banglanewspaper

রব নেওয়াজ খোকন: ঐতিহ্যের বিশাল জায়গা জুড়ে প্রভুত্ব করে জাতির সাহিত্য-সংস্কৃতি। সাহিত্য-সংস্কৃতিকে জাতির স্নায়ুকোষ বললেও বেশি বলা হয় না। বাঙালি জাতির ভাগ্য সে হিসেবে বেশ চওড়া। কেননা, এ জাতির গর্বের সন্তান নোবেলবিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাঙালি-দর্শনের স্বকীয়ধারা; মরমীবাদের প্রসারক ফকির লালন শাহ্, বিদ্রোহবাদী সাহিত্যের প্রবক্তা কাজী নজরুল ইসলাম, প্রকৃতি-প্রেমের নিখুঁত রূপকার জীবনানন্দ দাশ সহ অসংখ্য সাহিত্য কিংবা সংস্কৃতি-পুরুষ। তাছাড়া, চওড়া ভাগ্যের কপালে লালটিপ পরিয়ে বিশ্ব দরবারে বাঙালি জাতির মুখাবয়বকে যিনি লক্ষণীয় সৌন্দর্যরূপ দান করে গেলেন তিনিও বাংলামায়ের  গর্ভজাত; আমাদের হুমায়ূন স্যার। যাঁর জাদুর কলমের খোঁচায় সোনা, মুক্তো, হিরে, মানিক ঝরেছে। যাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আকাশ সংস্কৃতিতে বিষ্ময় এবং অবিস্মরণীয়, তিনি আমাদের বাঙালি জাতির অহংকার, বাংলাদেশের অহংকার।

হুমায়ূন স্যারের জন্ম ও বংশ পরিচয়টা বহুল আলোচিত সত্ত্বেও পুনঃস্মরণ আবশ্যক। ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে মাতুলালয়ে তাঁর জন্ম। শেখ আবুল হোসেনের কন্যা আয়শার প্রথম সন্তান হিসেবে তাঁর পৃথিবীতে পদার্পণ। পিতৃ-বংশের দিক থেকে তাঁর পরিচয় আরো মর্যাদাপূর্ণ। কুতুবপুর গ্রামে জন্মনেয়া বুযূর্গ ব্যক্তিত্ব জাহাঙ্গীর মুন্সির  পরহেজগার পুত্র মাওলানা আজিম উদ্দীন। তাঁরই পুত্র জনাব ফয়জুর রহমানের প্রথম সন্তান ছিলেন আমাদের হুমায়ূন স্যার। প্রকৃতপক্ষে, তিনি ছিলেন সূফীবংশোদ্ভূত। জেনেটিক সূত্রেই সম্ভবত আলোকিত মানুষ হয়ে পৃথিবীর পথে পা রেখেছিলেন। যে আলোর জলে তিনি সারাটি জীবন সাঁতার কেটেছেন। অবগাহন করেছেন। আমরা হুমায়ূন-ভক্তরা সেই আলোর সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে উপভোগ করি অপার সৌন্দর্য। 

হুমায়ূন স্যার ছিলেন খাঁটি দেশপ্রেমিক। তিনি দেশকে ভালোবাসার প্রকৃষ্ট উদাহরণ রেখেছেন তার প্রতিটি সৃষ্টিকর্মে। দেশীয় সংস্কৃতির সত্যিকারের ধারক হিসেবে তিনি তুলে এনেছেন আনাচে-কানাচে পড়েথাকা কাঁদা-জল মাখা শিল্পোপকরণ। ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ অংশের মাধুরি মিশিয়ে নির্মাণ করেছেন কালজয়ী শিল্পসৌধ। যে কুদ্দুস বয়াতির তিনবেলা ঠিকমতো খাবার জুটতো না, এক/দেড় কেজি চালের বিনিময়ে যে মানুষটি পাড়ায়- পাড়ায় পালা গেয়ে বেড়াতেন, হুমায়ূন স্যারের স্পর্শে তিনিই কিনা বনে গেলেন পপুলার স্টার। আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা লুফে নিলেন। যিনি বাথরুমের কমোটের সাথেও অপরিচিত ছিলেন, তাকে কমোট চেনালেন। যিনি 'সিগারেট'র উচ্চারণ করতেন 'সিকারেট' কিংবা 'চুরট' তাঁকে সঠিক উচ্চারণ শেখালেন। নিরক্ষর এই মানুষটিকে স্বাক্ষরও শেখালেন তিনি। এসব তথ্য একদিন কুদ্দুস বয়াতির মুখ থেকেই কৃতজ্ঞতার স্বীকারোক্তি হিসেবে বেরিয়ে আসে।

অনুরূপ উদাহরণ ইসলাম উদ্দীন বয়াতি। যাঁর সম্পর্কে বিশদভাবে তুলে ধরেছি আমার "কুতুব পুরের ভাইসাব" বইটিতে। বাঁশি ওয়ালা থেকে দেশবরেণ্য কন্ঠ শিল্পী হিসেবে  আত্মপ্রকাশ করেন বারী সিদ্দিকী। সেটিও হুমায়ূন স্যারের জাদুর স্পর্শে সম্ভব হয়েছে। তাঁর ভালোবাসার হাতধরে আরো বহু অখ্যাত, অবহেলিত মেঠো কিংবা চারণ-প্রতিভা মর্যাদার আসন পেয়েছে। স্বীকৃতি পেয়েছে আউল-বাউল, জারি-সারি, লোকগাঁথা প্রভৃতি সংগীত, সাহিত্য কিংবা লোকজ ঐতিহ্য। উকিল মুন্সী, হাসন রাজা, রাধা রমন, শাহ্ আব্দুল করিম, জালাল উদ্দীন খাঁ, রশিদ উদ্দীন প্রমুখ হেলিত মরমীসংগীতের রচয়িতা গণের পূর্ণ স্বীকৃতি মেলে তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।

লক্ষণীয় ব্যপার হল, এসব লোকজ সম্পদ এবং ব্যক্তিত্বের উৎস হিসেবে তিনি কেন্দুয়া তথা নেত্রকোনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাতে স্পষ্টতা পেয়েছে ভৌগলিক বা দেশপ্রেম। কেন্দুয়াকে হৃদয়ের বিশেষ আসনে বসিয়ে তিনি সবসময় মূল্যায়ন করেছেন। চলচ্চিত্র বা নাটক নির্মাণেরর জন্য কেন্দুয়ার বিভিন্ন লোকেশন বেছে নিয়েছেন সুটিংস্পট হিসেবে। বারবার ছুটে এসেছেন গ্রামের নির্মল হাওয়া উপভোগের জন্যে। পাড়া-গাঁয়ের হত- দরিদ্র মানুুষগুলোর সাথে মিশে একাকার হয়েছেন। নিজগ্রাম কুতুবপুরে গড়ে তুলেছেন 'শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ' নামে স্বপ্নের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নিজ এলাকার প্রতি তাঁর এই হৃদয়ের টান উপলব্ধি করে কেন্দুয়াবাসিও তাঁকে হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছে।

হুমায়ূন-সাহিত্যের পরিধি ব্যাপক। বিশেষ করে গল্প-উপন্যাসই তাঁর সাহিত্য-কর্মের মূলজায়গা। যদিও তিনি নাটক, চলচ্চিত্র, গীতিকাব্য, চিত্রশিল্প, ম্যাজিক প্রভৃতি বিষয়ের উপরেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন। নিজেকে লেখক হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন হুমায়ূন স্যার। তাঁর রচিত গ্রন্থসংখ্যা প্রায় ৩২২ টি। প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস 'নন্দিত নরকে'। ১৯৭৩ সালে সেটি মুদ্রিত হয়। যদিও 'শঙ্খনীল কারাগার' প্রথম রচিত উপন্যাস। তাঁর রচিত প্রায় সবগুলো উপন্যাসই জনপ্রিয়তার সিংহাসন দখল করে বাংলা-সাহিত্যাকাশে বিষ্ময়ের রংধনু এঁকেছে।

কয়েকটি তুমুল জনপ্রিয়  উপন্যাস--'হিজিবিজি','কাঠপেন্সিল', 'বলপয়েন্ট', 'দরজার ওপাশে', 'হিমু',' হলুদ হিমু ', 'আঙ্গুল কাটা জগলু', 'ময়ূরাক্ষী', 'পারাপার', 'আমার ছেলেবেলা ', 'আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই', 'নিউইয়র্কের আকাশে ঝকঝকে রোদ', 'হোটেল গ্রোভার ইন', 'রঙপয়েন্ট', 'ফাউন্টেন পেন', 'এবং হিমু', 'হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম', 'হিমুর দ্বিতীয় প্রহর,' 'হিমু মামা,' 'আজ হিমুর বিয়ে', 'হিমু রিমান্ডে', 'হিমুর একান্ত সাক্ষাৎকার,' 'হিমুর মধ্যদুপুর,' 'হিমুর বাবার কথামালা,' 'হিমুর নীল জ্যোৎস্না,' 'হিমুর আছে জল', 'হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরী', 'ময়ূরাক্ষীর তীরে' প্রভৃতি। উপন্যাস বা নাটকে সৃষ্ট বিখ্যাত চরিত্র গুলোর মধ্যে অন্যতম,'হিমু', 'রূপা', 'মিসির আলী', 'বাকের ভাই', 'টুনি' প্রভৃতি। পৃথিবীর একমাত্র লেখক তিনিই যাঁর সৃষ্ট চরিত্র অনুকরণ করে অগণিত বাস্তব চরিত্র তৈরি হয়। উদাহরণ, ৬৪ জেলা ও বিশ্বের ১০টি দেশের হিমু সংগঠন। সেসব বাস্তবিক হিমু-রূপাদের "হিমু পরিবহণ " খ্যাত সংগঠনটি দিনদিন প্রসারতা লাভ করছে। তাদের সেবামূলক কর্মকাণ্ড আজ সর্বমহলে প্রশংসিত। 

বিরল বিশেষত্বের অধিকারী এই মেধাবী লেখককে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। অত্যন্ত স্বল্পভাষী, গুরুগম্ভীর অথচ হাস্যরসিক ছিলেন তিনি। সত্যবাদী, নিরহংকার, সদালাপী, ন্যায় পরায়ণ, বিচক্ষণ প্রভৃতি মানবিক গুণের অধিকারী এই মহামানব সারাক্ষণ সৃষ্টিশীল ভাবনায় ডুবে থাকতেন।

বাংলাসাহিত্যের নোলকসদৃশ এই মহামানবকে মহিমান্বিত করে রাখার গুরুদায়িত্ব রয়েছে বাংলাদেশের সরকার, সাধারণ মানুষ তথা সাহিত্যবোদ্ধাগণের ওপর। ইতোমধ্যে তাঁকে নিয়ে নিজএলাকার বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা শোনা যাচ্ছে। যেমন কুদ্দুস বয়াতির "হুমায়ূন আহমেদ জাদুঘর " গড়ার স্বপ্নের কথা আমরা জেনেছি। হুমায়ূন স্যারকে ঐতিহ্যের মহীরুহ ভেবে কেন্দুয়াবাসীকে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে। স্বতঃমূল্যের মূল্যায়ন জাতিকে বড় করে, মর্যাদার আসনে অভিষিক্ত করে। "হুমায়ূন আহমেদ" নামটির সৌজন্যে আমরা ঐতিহ্যের বিশাল স্তম্ভ তৈরি করতে পারি। তবে অবশ্যই কাজের মধ্যদিয়ে। স্বেচ্চাসেবী সাহিত্যসংগঠনগুলোকে এ ব্যাপারে অগ্রণী-ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

হুমায়ূন স্যারকে নিয়ে লিখতে গিয়ে যে জায়গাটায় এসে থমকে যেতে হয় সেটি হলো, তাঁর অকাল প্রয়াণ। বাংলাসাহিত্যর জন্য তাঁর আরো সুদীর্ঘ আয়ুষ্কাল প্রয়োজন ছিলো। 'মৃত্যু' শব্দটি তাঁর জন্য অনুমোদন করতে গিয়ে হোচট খেতে হয় আমাদের। ১৯ জুলাই, ২০১৩ তারিখটি বাংলা সাহিত্যজগতে এক বিশাল শোকাবহ দিন। কেননা, এইদিনে নন্দিত এই কথাশিল্পীর প্রয়াণের মধ্যদিয়ে সমাপ্তি ঘটে বাংলাসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের।

ট্যাগ: