banglanewspaper

রুমেল আহমদ: ছাত্রজীবন প্রত্যেকটি মানুষের জন্য একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে একজন ছাত্র নিজেকে ভবিষ্যৎতের উপযোগী করে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়।

একজন কৃষক ভাল বীজ বপণ করলে যেমন ভাল ফসল আশা করেন। ঠিক তেমনি ভাবে যে ছাত্র ভবিষ্যৎতের জন্য নিজেকে যথার্থ করে তৈরী করতে পারে, কর্ম জীবনে সেই কেবল সফলতা অর্জন করতে পারে।

একজন মেধাবী ছাত্র আগামী দিনের সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হতে পারে। একেক জন ছাত্রের একেক রকমের ইচ্ছা থাকতে পারে। বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে কর্মজীবনে অংশ গ্রহণ করতে পারে। তবে যারা দেশের সমৃদ্ধির জন্য মানুষের কল্যাণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে চায়, তাদেরকে ছাত্র রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে হয়।

ছাত্র রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করার ফলে একজন ছাত্র ভবিষ্যতে ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারী-বেসরকারী চাকুরী যেখানেই কর্মজীবন শুরু করুক না কেন সেখান থেকেই অত্যন্ত নিষ্ঠা, দক্ষতা ও সচেতনতার সাথে দেশের সমৃদ্ধির জন্য জনগণের কল্যাণে কাজ করতে পারেন। এজন্যই ছাত্র জীবনে প্রত্যেকটা ছাত্রের আদর্শিক রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। একটা সময় ছিল যখন ছাত্র রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করত দেশের সকল মেধাবী ছাত্ররা, দেশ ও জনগণের সেবার প্রত্যয়ে সেই সকল তরুণ মেধাবী ছাত্ররা ছাত্র রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতেন। সেই জন্যেই বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৪‘র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২‘র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬‘র ঐতিহাসিক ৬ দফা ও ১১ দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যূত্থান, ৭০‘র নির্বাচন, ৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন।

পরবর্তীতে ৯১‘র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে এদেশের ছাত্র রাজনীতির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক ভূমিকা। সে জন্যেই জনগণের নিকট ছাত্র রাজনীতির আলাদা একটা গ্রহণ যোগ্যতা ছিল। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট রাজনীতি আমাদের দেশ ও জনগণের সামনে দেখা দিয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে। জনগণ এখন আর ছাত্র নেতাদেরকে আগের মত সম্মান করেন না। ছাত্র রাজনীতিকেও জনগণ সহজভাবে ও ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে না। জনগণ ছাত্র রাজনীতির প্রতি ভীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে। এর কারণ কী?

এর বিভিন্ন কারণ রয়েছে তথাকথিত কিছু ছাত্র সংগঠনের অযোগ্য, মেধাহীন, বিবেকহীন নামধারী ছাত্র নেতাদের অনৈতিক ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপই এর প্রধান কারণ। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বলে ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার মাধ্যমে একজন ছাত্র নিজের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ, নিজেকে সন্ত্রাসী বা চোরাকারবারীর বা অন্যের হাতের ক্রিড়নক হিসেবে গড়ে তোলে। বর্তমানে ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছাত্রদের সাধারণ মানুষ আদর্শহীন, চরিত্রহীন, অর্থলোভী, মাস্তান, চাঁদাবাজ, অস্ত্রবাজ, মূর্খ সর্বোপরি সমাজের জন্য মারাত্মক ভাইরাস মানুষ বলে মনে করেন। কিন্তু এ কথা সত্য এবং ইতিহাস দ্বারা প্রমাণিত যে, ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমেই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রাথমিক ভীত তৈরী হয়েছে এবং আদর্শবান ছাত্র নেতারাই রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

তথাপি সাধারণ মানুষ ছাত্র রাজনীতিকে পছন্দ তো দূরের কথা রীতিমত ঘৃণার চোখে দেখেন। বর্তমানে যে সংগঠন গুলোর আদর্শ রয়েছে ঐতিহাসিক অর্জন রয়েছে। সেই সংগঠনের প্রতি ও সাধারণ মেধাবী তরুণ ছাত্রদেরকে আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না, কারণ এ সকল সংগঠনেও আজ গ্রহণের কাল লেগেছে। অযোগ্য নীতিহীন প্রতারক মূর্খ ছাত্রনেতাদের অনৈতিক কার্যকলাপের ফলেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এমন কিছু দুর্বৃত্তের হাতে যাদের বিবেকবোধ নেই, নীতিবোধ নেই, নূন্যতম আদর্শের ধারে কাছেও নেই। বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি মানেই রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড় বৃত্তি, টেন্ডারবাজি, জমি দখল, কালো টাকার, ছড়াছড়ি, অন্যান্য লোকের নেতৃত্ব দখলের পায়তারা।

এই যদি হয় ছাত্র রাজনীতির অবস্থা তাহলে কিভাবে ছাত্র সংগঠন গুলোর প্রতি সাধারণ ছাত্রদের আকৃষ্ঠ করা যাবে। জনগণই বা কিভাবে ছাত্র রাজনীতিকে সহজ ভাবে গ্রহণ করবে। আজকে যারা ছাত্র রাজনীতি করেছে বা নেতৃত্ব দিচ্ছে ইতিহাস সম্পর্কে তাদের কোন ধারনাই নেই। কারণ দীর্ঘ সময় এদেশের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্ম কে অবহিত করা হয়নি। পাঠ্য পুস্তকে বিকৃত ইতিহাস উপস্থাপন করা হয়েছে। এদেশের বর্তমান ছাত্ররা পাঠাপুস্তুকে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবার রহমান, ক্ষুদিরামের ইতিহাস পড়ে না, সূর্যসেন, তিতুমির, প্রিতিলতা, শান্তি সুনীতি, সমশের গাজী, জগৎ সিং এর ইতিহাস পড়ে না। আমাদের দেশের ছাত্ররা আন্তর্জাতিক মানের নেতৃত্ব যেমন রাশিয়ার লেলিন, চীনের মাও সে তুং, চিলির আলেন্দে, ভিয়েতনামের হু চি মিন, ভারতের মহাত্মা গান্ধি, তুরস্কের কামাল আতার্তুক, কিউবার ফিদেল কেষ্ট্রো, আফ্রিকার মেন্ডেলা, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাতের জীবন কাহিনী ও রাজনৈতিক ইতিহাস জানে না। কারণ রাষ্ট্র তা জানার ব্যবস্থা করেনি, যার কারণে নির্লোভ নেতৃত্ব এখন আর গড়ে উঠছে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তোফায়েল আহম্মদ, আবদুর রাজ্জাক, আ.স.ম রব, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, কাদের সিদ্দিকিসহ সাত বীর শ্রেষ্ঠ ও আরও অনেক ব্যক্তিত্ব কিভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে কতটা ভূমিকা রেখেছিলেন তা বর্তমান ছাত্র সমাজ জানে না।

আমাদের ছাত্ররা আরও জানে না ৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে কে দেশের পক্ষে কাজ করেছেন, আর কে বিপক্ষে কাজ করেছেন। আর সেজন্য এ প্রজন্মের ছাত্র সমাজ জানেনা কে দেশের শত্রু, কে দেশ প্রেমিক, কাকে কতটা সম্মান দেয়া উচিত। সুতরাং ছাত্র রাজনীতির বর্তমান অসনি সংকেত কোন অস্বাভাবিক ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমাদের দেশের তথাকথিত রাজনীতি বিদদের বিবেকহীন অনৈতিক কার্যকলাপের ধারাবাহিক ফল হিসাবেই বর্তমান ছাত্র রাজনীতির এই সংকটাপন্ন অবস্থা।

তবে আশার কথা হল এই বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। যদিও তারা সংখ্যায় কম। তথাপি তাদের আদর্শে উদ্বূদ্ধ হয়ে তরুণ মেধাবী ছাত্র সমাজ প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের রক্তচক্ষু, ইতিহাস বিকৃতকারীদের হুঙ্কার, জঙ্গীবাদের উত্থান ইত্যাদি উপেক্ষা করে অনৈতিক কার্যকলাপ ত্যাগ করে প্রগতিশীল হয়ে দেশের জন্য কাজ করবে।

 

 

 

 

 

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: