কাজী আনিছুর রহমান, রাণীনগর (নওগাঁ) : বর্তমান যেমন গুরুত্ববহ, সোনালী অতীতও তেমনি অনুপ্রেরণা যোগায়। আমরা বাঙালী, আমাদের রয়েছে ঐতিহাসিক অতীত। বাংলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাসের স্মৃতি চিহ্ন। এসব ছড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত স্থানসমূহ আমাদের স্বত্তাতে আলোড়ন জাগায়।

তেমনি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আলোড়ন জাগানো ঐতিহাসিক অতীত বহুল স্থান নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলায় মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিবিজড়িত আত্রাই গান্ধী আশ্রম। এক সময় অবহেলিত এই গান্ধী আশ্রমের উন্নয়ন কাজ দিন দিন এগিয়ে চলেছে। এ গান্ধী আশ্রমও হতে পারে একটি পর্যটন কেন্দ্র।

ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের পথিকৃত, অসহিংস ব্যক্তিত্ব, ভারতবর্ষের জনপ্রিয় নেতা মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতি বিজড়িত আত্রাই গান্ধি আশ্রম অনেকটাই সেজেগুজে এগুতে যাচ্ছে। আগের মত নেই আর সেই ভুতুড়ে পরিবেশ, নেই দখলদারীত্বের কালোথাবা। বিভিন্ন প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে দিন দিন গান্ধী আশ্রমের কলেবর বেড়েই চলেছে। ইতোমধ্যে ভারতীয় অর্থায়নে সেখানে মহাত্মা গান্ধী ও পিসি রায় মেমোরিয়াল হল গড়ে উঠেছে। বর্তমানে এ একতলা ভবনকে দ্বিতীয় তলায় উন্নীত করা হচ্ছে। গান্ধীর স্মৃতি বিজড়িত সেই গুদামঘরটিও সংস্কার করা হচ্ছে। এছাড়াও নওগাঁ জেলা পরিষদের অর্থায়নে সেখানে বাউন্ডারি ওয়াল ও দৃষ্টিনন্দন একটি গেট নির্মাণ করা হয়েছে।

জানা যায়, ইংরেজ সম্রাজ্যবাদের নির্যাতনের যাঁতাকলে যখন পিষ্ঠ ভারতবাসী। তাদের জুলুম ও নিপীড়নে অতিষ্ঠ বিস্তীর্ণ জনপদের মানুষ। সে সময় ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের ডাক দিয়ে জনমনে জায়গা করে নেন ভারতবর্ষের কিংবদন্তী মহাত্মা গান্ধী। হিন্দু-মুসলমানের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ধর্ম বর্ণের উর্ধ্বে থেকে তিনি এ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ইংরেজদের পণ্য বর্জন করে দেশীয় পণ্য ব্যবহারে জনমত সৃষ্টি করেন। জনশ্রুতি আছে যে তিনি এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ১৯২৫ সালে আত্রাই এসেছিলেন। সে সময় তিনি আত্রাই রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন আজকের এই গান্ধী আশ্রমে অবস্থান করে এলাকার অসহায় মানুষদের সহযোগিতা করেন। একই সাথে এলকাবাসীকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে তিনি এখানে খদ্দর কাপড় তৈরির তাঁত শিল্প স্থাপন, খাঁটি সরিষার তেলের জন্য ঘানি স্থাপনসহ অনেক স্মৃতিচিহ্নই গড়ে তোলেন।

এ বিষয়ে আত্রাই গান্ধী আশ্রমের সেক্রেটারী জেনারেল ডা. নিরঞ্জন কুমার দাস বলেন, এক সময় গান্ধী আশ্রমের উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়েছিল। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ সংস্থার প্রধান উপদেষ্টা স্থানীয় এমপি মো. ইসরাফিল আলম ও উপদেষ্টা সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা ওহিদুর রহমান এর উন্নয়নের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধন করেন। তাদের প্রচেষ্টায় ভারতীয় অর্থায়নের এখানে গড়ে তোলা হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ‘মহাত্মাগান্ধি ও পিসি রায় মেমোরিয়াল হল’।

এছাড়াও এখানে প্রতি বছর আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে পালিত হয় মহাত্মা গান্ধীর জন্মোৎসব। এখানে স্থাপন করা হয়েছে আত্রাই ডায়াবেটিস সমিতি। যেখান থেকে প্রতি শুক্রবার এলাকার অসংখ্য ডায়াবেটিস রোগী প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন।

গান্ধী আশ্রমের সভাপতি অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের এমপি সাহেবের আন্তরিকতা ও সাবেক এমপি ওহিদুর রহমানের প্রচেষ্টায় বর্তমানে গান্ধি আশ্রমের উন্নয়ন অনেক এগিয়ে গিয়েছে। এখানে ভারতীয় দূতাবাসের সহকারী হাই কমিশনারসহ কুটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ কয়েকবার এসেছেন। এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ দাতব্য চিকিৎসালয়, কৃষি খামার, মৎস্য খামারসহ বেশ কিছু স্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা সংস্থার রয়েছে। যেহেতু এ গান্ধী আশ্রম উপজেলা সদরের একেবারেই সন্নিকটে, রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন এবং মনোরম পরিবেশে। তাই এখানে উল্লেখিত স্থাপনাগুলো নির্মিত হলে ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে এটি একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সমুহ সম্ভাবনা রয়েছে।

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, ভারতবর্ষের জনপ্রিয় নেতা মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিধন্য গান্ধী আশ্রম এখন আর অবহেলিত নেই। উন্নয়নের ছোঁয়ায় একটি পর্যটন কেন্দ্রে রুপান্তরিত হতে চলেছে। এখানে আধুনিক মডেলের ডাকবাংলো নির্মাণ, বিভিন্ন ভাস্কর্য নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে এটি একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠবে।