing will there be help from Allah. except by way of precaution, that ye may Guard yourselves from them. But Allah cautions you (To remember) Himself; for the final goal is to Allah.

অর্থঃ মুমিনগন যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কেন কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কেন সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোন অনিষ্টের আশঙ্কা কর, তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে আল্লাহ তা’আলা তাঁর সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করেছেন। এবং সবাই কে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে। (সূরা আল ইমরান-৩:২৮)

ইসলাম কাউকে ঘৃণা করতে শেখায় না, সবাইকে ভালোবাসতে শেখায়, বিধর্মীরা তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালুন করুক। তাতে ইসলাম বাধা দেয়না। কিন্তু কোন মুসলমান যদি তাদের সে অনুষ্ঠানে যায়, শুভেচ্ছা যানায় তাহলে সে মারাত্বক অপরাধ করলো।

ইমাম ইবনে কায়্যিম (রাহঃ) বলেনঃ “কাফেরদের তাদের উৎসবে সম্ভাষণ জানানো আলিমদের ঐক্যমতের ভিত্তিতে নিষিদ্ধ। এটা কাউকে মদ খাওয়া বা খুন করা বা ব্যভিচার করায় সাধুবাদ জানানোর মতো। যাদের নিজের দ্বীনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নেই, তারাই কেবল এ ধরনের ভুল করতে পারে। যে অন্যকে আল্লাহ্‌র অবাধ্যতা, বিদ’আত, অথবা কুফরীতে জড়ানোর কারণে শুভেচ্ছা জানাবে সে আল্লাহ্‌র ক্রোধ ও শাস্তির সামনে নিজেকে উন্মুক্ত করল।”

যেখানে শুভেচ্ছা জ্ঞাপনই নিষিদ্ধ সেখানে অংশগ্রহণ কতটা ভয়াবহ হতে পারে? তাই “ধর্ম যার যার উৎসব সবার” কিংবা “সার্বজনীন উৎসব”এরকম কুফরী বচনে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের ঈমানকে নিয়ে খেলা করা অবশ্যই মুসলীম হিসেবে বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি হচ্ছে ওদের ধর্ম ওরা নির্বিঘ্নে বাধাহীনভাবে পালন করবে। ব্যাস!

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মানে তো এই নয় যে মুসলমানকে গিয়ে পূজায় বা গির্জায় শরিক হবে আর প্রাসাদ খেয়ে দেয়ে ওদের মত (যা আমাদের ধর্মে নাজায়েজ) করে আনন্দ উদযাপন করে বেড়াবে যেহেতু নীতিগতভাবে ধর্মীয় মূল উৎসবের বিষয়ে পার্থক্য বিদ্যমান।

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার” হল ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বিষয়ের চটকদার মনগড়া কথা।

বর্তমানে বাজারে প্রতারণামূলক চালু বাক্য “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।” এই বাক্যটি সেক্যুলারিস্টদের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বিষয়ের চটকদার “মনগড়া কথা”। একটু গভীরে চিন্তা করলে বোঝা যাবে কথাটির মাহাত্ম্য।সত্যিই কি “ধর্ম যার যার উৎসব সবার”? আস্তিকমাত্রই একথার অসারতা টের পাবেন। কেননা প্রত্যেকটি ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে জড়িত আছে ধর্মবিশ্বাস। ধর্মবিশ্বাসের সূত্র ধরেই একেকটা ধর্মীয় উৎসব পালিত হয়।

“ধর্ম যার, উৎসবও তার?” ভেবেই দেখুন না।

ইসলাম ধর্মের বিষয়ে খেয়াল করুন, ইসলামের বড় উৎসব হচ্ছে, দুই ঈদ তথা ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা। এই দুই উৎসবের মধ্যে রয়েছে মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় বিশ্বাসের নিবিড় সম্পর্ক একটু যদি রমজানের উদ্দেশ্য আর কোরবানির ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় মুসলমানের উৎসব পালনের মধ্যে ধর্ম কতটা নিয়ামকের ভূমিকা পালন করছে।

খ্রিস্টানদের ‘বড়দিন’ উৎসব তো ধর্মবিশ্বাসেরই অংশ। ঈসা (আঃ) কে তারা যিশু মনে করে তার জন্ম দিন পালন করে, তারা ভেবে নিয়েছে যিশু হচ্ছেন আল্লাহরই একটি অংশ; যিনি মানবরূপে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করছেন। তারা ‘ত্রিতত্ত্ববাদ’ এ বিশ্বাস করে। যেখানে আল্লাহ হলেন পিতা আল্লাহ, ঈসা হলেন পুত্র আল্লাহ এবং মরিয়ম হলেন পবিত্র আত্মা।

হিন্দুদের শারদীয় দুর্গাপূজা, কালীপূজাসহ বিভিন্ন পূজা উৎসবের মধ্যেও আছে গভীর ধর্মবিশ্বাসের অস্তিত্ব। ধর্মবিশ্বাসের কারণেই তারা বিভিন্ন পূজা উৎসব পালন করছেন। বৌদ্ধদের সবচেয়ে বড় উৎসব হচ্ছে বৌদ্ধ পূর্ণিমা। এ দিনটিকেও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা পালন করেন ধর্মবিশ্বাস থেকেই। ধর্মবিশ্বাসের এই তারতম্যের কারণেই যার যার ধর্ম, উৎসব ও তার তার।

আমাদের মুসলিমের কাছে যিনি নবী, খ্রিস্টানদের কাছে তিনি আল্লাহর স্বত্তা বা অংশ, যা মুসলিমদের ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। আবার মূর্তি পূজা হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্মে মানুষের মুখে মুখে পবিত্র কর্ম বলে বিবেচিত হলেও ইসলামে তা পৌত্তলিকতা এবং আল্লাহর অস্তিত্বে অন্য কাউকে শরিক করার শামিল, যা আল্লাহ’র কথা মত অবশ্যই ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। আবার ইসলামের শরীয়তে এমন অনেক বিষয় আছে যা অন্যান্য ধর্মের লোকারা বিশ্বাসও করতে চায় না, মেনে নেয় না।

ধর্মবিশ্বাসের এই মুখোমুখি অবস্থান ও ভিন্নতার কারণে এক ধর্মে বিশ্বাসী লোক অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীর উৎসবকে বিশ্বাস স্বীকার ই করতে পারে না। যা করলে তাকে নিজ ধর্মের বিশ্বাসকে বিসর্জন দিতে হবে। এ কারণেই ধর্মীয় উৎসব সর্বজনীন নয়। যারা ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ বলে বেড়ান তারা মূলত সব ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে ধোঁকায় ফেলে রেখেছেন।

এখন আমরা মুসলমানরা যদি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে সর্বজনীনতার রূপ দিতে চাই এই বলে যে ধর্ম যার যার, সেক্ষেত্রে কোনো উৎসব কে সর্বজনীন করতে গেলে তার মধ্যে অশ্লীলতা, গান-বাজনা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মাদকতা ইত্যাদি হুরহুর করে ঢুকে পড়বে, যা ইসলাম কোনোভাবেই অনুমোদন করে না।

এখন সিদ্ধান্ত আপনারঃ

(১) মুসলিম হয়ে পূজা দেখতে যাবেন??

হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেছেনঃ “তোমরা মুশরিকদের উপাসনালয়ে তাদের উৎসবের দিনগুলোতে প্রবেশ করো না।। কারণ সেই সময় তাদের উপর আল্লাহর গযব নাযিল হতে থাকে।” (বায়হাকী)

আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রাহঃ) এই সনদকে সহিহ বলেছেন। (আহকামুল জিম্মাহ-১:৭২৩-৭২৪)

ফক্বীহদের মতে এমন কাঠামোতে যেখানে আল্লাহ ভিন্ন অন্য কোন কিছুর উপাসনা করা হয় সেখানে প্রবেশ করা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। (রাদ্দুল মুহতার-১:৩৮০)

(২) মুসলিম হয়ে পূজা তে Wish করতে চান??

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে কেউ কোন সম্প্রদায়ের সাদৃশ্যতা ধারণ করলো, সে তাদের-ই অন্তর্ভুক্ত।” (সূনান আবু দাউদ- ৪:৪৪)

তাদের পূজার উৎসবে শুভেচ্ছা জানানো, তাদের সাথে সাদৃশ্যতা। কেননা তারাও একে অপরকে শিরক-কুফরের অনুসারী হওয়ার কারণেই শুভেচ্ছা জানায়, আনন্দ করে।

এছাড়া, অপর ধর্মের উৎসবের স্বীকৃতি দেয়া মানে তার সেই শিরক বা কুফরের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করা অথবা কমসে কম তার সেই শিরক বা কুফরের উপর থাকাতে খুশী প্রকাশ করা। একজন মুসলিম কখনোই শিরক বা কুফরের ঘটনায় সন্তুষ্ট হতে পারে না।

ফক্বীহদের মতে, শিরক-কুফরের অনুষ্ঠানে মৌখিকভাবে শুভেচ্ছা জানানোর শব্দ চয়নের ভিত্তিতে কুফুরী থেকে শিরকী যেকোনটিই সংঘটিত হতে পারে।। কোন কোন শব্দ এমন যা কুফরের উপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করে (যেমনঃ Merry Christmas বলা) আর কোনটি শিরকের উপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করে (যেমনঃ যেকোন দেব দেবীর পূজার শুভেচ্ছা জানানো)

বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য দ্রষ্টব্যঃ
১. জামে উল ফুসুল্লীন-২:২৩০
২. ফাতাওয়া এ মাহমূদীয়া-১৯:২৬৭

ঈমাম শামসুদ্দিন আয যাহাবী (রহঃ) এর মতেঃ “মুসলিমগন কাফিরদের কোন উৎসবে অংশ নিবে না, যা কিনা তাদের ধর্মের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ঠিক যেমন করে কোন মুসলিম অন্য ধর্মের অনুশাসন এবং উপাসনার লক্ষ্যবস্তু গুলোকে গ্রহন করতে পারে না।” (সূত্রঃ তাশাব্বুহুল খাসিস বি আহলিল খামিস-৪:১৯৩)

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেনঃ “কাফেরদের উৎসবের নিদর্শন এমন কিছুতে অংশ নেয়া মুসলমানদের জন্য জায়েয নয়।” (সূত্রঃ মাজমু আল ফাতাওয়া-২৯:১৯৩)।

 

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: