banglanewspaper

ভুটান মানেই বৌদ্ধ মনাস্ট্রি ও গুম্ফা৷ সারা দেশজুড়েই রয়েছে অনেক বৌদ্ধ গুম্ফা ও জং৷ তাছাড়াও রয়েছে নয়নাভিরাম নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য৷ সারা দেশটি পাহাড়ে ঘেরা৷ পাহাড়ি চু নদী যেন কটিবন্ধের মতো বেষ্টন করে রেখেছে এই সুন্দরী দেশকে৷ ভ্রমণের ফাঁকে ফাঁকে কখনও দূরে বা কখনও কাছে এসে ধরা দেবে চু নদী৷

কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসে হাসিমারা নেমে অটো বা গাড়িতে জয়গাঁও থেকে লাগোয়া ভুটানের প্রবেশদ্বার দিয়ে ফুন্টসেলিং থেকে গাড়িতে বা বাসে করে চলুন থিম্পু৷ থিম্পু ভুটানের রাজধানী৷ ফুন্টসেলিংয়ে প্রবেশের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে দেখে নিন বৌদ্ধ গুম্ফা৷ অপূর্ব সুন্দর, শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশের সাক্ষী হতে পারেন এ স্থানে এসে৷ ফুন্টসেলিং থেকে থিম্পুর দূরত্ব প্রায় ২৭২ কিলোমিটার, ছ’ঘণ্টার যাত্রাপথ৷

পাহাড়ের কোলে সাজানো এই সুন্দর শহর থিম্পুতে দেখে নিন নরজিন ল্যম, টিভি টাওয়ার ভিউ পয়েন্ট, চিড়িয়াখানা, থিম্পু গুম্ফা, হস্তশিল্পকেন্দ্র এবং সিমতোখা জং৷ এই জংয়ে সূর্যাস্তের আগে পৌঁছতে পারলে শোনা যাবে সমবেত লামা ও দ্রাপাদের মন্ত্রোচ্চারণ ও গ্রন্থপাঠ এবং বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের গম্ভীর শব্দ৷ নির্জন এই পর্বতের উপর এই ঘটনার স্মৃতি মনের মণিকোঠায় অক্ষয় হয়ে থাকবে৷ জংয়ের বাইরে বেরিয়েই বৌদ্ধ লামারা পরিবেশন করেন গরম চা ও বিস্কুট৷

নির্জন পাহাড়ে, ঠান্ডায় সেই চায়েও যেন পাওয়া যায় অমৃতের স্বাদ৷ এছাড়াও শহরের মধ্যেই রয়েছে মেমোরিয়াল চোর্তেন, এটি রাজা জিগমে দোরজি ওয়াংচুর স্মৃতিমন্দির৷ নদীর ধারে রয়েছে দেশের প্রধান জং তাশি চো জং তার বিপরীতেই রয়েছে সার্ক বিল্ডিং৷ তারপর চলুন নবনির্মিত বৌদ্ধমন্দির৷ এখানে রয়েছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বুদ্ধমূর্তি, থিম্পু ভ্রমণপথে প্রত্যক্ষ করা যায় এই মূর্তিটি৷

থিম্পু থেকে চলুন পুনাখা৷ প্রায় ৮৬ কিমি এই পথ যেতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা৷ এই যাত্রাপথে রয়েছে দোচুলা পাস৷ এই পাসের উপর রয়েছে শতাধিক চোর্তেন ও বৌদ্ধমন্দির৷ এই পাসের সর্বোচ্চ স্থানটি থেকে বিভিন্ন হিমশৃঙ্গ দৃশ্যমান৷ ঝলমলে রোদ থাকলে পরিষ্কার দেখা যায় শৃঙ্গগুলি৷ এই পাসের বৌদ্ধমন্দিরটির বাইরে দাঁড়িয়ে পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা ভাগ্যের ব্যাপার৷

সড়ক পথে ভুটান যেতে হলে আপনাকে প্রথমেই যা করতে হবে তা হলো ভারতের ট্রানজিট ভিসা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে ভিসার মেয়াদ কিন্তু দেয় ১৪ দিন। অর্থাৎ আপনি যেদিন যাবেন তার কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ দিন আগে আপনাকে ভারতীয় ভিসা সেন্টার গুলশানে আবেদন করতে হবে। প্রথমেই জানিয়ে রাখি ভিসা জমা দিতে কি কি লাগবে।

১. অনলাইনে ফরম পূরণ করে তার প্রিন্ট কপি। ভিসা ফর্ম পূরণের সময় ভিসা টাইপ ট্রানজিট ও পোর্ট দিবেন বাই রোড চ্যাংরাবান্ধা /জঁয়গাও
২. সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডযুক্ত দুই ইঞ্চি  বাই দুই ইঞ্চি  ছবি, ফরমের সাথে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিতে হবে।
৩. ন্যাশনাল আইডি বা জন্মসনদ এর ফটোকপি
৪. বর্তমান ঠিকানার সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিল শেষ ৬ মাসের
৬. চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে এনওসি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) ,ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স এবং ছাত্রছাত্রীদের আইডি কার্ডের ফটোকপি।
৫. ডলার এন্ড্রোসমেন্ট (২০০ ডলার) এর কপি অথবা ব্যাংক স্টেটমেন্ট (১৫ হাজার টাকা থাকতে হবে) এর কপি।
৬.  বর্তমানে ভুটানে হোটেল রিজার্ভেশনের কাগজও দেখতে চায় ভারতীয় এম্বেসি ,তাই ভুটানে যে  হোটেল বুকিং দিয়েছেন এর কাগজও জমা দিতে হবে।
৭. পাসপোর্ট ও পাসপোর্টের ফটোকপি (পাসপোর্টের মেয়াদ সর্বনিম্ন ছয়মাস থাকতে হবে) আগে ইন্ডিয়ান ভিসা থাকলে তারও ফটোকপি লাগবে। পুরাতন পাসপোর্ট থাকলে সেটা জমা দিতে হবে।
৮. বাসে আসা যাওয়ার কনফার্ম  টিকেট সেক্ষেত্রে শ্যামলী বা এসআর পরিবহন বা অন্য যেকোন পরিবহনের বুড়িমারি বর্ডার -শিলিগুড়ি পর্যন্ত আসা যাওয়ার টিকেট। যেহেতু কনফার্ম টিকেট কাটবেন বাসের সেহেতু ভ্রমণ তারিখ ও  এম্বেসিতে ভিসার আবেদন জমা দেওয়ার তারিখের সাথে  দশ বারোদিন গ্যাপ রাখবেন কারণ জমা দেবার  আট থেক দশদিন পর ভিসা দেওয়া হয় তাই বাসের টিকেটের তারিখ এর পরে হতে হবে। বুঝা গেছেতো ? বাসের টিকেটের ফটোকপিও জমা দিতে হবে অরজিনাল কপির সাথে।

কীভাবে যাবেন:

ট্রানজিট ভিসা নিয়ে সোজা চলে যান বুড়িমারি বর্ডারে। ঢাকা থেকে এস আর, মানিক আর নাবিলসহ কয়েকটি বাস ছাড়া হয়। ভাড়া ৮৫০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা। রাত ৮ টার মধ্যে এসব বাস ঢাকা থেকে ছেড়ে যায়। পরদিন সকালে অর্থাৎ ভোরে পৌঁছে যাবেন বুড়িমারি। মনে রাখবেন বাংলাদেশের এপাশের নাম বুড়িমারি আর ভারতের ওপাশের নাম চ্যাংড়াবান্ধা। আর বর্ডার খোলা হয় এখানে সকাল ৯ টায়। এসময়টুকু বসেই থাকতে হবে।

বাংলাদেশের ইমিগ্রেশনের কাজ সেরে চ্যাংড়াবান্ধা যেতে হবে। সেখানেও রয়েছে বেশকিছু ফর্মালিটি। ট্রাভেল ট্যাক্স ৫০০ টাকা ছাড়াও আরোও ১০০ টাকা আপনাকে এখানে দিতে হবে। যদিও আমি জানি না এই টাকাটা কি জন্য প্রয়োজন। না দিলে এক ধরনের ঝামেলায় পড়তে হয়। এসব দেখার এখানে কেউই নেই। এবার দেশের বর্ডার পার হয়ে ওপারে যাবেন। সেখানেও দিতে হবে ১০০ টাকা জনপ্রতি। বাংলা ভাষায় ঘুষ। যেখানে দেশে এসব দেখার কেউ নেই অতএব ঐ ভীনদেশেও কাউকে আশা করে লাভ নেই। এবার কাজ শেষ করে যাত্রার পালা।

এখানে অর্থাৎ চ্যাংড়াবান্ধায় আপনাকে ভারতীয় দালালরা জোর করবে টাকা অথবা ডলার ভাঙ্গানোর জন্য। ওদেরকে বুঝতে দিবেন না আপনার কাছে কত টাকা আছে। অল্প কিছু ভাঙ্গিয়ে কোন মতে এখান থেকে কেটে যাবার চিন্তা করবেন। চ্যাংড়াবান্ধা থেকে আপনাকে যেতে হবে জয়গাঁও বর্ডার। ট্যাক্সিতে চলে যেতে পারেন। সময় লাগবে সাড়ে তিন ঘণ্টার মতো। ট্যাক্সিতে ৪০০ রুপি মতো খরচ পড়বে জনপ্রতি। ৪ জন রিসার্ভ যেতে চাইলে সেটা হয়ে যাবে দেড় থেকে দুই হাজার রুপির মতো।
চাইলে বাসেও যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে খরচ কমে আসবে অনেকটাই।

* চ্যাংড়াবান্ধা জিরো পয়েন্ট থেকে বাসস্ট্যান্ড ভ্যানে যেতে লাগবে  ১০ রুপি সময় লাগবে  ১০ মিনিট।

* বাসস্ট্যান্ড থেকে ময়নাগুড়ি বাস  ১৫-২০ রুপি, সময় লাগবে ৩০মিনিট।

* ময়নাগুড়ি থেকে সোজা জয়গাঁও  বাসে ভাড়া নেব ৫০-৬৫ রুপি, সময় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা

* জয়গাঁও থেকে ভারতীয় ইমিগ্রেশন পয়েন্ট টেম্পোতে লাগবে ১০ রুপি সময় লাগবে ১৫ মিনিট।

ইমিগ্রেশনের কাজ সেরে আপনাকে হেঁটেই ঢুকতে হবে ভুটান।

এটা ভুটানের প্রবেশ পথ। ফুন্টসোলিং।


জয়গাঁও এর ওপারেই ফুন্টসোলিং। এখানেই আপনাকে অন অ্যারাইভাল ভিসা দেবে ভুটান।

এবার নিশ্চিন্তে ভুটান ঘোরার পালা। চাইলে সেদিন ফুন্টসোলিং থেকে যেতে পারেন। মোটামুটি কম খরচেই মিলবে ভালো হোটেল। এক রুম ১ থেকে দেড় হাজার টাকায় থাকতে পারবেন দুইজন। সময় বেশি না থাকলে সেদিন ফুন্টসোলিং না থেকে চলে যান পারো অথবা থিম্পুতে।
ঐখানেই বাসস্ট্যান্ড। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শেষ বাস। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে পারো কিংবা থিম্পু যেতে পারেন, ভাড়া নিবে ২৫০ রুপী, সময় লাগবে ৬ ঘন্টা। তবে হাতে সময় থাকলে একদিন থেকে ছোট্ট শহর ফুন্টসোলিং ঘুরে দেখতে ভুলবেন না। সুন্দর সাজানো গোছানো শহরের পাশ দিয়ে রয়েছে চলেছে নদী।

কম খরচে পারো অথবা থিম্পু যেতে চাইলে বাসই ভরসা। সেক্ষেত্রে আগের দিন টিকিট করে রাখুন। ট্যাক্সি নিয়েও চলে যেতে পারেন। পারোতে থাকার খুব ভালো ব্যবস্থা রয়েছে। পারোতে গেলে টাইগার্স নেস্ট ও পারো জং দেখতে ভুলবেন না। পারো এয়ারপোর্টও মুগ্ধ করবে আপনাকে। পারো খুবই শান্ত ও আরামদায়ক একটি শহর।

পারো থেকে থিম্পু যেতে দুই ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। বুদ্ধ পয়েন্ট, থিম্পু মনেস্ট্রি, রাজার বাড়িসহ বেশকিছু দৃষ্টিনন্দন জায়গা রয়েছে এখানে। থিম্পু ঘুরে দেখতে একদিনই যথেষ্ট।


 

ডিসেম্বরের দিকে ভুটান ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে চেলালা পাস ও দোচালা পাস ঘুরে আসতে ভুলবেন না। ভাগ্য সহায় থাকলে এখানে পেয়ে যাবেন বরফ। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত বরফ পড়ে এখানে।   

ফেরার সময় মনে রাখবেন বুড়িমারি থেকে মূলত বাস ছাড়ে সন্ধ্যা ৬টায়। তাই ফুন্টসোলিং থেকে অবশ্যই ১২ টার মধ্যে বের হবার চেষ্টা করবেন। বের হবার সময় ঠিক আগের মতই সব ইমিগ্রেশন পয়েন্ট থেকে আপনার পাসপোর্টে এক্সিট সিল মারতে মারতে আসবেন একদম বুড়িমারি পর্যন্ত।

ভারতীয় ইমিগ্রেশন পয়েন্ট থেকে জয়গাঁও বাসস্ট্যান্ড টেম্পোতে    যেতে ১০ রুপি আর সময় লাগবে ১৫ মিনিট।

* জয়গাঁও থেকে ময়নাগুড়ি বাসট্যান্ড বা ৫০-৬৫ রুপি  সময় লাগবে ৩ থেকে ৪ ঘন্টা

* ময়নাগুড়ি থেকে চ্যাংড়াবান্ধা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত বাসভাড়া পড়বে ১৫-২০ রুপি সময় লাগবে  ৩০ মিনিট

*চ্যাংড়াবান্ধা বাসস্ট্যান্ড থেকে চ্যাংড়াবান্ধা জিরো পয়েন্ট ভ্যানে ১০ রুপি এবং সময় লাগবে ১০ মিনিট


যে বিষয় গুলো জেনে রাখবেন:

১. ভুটানের সড়কপথের সৌন্দর্য অসাধারণ। তাই ফুন্টসোলিং থেকে পারো অথবা থিম্পু যেতে চাইলে দিনের আলো থাকতে থাকতেই চলে যান।

২. চ্যাংড়াবান্ধা বর্ডারে টাকা থেকে রুপি করে নিতে পারবেন। সঙ্গে ১ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি ও পাসপোর্টের ফটোকপি রাখবেন।

৩. ট্রানজিট ভিসার ক্ষেত্রে আসা যাওয়ার সময় ভারতে প্রতিবার সর্বোচ্চ ৭২ ঘন্টা পর্যন্ত অবস্থান করতে পারবেন। আর এ সুযোগে আপনি চাইলেই জলপাইগুড়ি কিংবা দার্জিলিং হয়ে একদিন কিংবা ২দিন ঘুরে আসতে পারবেন।


৪. হোটেলের জন্য প্রতিদিন বাজেট ১ থেকে দেড় হাজার রুপী।

৫. খাওয়া প্রতি বেলা ১০০ থেকে ২০০ রুপী। যদিও খাওয়া নিয়ে অনেকেরই একটু কষ্ট হতে পারে। ভাত, সবজি, মুরগী আর লাল রুটি ছাড়া সবই ভুটানি খাবার।

৬. ভুটানের টাকার না নুলট্রাম, তবে সেখানে সব যায়গাতেই ভারতীয় রুপি চলে। তবে আসার আগে কোন নুলট্রাম থাকলে চেষ্টা করবেন অবশ্যই তা সেখানেই শেষ করে আসতে। কারণ এই নুলট্রাম আবার ভারতের বর্ডার এলাকা ছাড়া কোথাও চলে না।

৭. ভুটানে কোথাও সিগারেট খেতে পারবেন না। সেইসাথে যত্রতত্র থু থু ফেলা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন। রাস্তা পার হতে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করুন। সূত্রঃ ইন্টারনেট।

ট্যাগ: Banglanewspaper ভুটান ঘুরে আসুন ভ্রমণ