banglanewspaper

আব্দুম মুনিব, কুষ্টিয়া : বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ’র তীর্থস্থান কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়া বাড়িতে আজ থেকে শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসব। লালন একাডেমী ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে সোমবার সন্ধায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে লালন শাহের ১২৭তম তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান।

এ উপলক্ষে কুষ্টিয়া কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়া আঁখড়াবাড়ী লালন মাজারকে সাজানো হয়েছে নতুন সাজে। মাজারের বাইরে বিস্তীর্ণ কালী নদীর ভরাটকৃত জায়গায় স্থাপিত লালন মঞ্চের সামনে বিশাল ছামিয়ানা টাঙ্গানো হয়েছে। আলোচনা মঞ্চের চারপাশ লালন মাজারের প্রধান রাস্তা জুড়ে বসেছে গ্রামীণ মেলা। প্রেম, ভক্তি আর ভালোবাসার টানে লালন ভক্ত অনুসারীরা জীবনের মধ্যে নতুন জীবন খুঁজে পাওয়ার শিক্ষা নিয়ে লালনের আখড়া বাড়িতে আসতে শুরু করেছেন। তবে এবার সাঁইজির বারামখানায় লালন ভক্ত অনুসারীরা উপস্থিতি অনেক কম। 

সোমবার সন্ধায় তিন দিনব্যাপী লালন মেলা ও আলোচনা সভার আনুষ্ঠানিক উদ্ধোধন করবেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধরণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া সদর আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবউল আলম হানিফ। কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. জহির রায়হানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখবেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এস এম মেহেদী হাসান (বিপিএম), কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী রবিউল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী, কুমাখালি উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান খান, বিজ্ঞ জিপি এ্যাড.আখতারুজ্জামান মাসমু, বিজ্ঞ পিপি এ্যাড.অনুপ কুমার নন্দী প্রমুখ। 

প্রধান আলোচক হিসেবে থাকছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর ড.সরোয়ার মুর্শেদ। আলোচক থাকছেন লালন মাজারের প্রধান খাদেম মহম্মদ আলী। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখবেন কুমারখালি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুজ্জামান, লালন একাডেমির এ্যাডহক কমিটির সদস্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সেলিম হক। স্বাগত বক্তব্য রাখবেন লালন একাডেমির সহ-সভাপতি কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(সার্বিক) মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান। 

আলোচনা শেষে দ্বিতীয় পর্বে লালন মঞ্চের বিভিন্ন শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে প্রতিদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হবে লালন সঙ্গীত। এতে সঙ্গীত পরিবেশন করবেন দেশের খ্যাতনামা শিল্পীবৃন্দসহ লালন একাডেমীর স্থানীয় শিল্পীরা।

লালনভক্তদের মতে, লালন সাঁইজি তার গানের মধ্যে দিয়ে জাতপাতহীন সমাজ ব্যবস্থার দর্শন দেখিয়েছেন। তিনি গানের মধ্যে দিয়ে সমাজের ধর্মান্ধ, গোঁড়ামি, শাসকদের পক্ষপাত বিচার ও বৈষম্য দূর করার পথ দেখিয়েছেন। সব ধর্মের ঊর্ধ্বে থেকে মরমী সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন মানবমুক্তির জন্য সৃষ্টি করেছিলেন ফকিরী মতবাদ। তার মানবমুক্তির আলোকিত সৃষ্টি বাউল গান নিয়ে সারা বিশ্বের ভক্ত ও অনুরাগীরা তাকে চিনেন, জানেন ও হৃদয়ে লালন করেন।

উল্লেখ্য, বৃটিশ শাসকগোষ্ঠির নির্মম অত্যাচারে গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনকে যখন বিষিয়ে তুলেছিল, ঠিক সেই সময়ই সত্যের পথ ধরে, মানুষ গুরুর দিক্ষা দিতেই সেদিন মানবতার পথ প্রদর্শক হিসাবে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ’র আবির্ভাব ঘটে কুষ্টিয়ার কুমারখালির ছেঁউড়িয়াতে। লালনের জন্মস্থান নিয়ে নানা জনের নানা মত থাকলেও আজো অজানায় রয়ে গেছে তাঁর জন্ম রহস্য। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। আর্থিক অসংগতির কারনে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে পারেননি। তবে তিনি ছিলেন স্বশিক্ষায় শিক্ষিত। যৌবনকালে পূণ্য লাভের জন্য তীর্থ ভ্রমনে বেরিয়ে তার যৌবনের রূপান্তর ও সাধন জীবনে প্রবেশের ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। তীর্থকালে তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে তার সঙ্গীরা তাকে প্রত্যাখ্যান করে। পরে কালিগঙ্গা নদী থেকে উদ্ধার হয়ে মলম শাহ’র আশ্রয়ে জীবন ফিরে পেয়ে সাধক সিরাজ সাঁইয়ের সান্নিধ্যে তিনি সাধক ফকিরী লাভ করেন। ভক্ত মলম শাহের দানকৃত ১৬ বিঘা জমিতে ১৮২৩ সালে লালন আখড়া গড়ে ওঠে। প্রথমে সেখানে লালনের বসবাস ও সাধন-ভোজনের জন্য বড় খড়ের ঘর তৈরী করা হয়। সেই ঘরেই তাঁর সাধন-ভজন বসতো। ছেঁউড়িয়ার আঁখড়া স্থাপনের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শিষ্যভক্তদের নিয়ে পরিবৃত থাকতেন তিনি। ফকির লালন সাঁই প্রায় এক হাজার গান রচনা করে গেছেন। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ভোরে এই মরমী সাধক বাউল সম্রাট দেহত্যাগ করেন এবং তাঁর সাধন-ভজনের ঘরের মধ্যেই তাকে সমাহিত করা হয়।

ট্যাগ: