banglanewspaper

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে বলার আগে, শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের ধারণাটা আলোকপাত করি। ব্রিটিশ আমলে বাঙালী মুসলিম সম্প্রদায় পাশ্চাত্ত্য শিক্ষাকে হারাম, অবৈধ, অনৈসলামিক ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে, পাশ্চাত্ত্য শিক্ষা বর্জন করে। ফলে তারা ক্রমেই ব্রিটিশদের সান্নিধ্য হতে দূরে চলে যেতে থাকে।

অপরদিকে, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন পাশ্চাত্ত্য শিক্ষার ব্যাপারে ধর্মীয় সংকীর্ণতা না বাধার কারনে তারা উত্তরোত্তর সফলতার পথে এগুতে থাকে। তারা ক্রমান্বয়ে সরকারের সান্নিধ্য লাভে সক্ষম হয় এবং ফলশ্রুতিতে নিজেদের অবস্থার ও যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হয়। দেরীতে হলেও মুুসলিম সম্প্রদায় একসময় ভূল বুঝতে পারে এবং পাশ্চাত্ত্য শিক্ষার প্রসারে উদ্যমী হয়। আব্দুল লতিফ, নওয়াব সলিমুল্লাহর মত ব্যক্তিত্ব পাশ্চাত্ত্য শিক্ষার প্রসারে নিবেদিত হন।

সেসময় মানুষের মধ্যে একটা অনুভূতি জন্মলাভ করে। সেটা ছিল," ভাগ্যের উন্নয়নে শিক্ষার বিকল্প নেই"। সেসময়ের মানুষ ভেবেছিল, শিক্ষার জাদুবলেই কেবল নিজের অবস্থার উন্নয়ন করা যাবে, সরকারি চাকুরী করা যাবে, সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা - সবই অর্জিত হবে। কিন্তু, সেই শিক্ষার উদ্দেশ্য কশ্চিনকালেও ছিলনা নিজেকে জানার, মনুষ্যত্ব অর্জনের কিংবা নতুন কিছু উদ্ভাবনের।

রবীন্দ্রনাথ, নজরুল,শরৎ - এর মত অসংখ্য মহামনিষীর উদাহরণ আমরা দিতে পারি যারা সবাই পাশ্চাত্ত্য শিক্ষায় স্বল্প শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিতের পর্যায়ে ছিলেন।
তবু তারা স্বশিক্ষিত হয়ে অর্জন করেছিলেন শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য। নিজেকে আলোকিত করেছিলেন, আলোকিত করেছিলেন গোটা বিশ্বকে। কিন্তু, পাশ্চাত্ত্য শিক্ষায় শিক্ষিত এমন মহামনিষী কজন আছে বলুন?

ব্রিটিশ প্রণীত তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থা শুধুমাত্র ব্যক্তির উন্নয়নে সফল হয়েছিল, ব্যক্তিত্বের নয়।

দূর্ভাগ্যজনকভাবে, দুইশ বছর আগের সেই ধ্যাণধারনা আজও আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে। আজও তাই ভার্সিটির শিক্ষকদের মুখে" শিক্ষার উদ্দেশ্য" সম্পর্কে গতাগতানুগতিক মতামত বিস্মিত করে। আজও শুনি, শিক্ষা ভাল জব পাবার অন্যতম মাধ্যম, ভালো ক্যারিয়ার, ভার্সিটির টিচার ইত্যাদি ইত্যাদি। তাহলে এই দুইশ বছরেও ধারনাটা বদলাতে পারলামনা আমরা? নাকি আজও আমরা পড়ে আছি সেই দুইশ বছর আগেকার সভ্যতায়?

প্রতিবছর সরকার বাজেটের বড় একটা অংশ ব্যায় করেন উচ্চশিক্ষার জন্যে, গ্রাজুয়েশন করানোর জন্য।
কি হচ্ছে আউটকাম?
এই টাকার হচ্ছে কি কোন সদ্ব্যবহার?
যদি হয়, তাহলে দেশের এই হালত কেন?
সব দোষ কি পলিটিশিয়ানদের?
নাকি এই গ্রাজুয়েটদের, শিক্ষিতদের?
সরকারি পয়সায় পড়াশোনা করে,
করে কী এরা?
শীট-বই গলাধঃকরন করে, পরীক্ষার খাতায় তাই বমি করে হায়েস্ট সিজিপিএ তুলে, ভালো একটা চাকুরীতে নেমে পড়ে,
নিজের ভাগ্যের উন্নয়ন করে।

নিজেরটাই যদি বুঝতে হবে, তবে সরকারি পয়সায় কেন এদেরকে পড়াতে হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে জাতিকে ভাববার সময় এসেছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে, নিজেদেরকে দরিদ্র জাতি বলে বিশ্বের সামনে দাড়াতে লজ্জা লাগে।

এখন আসেন গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে। এখানে ক্লাস ওয়ান থেকেই একটা বাচ্চাকে মানুষ থেকে "তোতা পাখি" তে পরিণত করা হয়। অ- তে খালি অজগর হয়, এমন ধারণা মাথার মধ্যে কাজ করে। এই বাচ্চাটা যখন বড় হয়ে স্কুলে যায়, সেখানেও দেখতে পায় একই অবস্থা। শিক্ষক মশাই অতি সহজ উপায়ে, পড়া হজম করার উপায় বাতলে দেন। ছাত্রও তা মন দিয়ে শিখে। এই সিস্টেমটা চলতে থাকে গোটা শিক্ষা জীবন ধরে। তাই, ভার্সিটির গ্রাজুয়েট ছেলেটাও নিজেকে তুচ্ছ ভাবতে শুরু করে।

কারণ, তার মধ্যে নিজের বলতে কিছু নেই, যা আছে তা স্যারের দেয়া নোট, শীট আর গৎবাধা কিছু থিওরি। কী হবে এসব থিওরি মুখস্ত করে? এর যে একটা ইমপ্লিমেনটেশন আছে, সেটা তো কোনদিন দেখানো হয়নি"'।

আমাদের হায়েস্ট সিজিপিয়ানের মাথায় যখন ঘুরে -নোট, শীট, বই, শিক্ষকের তেলবাজি ইত্যাদি...
এমেরিকান স্টুডেন্টটা তখন ল্যাবে মগ্ন থাকে থিওরির মডেলটা কীভাবে ডেভেলপ করা যায়, কীভাবে রুপায়ণ করা যায়, কীভাবে তা কাজে লাগানো যায়, এসব নিয়ে।

দুজনের চিন্তার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। তাহলে বিচার আপনিই করতে পারবেন, কাদের উন্নতি করাটা উচিত! মুখস্তের চাপে একটা ছেলে বুঝতেই পারলনা কী আছে তার ভেতর? দেশের জন্যে মেধাটার কোনো উপযোগিতা আছে কী না। তাহলে, অপ্রষ্ফুটিত, অকর্মণ্য এ মেধা জাতির কী এমন কাজে লাগতে পারে?
তাইত দেখি বিশ বছর আগে যা ছিলাম, আজও তাই আছি, খুববেশী পরিবর্তন আসেনি।

যতটুকু পরিবর্তন এসেছে, তা সময়ের দাবী। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে আগামী বিশ বছর পর আমাদের অবস্থান হয়ত আরো লজ্জাজনক অবস্থানে পৌছাবে। যেটা কখনও কাম্য হতে পারে না। তাই বদলাতে হবে গতানুগতিক শিক্ষার কাঠামো। নতুন ধাঁচে ঢেলে সাজাতে হবে শিক্ষা ব্যবস্থা। মুখস্ত বিদ্যাকে সমাধীস্থ করে সৃষ্টিশীল করে তু্লতে হবে সকলকে।

প্রত্যেকটি পাবলিক ভার্সিটিকে তৈরী করতে হবে একেকটি ইন্ডাস্ট্রি রুপে, যেখান থেকে বের হবে দক্ষ, যোগ্যতা সম্পন্ন এবং আধুনিক বিশ্বের সাথে প্রতিযোগীতা সক্ষম মানুষ। যাদের মধ্যে আবার জন্ম নেবে যুগারম্ভর সাহিত্য স্রষ্টা, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, উদ্যোক্তা, সর্বোপরি,  সর্বগুণে গুনাণ্বিত মানব সভ্যতা।

লেখকঃ আলীনুর রহমান (রানা)।

 

 

 

 

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: