banglanewspaper

এমএ আহমদ আজাদ, নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ): দরজাটা খুলে দিলেন তরুণী। কাঁধে টিয়া পাখি, নাম পকি। তার সাথে একটি ৯/১০ বছরের শিশু, সম্পর্কে ভাতিজা। তার কোলেও আবার একটা বিড়াল নাম ‘মিনি’। পরিচয় ও বাড়িতে আসার কারণ বলতেই ঘরের ভেতরে বসার আমন্ত্রণ জানালেন।
বাসার বারান্দার নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হতেই পাখ-পাখালির কিচির-মিচির কলবর কানে আসে। ঢুকতেই চোখে পড়ে লুটিনো লাভ বার্ডের খাঁচা। পাখিগুলো খাঁচার এমাথা থেকে ওমাথা ছুটাছুটি করছে। সমস্বরে চেচাঁচ্ছে। পাশের খাঁচায় অস্ট্রেলিয়ান পাঁচ জোড়া সিলভার জাভাও নজরে পড়লো। নয়ন জুড়ানো নীল আর হলুদ বরণের বাজরিগার একটু দেমাগি আচরণের! এই সুন্দরী পাখিগুলো খেলছে আপন ভঙ্গিতে। জেব্রা ফিঞ্চ খাঁচায় লাফালাফি আর কিচিরমিচির করছে সমান তালে। বাজরিগার, লাভ বার্ড, ফিঞ্চ, জাভার মতো ঈধমব ইরৎফ বা খাঁচার পাখির সবগুলোই আছে। এছাড়াও আছে লাক্ষা, সিরাজী, কিং, পমেরিয়ানের মতো বিভিন্ন জাতের কবুতর। 

ঘরে ঢুকে তরুণী পরিচয় দিলেন। নাম মাহিদা খানম। তার বিয়ে হয়েছে খোকন আহমেদ লালনের সাথে বছর তিনেক আগে। বলতে বলতে ভেতর থেকে হাজির হলেন লালন। কথার রেশ ধরেই হাস্যরস করে বললেন তাদের বিয়ে হয়েছে প্রেম করে। 

হবিগঞ্জ জেলা থেকে প্রায় ৬৫ কিঃমিঃ দূরে নবীগঞ্জ উপজেলার ইনাতগঞ্জ মধ্যবাজারে ভাড়া বাসায় থাকছেন প্রায় সাত বছর। তবে আদি নিবাস একই উপজেলার দীঘলবাক ইউনিয়নের জিয়াপুর গ্রামে। লালন পেশায় একজন ড্রাইভার। স্থানীয় একটি ডিসট্রিবিউটর ফার্মের কাভার্ড ভ্যান চালান। পড়াশুনা করেছেন স্থানীয় কামারগাঁও বারী-পারুল বাহার উচ্চ বিদ্যালয়ে (আধুনালুপ্ত) ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত। পড়াশুনা এগিয়ে নিতে পারেননি পিতার অকাল মৃত্যুর কারণে। 

আহত একটা শালিককে সেবা-শুশ্রুসা করতে গিয়ে লালনের পাখি পালনের বাতিক মাথায় চাপে। তারপর থেকে বাবা-মা, বড় ভাইসহ অনেকের বকাঝকাতেও পিছুপা হননি। পরবর্তীতে ককাটেল পোষার মধ্যে দিয়ে পাখি পালন শুরু করেন। পরে লুটিনো লাভ বার্ড, জাভা, বাজরিগার, বিদেশী ডাভ, ফিঞ্চের মতো বাহারী সৌখিন পাখিকে ভালো লেগে যায় তার।

ড্রাইভারের চাকুরী করে পাখি পোষা কষ্টকর কিনা-জানতে চাইলে তা অকপটে স্বীকার করলেন। বিদ্রোহী কবির ভাষায় ‘বিশ্বের যা কিছু কল্যাণকর/ তার অর্ধেক করিয়াছে নারী, অর্ধেক নর’ বলে তিনি একচোট হাসলেন।

আবার বলা শুরু করলেন, একা আমার পক্ষে পাখি পোষা একটু কষ্টকর। পাখি পালনের সবচেয়ে বড় সাপোর্ট পায় আমি আমার স্ত্রী মাহিদার কাছ থেকে। পাখিগুলোকে খাবার-দাবার দেয়া, গোসল করানো, খাঁচা পরিস্কার করা, অসুখ-বিসুখ হলে ওষুধ দেয়া, ডিম পাড়লে তদারকি করাসহ নানান কাজে এক্সপার্ট হয়ে উঠেছে সে (মাহিদা)। কোনো কোনো দিন এমন হয়েছে সংসারের কাজকর্ম সেরে পাখির যন্ত্রপাতি করতে করতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে, কিন্তু তার নাওয়া-খাওয়া আর হয়নি। তবে আমার দু’টো ভাতিজা, আমার মাসহ বাসার সকলেই পাখি ভালোবাসে।

মাহিদার পাখি প্রেম সম্পর্কে তিনি জানালেন, মাঝে মাঝে তো মনে হয় এই পাখিগুলোকে আমার চেয়ে বেশী ভালোবাসে সে। কথারটির প্রমান মিললো ঢের। পকি’কে (দেশীয় একটি টিয়া) দু’জন একসাথে ডাকতেই সাড়া দিয়ে মাহিদার কাঁধে উড়ে দিয়ে বসে পাখিটি। এবার পকি উড়ে গেল লালনের কাঁধে। সে পকির দিকে মুখ এগিয়ে দিতেই ঠোটে ঠোট লাগিয়ে ‘কিস’ করলো। ঠিক যেন প্রেমিক-প্রেমিকা উষ্ণ চুম্বন! আমি বাইরে থেকে বাসায় আসলে পকিকে ডাক দিলেই দু’ডাকা মেলে এগিয়ে আসে। দৃশ্যটা অনেকটা সিনেমা নায়ক-নায়িকার মিলনের ন্যায়। পকি, সানী, জুলির মতো তাদের আদরের পাখিগুলির রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নাম। পাখি আগে থেকে ভালোবাসতেন, নাকি বিয়ের পর থেকে ভালোবাসছেন-কথাটা জিজ্ঞেস করতেই মাহিদা খানম একটু হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন ‘পড়েছি মোগলের হাতে খেতে হবে একসাথে’। আমি তাকে (লালন) ভালোবাসি, ও পাখি ভালোবাসে। অতএব, আমি পাখি ভালোবাসি। এই হলো যুক্তিবিদ্যার যুক্তি!

লালন দম্পতির সানী ও জুলি নামে এক জোড়া ককাটিয়াল ছিল। দুঘর্টনাবশত জুলি মারা যায়। সেদিন লালন অত্যন্ত দুঃখ পেয়েছিলেন। প্রচুর কান্নাকাটিও করেছিলেন। তার দুঃখজনক স্মৃতি সম্পর্কে আবেগঘনভাবে আরো জানালেন, পাখিগুলোকে সকালে খাওয়াইয়ে কর্মস্থলে চলে যায়। তখনও সব পাখিই ছিলো সুস্থ ও স্বাভাবিক। বিকালে এসে দেখি বমি করছে। চিকিৎসা নিতে নিতেই মারা যায় আমার অত্যন্ত আদরের পাখিটি।  তাদের নিজের শয়ন কক্ষটি যেন ছোট খাটো চিড়িয়াখানা। একই কক্ষে ঘুমানো, আবার সেই কক্ষেই পাখি পালন করেন তারা। এতে অসুবিধা হয় না জানতে চাইলে লালন বলেন, প্রথমত একই কক্ষের জন্য আমার আর মাহিদার কোন অসুবিধা বোধ হয়না। পাখির শরীরের ও বিষ্টার গন্ধ আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। আর দ্বিতীয়ত পাখিদের কথা বলতে হয় সাধারণত রাত ১০টা পর্যন্ত ঘরের লাইট তো জ্বলে। তবে সারারাত মোটা ও পুরু কাপড় দিয়ে ঘেরা থাকে খাঁচাগুলো। উল্লেখ্য, তিন কক্ষের ভাড়া বাসাটির অন্য দুটিতে ভাই-ভাবি আর মা-ছোট বোন থাকেন।

সৌখিন ও বাহারী পাখির দর-দামঃ বাজরিগার জোড়া ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। লুটিনো ককাটেল জোড়া পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। লাভ বার্ড জোড়া চার টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। ফিঞ্চ জোড়া পাঁচশ’ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত। অস্ট্রেলিয়ান জাভা চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। অস্ট্রেলিয়ান ডোভ জোড়া দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত।

খাবার-দাবারঃ এরা সাধারনত কাউন, চিনা, বারজা,  তিসি, সূর্যমুখী ফুলের বিচি, কুসুম ফুলের বিচি, সরিষা, ধান,  বিভিন্ন ধরনের ফল, কচি ঘাসের পাতা ও সবজি ও বিভিন্ন ফল খেতে পছন্দ করে। একটি পাখি দিনে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ গ্রাম খাবার গ্রহন করে। এরা প্রতিদিন প্রচুর পানি পান করে থাকে। তাই সারাক্ষণ পানি সরবরহের ব্যবস্থা করতে হবে। 

যন্ত্রপাতিঃ সাধারণত মধ্য অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়ার উপযোগী। বাড়ীতে আলাদা সৌন্দর্য আনতে সৌখিন মানুষরা খাঁচার পাখি পোষেন। এই জাতের পাখি পোষার জন্য খুব বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না। শুধু দরকার সঠিক পরিচর্যা। মাত্র ১০ ফুট দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার একটি ঘরে প্রায় ১০০ জোড়া খাঁচার পাখি পোষা যায়। খাঁচার বাইরে পৃথক গোসল করার গামলার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এরা গোসল করতে পছন্দ করে।
খাঁচার পাখির মধ্যে অনেকগুলো একটু অলস প্রকৃতির ও শান্তি প্রিয়। তাই এদের খুব নিরিবিলি পরিবেশে রাখতে হয়। বন্যপাখি পালন করা বা ধরা আইনত অপরাধ। খাঁচায় পালন করা পাখি জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি খাঁচাতেই বসবাস করে। এসব পাখি বাইরে ছেড়ে দিলে আশ্রয়স্থল খুঁজে তো পাবেই না, উল্টো তারা কাকের পেটে যাবে। 

বর্তমানে আমাদের দেশে সৌখিন ও বাণিজ্যিকভাবে পালিত হচ্ছে। পালনের জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। শখের জন্য পালতে চাইলে ঢাকার কাঁটাবন, মিরপুর, গুলিস্থানসহ বিভিন্ন জেলা শহরের পাখির দোকানে গেলেই হবে।

দরকার পড়বে ছোট একটি খাঁচা। দাম পড়বে পাঁচশ থেকে আটশ টাকা। খাবারের পাত্র ও পানির পাত্র ৩০ টাকা ও ডিম পাড়ার হাড়ি ৪০ টাকা। লাভবার্ড, ককাটেল, লংটেল, ফিঞ্চ, ডোব, অস্ট্রেলিয়ান বার্ড, বিদেশী জাতের ঘুঘু ইত্যাদি ঘরে খাঁচা করে আর ঘরের বাইরে হাড়ি পদ্ধতিতে তিনি এসব পাখি পালন করছেন। খাঁচার মধ্যে ডিম পাড়তে কিংবা বাচ্চা উৎপাদনে তেমন স্বাচ্ছন্দ বোধ করে না এই পাখিরা। 

ডিম পাড়ার পাত্র হিসেবে বাঁশের ঝুড়িও ব্যবহার করা যায়। ঝুড়িটি খাঁচার এক কোণে ঝুলিয়ে রাখলেই চলবে। এর মধ্যে শুকনো দূর্বাঘাস ও নারকেলের ছোবড়া দিয়ে রাখলে ওরা সুন্দর করে হাড়ির মধ্যে বাসা বাঁধবে। এছাড়া পাটের বস্তা বৃত্তাকারে কেটে ঝুড়িতে বসিয়ে দেওয়া যায়।

প্রাথমিক অবস্থায় বাণিজ্যিকভাবে পালন করতে তেমন খরচ হবে না। প্রতিজোড়া পাখির জন্য একটি করে ছোট আকারের খাঁচা ব্যবহার করাই ভালো। বড় খাঁচায় একসঙ্গে কয়েক জোড়া পালন করা যায়। তবে এতে ঝুঁকি আছে। কারণ এরা প্রচুর পরিমাণে মারামারি করে। ফলে পাখি ও ডিমের ক্ষতি হয়।

ঋতুভিত্তিক পাখির যত্ন সম্পর্কে লালন বলেন শীতের দিনে মোটা মোটা কম্বল দিয়ে খাঁচা মুড়ে দেই। রুমে আড়াইশ’ ওয়াটের বাল্ব জ্বালানো থাকে। পাখিদের ভালো কোম্পানীর রিফাইন্ড মধু খাওয়াই। এতে শরীর গরম থাকে। পাখির অসুখ-বিসুখ তো থাকবেই। যে পাখির ভাষা বুঝে না, তার পাখি পালন করা ঠিক নয়।

ইতোপূর্বে দেশে ব্যাপক হারে বার্ড ফ্লু প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় একটু আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলাম। ইন্টারনেটে জানার চেষ্টা করলাম। টিভির নিউজগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখতাম। আরো সৌখিন পাখি প্রেমী-ব্যবসায়ীদের সাথে ফোনালাপ করতাম। তবে মনে একটা সাহস ছিলো যে, আমি আমাদের আর পাখিগুলোর জন্য প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিয়েছিলাম।

ট্যাগ: