banglanewspaper

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৩০ ভাগ যুবসমাজ। এর মধ্যে সিংহভাগই বলতে গেলে বেকার। বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই বেশি। সে বেকারত্ব অভিশাপে দেখা দিয়েছে আমাদের যুবসমাজের অবক্ষয়। যুব শক্তির অপচয় বা যুবজীবনের অধঃপতনই হলো যুবসমাজের অবক্ষয়।

যুবসমাজ হচ্ছে একটি দেশ ও জাতির উন্নযনের চাবিকাঠি। যুবসমাজের কঠোর শ্রম, মেধা, ম্নন, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা দেশ ও জাতিকে  উন্নয়নের শীর্ষবিন্দুতে পৌছে দেয়। কারণ যুবসমাজের রয়েছে অপরিমিত সাহস এবং শক্তি। তারা দুর্যয়কে জয করতে পারে।অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের যুবসমাজ দিন দিন অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আর এ অবক্ষয়ের মুলে রয়েছে অথনৈতিক দুর্বলতা। যে দুর্বলতার জন্য আমরা এখনও দারিদ্রোর কষাঘাতে জর্জরিত; অপুষ্টিতে ভুগছি অনবরত। সচেতনতার অভাবে, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার প্রভৃতির কারণে জনসংখ্যা বাড়িয়ে চলেছি। কর্মসংস্থানের অভাবে শিক্ষিত বেকার যুবক বেছে নিচ্ছে চোরাচালান, রাহাজানি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদকদ্রব্যের ব্যবসায়। জডিয়ে পডছে  মাদকাসক্তি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। রাজনৈতিক সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার মানসে দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আমাদের  যুবসমাজকে  নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে চলেছে। সম্পদের অসম বণ্টন, ভূমিব্যবস্থার ত্রুটি ইত্যাদির কারণে একদল সুবিধাভোগী লোক দিন দিন ফুলে ফেপেঁ ধনী হয়ে উঠছে। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠী ঐ ধনী গোষ্ঠীর হাতের পুতুলে পরিণত হচ্ছে। বিশ্বায়নের প্রভাবে মুক্তবিশ্বে পাশ্চাত্য অশ্লীল গান, নাচ, সংলাপ, আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ প্রভৃতি অনুকরণ করতে গিয়ে আমাদের যুবসমাজ দেশজ সংস্কৃতিকে ঠেলে দিচ্ছে আস্তাকুড়ে। ফলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পদে পদে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেশনজট, রাজনীতির নামে চাঁদাবাজি, ভালোবাসার নামে প্রতারণা, সঙ্গদোষে যুবসমাজ আজ ধবংসের পথে। পিতামাতার উদাসীনতা সন্তানকে নিয়ে যাচ্ছে আরও অন্ধকারের পথে।

সবার জন্য শিক্ষার অবারিত সুযোগ নিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্মের সিংহভাগ শিশু আজ স্কুলে যাচ্ছে অথচ মাধ্যমিক কিংবা উচ্চশিক্ষার ব্যয় নির্বাহের সামর্থ্য এই সিংহভাগ শিক্ষার্থীরই নেই। আবার এই শিক্ষা গ্রহণে আমাদের অনেকের জীবনের অনেকটা সময়ই অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে। ২৪-২৬ বছর লেগে যাচ্ছে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করতে। আর চাকরি পেতে লেগে যাচ্ছে  আরও ৫ থেকে ৭ বছর। ৩০ বছর অতিবাহিত  হবার পর কাজের সামর্থ্যই বা কতটুকু থাকে। আবার চাওয়া-পাওয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরিও বা কোথায়।  অথচ মধ্যবিত্ত ঘরের একটা সন্তান যখন তার উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করছে তখন তার মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনের আশা বেড়ে যাচ্ছে তাকে ঘিরে, এই বুঝি তাদের কষ্টের দিন শেষ হতে চলেছে। আর যখন আমরা নিজেদের স্বপ্ন বা পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করতে পারছি না তখনই ডুবে যাচ্ছি হতাশার অতল গহব্বরে। তাইতো আজ আমাদের আহাজারি  -

                      “ কোথায় আমার চাকরি নামের

                            সোনার হরিণ

                        কোন জীবনে শুধব আমি

                        পিতা মাতা, পরিবার আর

                           দেশমাতৃকার ঋণ।“

গত ২৮ মে ২০১৭ ‘শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬’ প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো(BBS)। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) দেওয়া মানদণ্ড অনুযায়ী, সপ্তাহে এক ঘন্টা কাজ না করলে ঐ ব্যক্তিকে বেকার হিসেবে ধরা হয়।বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ। বেকারত্বের হার ৪.২%। নারীদের বেকারত্বের হার ৬.৮% এবং পুরুষদের বেকারত্বের হার ৩%। ১৫ বছরের উপরে কর্ম উপযোগী মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৬১ লাখ। আর এদের মধ্যে কাজ করেন এমন মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ৯৫ লাখ। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি ৯%। কোন ধরনের শিক্ষার সুযোগ পায়নি এমন মানুষের মধ্যে বেকার ২.২%। ১৫-২৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম তরুণ-তরুণীর মধ্যে বেকার ১০%।বর্তমানে এই সব বেকারের মধ্যে ০.৫৬% মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। বছরে প্রায় ১ লাখের ও বেশি যুবক জড়িয়ে পড়ছে মাদক ব্যবসায়ে।আবার ০.৬৫% যুবক জড়াচ্ছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। যার দরুণ আমরা হয়ে পড়ছি মেধাশূন্য মেরুদণ্ডহীন জাতি।   

এই অবক্ষয়রোধে সর্বাগ্রে শিক্ষাকে সুযোগ বা অধিকারের স্লোগানে আবদ্ধ না রেখে অর্জনের সাফল্যে অভিষিক্ত হওয়া প্রয়োজন। যোগ্যের বা কর্মক্ষমের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করতে হবে। সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য হ্রাস করতে হবে। নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। পারিবারিক বন্ধনকে সুদঢ় করা অতি জরুরি। আর এ জন্য সরকার বা সমাজের কাছে হাত পাতায় কোন লাভ নেই। আপ্ন ভাগ্য বিনির্মাণে চাই আন্তরিক প্রয়াস, নিজস্ব সাধনা।এমন মূল্যবোধে যারা বিশ্বাসী হবে, তাদের জীবনে অবক্ষয় ঘটবে না। এমনকি অবক্ষয় থেকে উত্তরণের চাবিকাঠিও এই স্বেচ্ছা  প্রয়াস। খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা নয়, শ্রমের বিনিময়ে জীবিকার্জনের সাধনা চাই। সে সাধনা দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার হবে,অবক্ষয় থেকে মুক্ত করবে আমাদের।

 

মোছাঃ আরজিনা খাতুন
এম এস এস শিক্ষার্থী,
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

 

 

 

 

 

 

 

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: