banglanewspaper

সাইফুল ইসলাম রিমেল: ​​​তখন আমার বয়স কত? কোন ক্লাসে পড়ি?
আজ আর মনে নাই! মনে থাকাটা জরুরীও না।

যা মনে থাকার, তা ঠিক ঠিক মনে আছে। হিরন্ময় সেই শৈশব আমার। হিরন্ময় সেই স্মৃতি।

গ্রামে থাকি তখন আমরা। গ্রাম বলতে অজপারাগা। বিদ্যুতের ছোঁয়া লাগে নি। মূল ঘর মাটির। সাথে টিনের বেড়া দিয়ে বানানো বারান্দা। বারান্দাখানায় আমার বসতি।

কখনো মূল ঘরে বাবা অথবা মা কড়া মুড নিয়ে বসেন আমাকে নিয়ে। পড়ান, অংক করান, লেখান আর আফসুস করেন। তাঁদের ছেলেটার মেধা আছে, অল্প একটু পড়লেই হয় কিন্তু পড়ে না। টুটু করে ঘুরে বেড়ায়। খেলে, ব্রহ্মুপুত্র নদীতে সাঁতরায়, আর সারা দিন ঘুড়ি উড়ায়।

**
গ্রামে আস্তে ধীরে সন্ধ্যা হয়, রাত্রি নামে। আমার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। নিউরনে " আলিফ লায়লা...আ...আ...আ" অনুরণন তুলে। দস্যু কেহেরমান, 'কিমা মাস্তাকে হুলহুল' জান্তব রুপ নিয়ে চোখের উপর নাচানাচি করে। প্রতি শুক্রবার এলে বিকেল থেকেই টানটান উত্তেজনা নিয়ে সময় যায়।

আমাদের বাড়িতে টিভি নাই। থাকার প্রশ্নও উঠে না। পুরো গ্রামে তখন তিনটা কি চারটা টিভি।

সমস্যা নাম্বার এক।

টিভি দেখতে রাতের বেলা আধা কিলো দূরের এক বাড়িতে যাব এটা বাবা মাকে বলা যাবে না। পড়াশোনা বাদ দিয়ে আলিফ লায়লা দেখার কথা ভাবাটাই একটা গুরুতর গর্হিত কাজ।

সমস্যা নাম্বার দুই।

যদি অবাধ্য হয়ে কোনক্রমে চলেই যাই, তবে রাতে খাওয়া এবং ঘরে ঢোকা যাবে না। রাতে খেতে চাইলে ও ঘরে ঘুমাতে চাইলে আগে মাইর খাইতে হবে!কাচা বাশের কঞ্চির স্বাদ খুব মধুময় নয়!

সমস্যা নাম্বার তিন।

সেদিনও শুক্রবার। আসলে আলিফ লায়লা বার। পরীক্ষা সমাগত। গোধূলি লগ্ন থেকেই ভাবনা পেয়ে বসেছে। সামনে পরীক্ষা, পড়া বাদ দিয়ে আলিফ লায়লা দেখতে গেলে নিশ্চিত কেয়ামত হয়ে যাবে। বিকেলে সিদ্ধান্ত,আজকে আর দেখতে যাব না। একদিন না দেখলে কি হয়?

**
বিকেলের পর সন্ধ্যা হতে না হতেই চিন্তার স্রোত উল্টে গেল। একরাত না পড়লে কি হয়? ২ টা ৫ টা নাম্বার কম পেলেই বা কি হয়? কিন্তু মালিকা হামিরা যে তরবারি তুলল আর সিন্দবাদ আল্লাহু আকবর বলে ডাক দিল... এর পর হল কি? অসম্ভব! এই পর্ব না দেখে থাকা অসম্ভব!

দেয়ালে একটা ঘড়ি টাঙানো ছিল। টিক টিক টিক টানা বিরক্তিকর শব্দে সে প্রবহমান সময়ের হিসেব দিত আমাদের। বাবা আমাকে নিয়ে বসেছেন অংক করাতে। কিন্ত টিক টিক শব্দে সময় যত এগিয়ে আসে বুকের ভিতর উত্তেজনা বাড়ে। আমি বইয়ের অংক বাদ দিয়ে মিনিটের অংক করি মনে মনে। খাতায় কি লিখছি নিজেরি খেয়াল নাই। ধমক ও খেলাম দুই বার।

"আব্বা আমি একটু বাইরে যাইতাম...!!" ( হিসু করতে যাওয়াকে তখন গ্রামে আমরা বাইরে যাওয়া বলতাম!)। আব্বা বললেন "যা"! আমি কোনমতে ঘরের চৌকাঠ ডিঙ্গালাম। আমাকে আর পায় কে? অগ্র-পশ্চাদ, বিপদ, ভয়, কঞ্চির পিটুনি, উপোষ এসব ভাবার ফুরসৎ পরেও পাওয়া যাবে। কিন্তু সিন্দবাদ? সিন্দবাদের কি হল??

**
দুই পাশে গর্ভবতী ধানের খেত। থোড় এসেছে সব ধান মায়ের পেটে। মাঝদিয়ে কাঁচা মাটির আল। কাঁদা পানি মাড়িয়ে দৌড়! দৌড়!

উঠোন ভর্তি আগ্রহী, উৎসুক মানুষ। নানান বয়সের। সাদাকালো ১৪ ইঞ্চি টিভিখানি যতন করে বেশ উঁচু স্ট্যান্ড এর উপরে বসানো হয়েছে। সবার কাছ থেকে এক টাকা করে নেয়া হল। ব্যাটারি চার্জ দেয়া বাবদ খরচ। ৩ কিলো দূর থেকে সাইকেলের ক্যারিয়ারে করে চার্জ করে আনতে হয়। শুক্রবার বিকেলে সেই চার্জ দেয়ার দোকানে গেলে দেখা যায় সার বেঁধে ২০/৩০ টা ব্যাটারি শক্তি সঞ্চয় করছে রাতে আলিফ লায়লার আমোদ বিলাবে বলে!

যতদূর মনে পড়ে মেরিল পেট্রোলিয়াম জেলির সৌজন্যে আলিফ লায়লা প্রচারিত হত। তাই শুরুর আগে সর্বশেষ বিজ্ঞাপন হত মেরিলের। তাঁর আগে ছিল " আপন আমার আপন জুয়েলার্স" এর বিজ্ঞাপন। একগাদা গয়না পড়ে মৌ (জাহিদ হাসানের বউ) নাচতেন সেই টিভি কমার্শিয়ালে।

মেরিলের এড শেষ হতেই পিন পতন নিস্তব্দতা। সেই ছেলেমানুষি আয়োজন কি দুরন্ত ভাললাগা নিয়েই না দেখতাম আমরা। জায়নামাজ দিয়ে আকাশপথে উড়ে যাওয়া, বিশাল বিরাট দৈত্য, সুলেমানি তরবারি, তাঁর ঐশ্বরিক ক্ষমতা সব বাস্তব মনে হত। আজকে যা অতিরঞ্জিত অবাস্তব মনে হয় তাই ছিল তখন বাস্তব। আজকের বাস্তবতাও ২০ বছর পড়ে এরুপ হয়ে যেতে পারে বটে!

**
আলিফ লায়লা শেষ, ঘোরের জগতও শেষ। এখন কঞ্চির বেত্রাঘাত সামনে মুর্তিমান। কিন্তু উদ্ধারকারী জাহাজ ছিল আমার। এরুপ শত বিপদে, ঝড় ঝঞ্ঝায় বাতিঘর হয়ে তিনি বাঁচাতেন আমায়।

আমার দাদিমা। আমি ডাকতাম "বু"! বুবু নয়, শুধু বু! আমাদের ঘর, তারপর দুই চাচার ঘর, তারপরেই নিরাপদ আশ্রয়। প্রায়শ এমন হত বু আমার ঘুমিয়ে যেতেন। দরজায় টুকটুক শব্দ শুনেই বুঝতেন। ঘুম চোখে দরজা খুলে কুপি জালাতেন।

একদিন দুদিন নয়, দিনের পর দিন , মাসের পর মাস এরকম অত্যাচার সয়েছেন। মাঝে সাঝে আব্বা আম্মা আসতেন। বলতেন" মা, এমুন করলে এঁরে মানুষ করবাম ক্যামনে?" বু দিতেন এক ধমক। বাবা মা চুপ করে একটু গাঁই গুই করে ভাগতেন!

হইচই থামলে জিজ্ঞাসা " খাইছিস রে ছাগল রাইতে?"। 'না' আমার নিশ্চিত, নির্ভার জবাব। দেখা গেল ভাত তরকারি যা তাঁর ছেলেদের ঘর থেকে দিয়েছে অথবা তিনি নিজেই রেঁধেছেন তাঁর অংশ রয়ে গেছে। বু গরম করছেন আর গল্প করছেন। কখনো দেখা গেল কিছুই নাই খাওয়ার মতন । সেই রাতে দাদী বসে রাঁধছেন আর নাতী পাশে বসে গুটুর গুটুর গল্প করছে!! অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ বয়সী বটবৃক্ষের জীবনের গল্প তখন রহস্যোপন্যাসে রুপ নিত। আর আমি কচি পাতা পল্লবে বাড়ন্ত বটছানা হয়ে কান পেটে শুনতাম!

**
এ ক্ষুদ্র আখ্যান যখন এই রোমাঞ্চকর, মিষ্টি আবহে আবর্তিত ঠিক তখনি মনে হয় গল্পের রাশ টেনে ধরা ভাল। তবে পাঠক সমীপে আমার বক্তব্য হল এই যে ,যাহারা এইরুপ গ্রাম্য, গতিহীন, প্রাগৈতিহাসিক, অনাড়ম্বর, অনুল্লেখ্য কিন্তু একই সাথে শান্ত, স্নেহময়, ছায়া সুনিবিড়, প্রাণপ্রাচুর্যময় ডানপিঠে ফটিকরুপী শৈশব পান নাই তাহারা এই কথকতার কতখানি অনুভব করিতে পারিবেন সে ব্যাপারে আমি সন্দিহান!

আমি ভাগ্যবান, আমার দুর্বিনীত এরুপ কিছু জীবন ছিল, এরুপ বর্নিল কিছু সময় ছিল আর ছিল সেই সময়ের প্রহরী প্রাচীন এক বটবৃক্ষ! যদিও তাঁরা আমাকে এই জটিল কুটিল পৃথিবীতে ছেড়ে গেছেন, তবুও তাঁদের জগতে তাঁরা ভাল থাকুক এই কামনাই করি!

( লেখাঃ রাত ২.৪০, ১২.১১.১৬ লংসাইট, ম্যানচেস্টার,ইংল্যান্ড)


সাইফুল ইসলাম রিমেল, 
সিনিয়র সহকারী সচিব।

(২৮তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার)

ট্যাগ: