banglanewspaper

হত্যার উদ্দেশ্যে তার ওপর কম করে হলেও ছয়শ\'রও বেশিবার হামলা হয়েছে। বিশ্বের আর কোনো নেতার ওপর এত বেশিবার হামলার নজির রয়েছে কিনা তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা হতে পারে। ইতিহাসবিদদেরও ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে, এ রেকর্ড আর কারও নেই। এই নেতার ওপর এসব হামলা চালিয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) সুপ্রশিক্ষিত সদস্যরা। বরাবরই তিনি মার্কিন ওই গোয়েন্দা সংস্থার হিটলিস্টে। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে সিআইএ সর্বাধুনিক রাইফেল থেকে শুরু করে বিষের বড়ি দিয়ে, বিষাক্ত কলম ছুড়ে, এমনকি ভয়ঙ্কর ব্যাকটেরিয়া পাউডার দিয়ে তাকে অসংখ্যবার হত্যার চেষ্টা করে।

এমনকি শত্রুশিবির সিআইএর সঙ্গে নিজের এক বোনও হাত মিলিয়েছিল গোপনে। কিন্তু নিজের দৃঢ় মনোবল ও সতর্ক দেশ পরিচালনার কারণে শত্রুশিবিরের এসব অপচেষ্টা নস্যাৎ হয়ে গেছে বারবার। এখনো বিশ্বে তিনি তাই পুঁঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এক সোচ্চার উচ্চারণ। অনেকের কাছে তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এক প্রতীকের নাম। গত এবং বতর্মান শতাব্দীর পরিবর্তনের ধ্বজাধারী সর্বশেষ বিপ্লবী। হ্যাঁ, কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল আলেহান্দ্রো কাস্ত্রো ক্রুজের (৮৮) কথাই বলছি। যাকে আমরা বেশি করে চিনি ফিদেল কাস্ত্রো নামে। তার স্বপ্নের দেশটি পশ্চিমা চোখ রাঙানির মধ্যেই তরতর করে উঠে গেছে উন্নতির শিখরে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ঘোষণা দিয়েছেন, কিউবার সঙ্গে ৫০ বছর ধরে বন্ধ করে রাখা কূটনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ ঘোষণার পর টাইমমেশিনে চড়ে ইতিহাসের স্বর্ণালি অতীতে এখন বিচরণ করছে দুদেশের নাগরিকরা। বিশ্ববাসীর মানসপটেও নতুন করে ভেসে উঠছে আজন্ম এক বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রোর মুখখানি। ওবামার এ ঘোষণাকে নিঃসন্দেহে আমেরিকার কূটনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন বলে গণ্য করা হচ্ছে। এবং একই সঙ্গে এটি ফিদেলের জয় বলেও অনেকে মনে করছেন।

কাস্ত্রোর মার্কিন আশ্রিত বোন হুয়ানিতা তার লেখা একটি বইয়ে স্বীকার করে নিয়েছেন, তিনি তার ভাই ফিদেলকে উৎখাতে সিআইএর সঙ্গে কাজ করেছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি গোপনে দেশ ছাড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। শত্রুশিবির সেই যুক্তরাষ্ট্রেরই বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দায়িত্ব নেওয়ার পর তার পররাষ্ট্রনীতিতে বহুবিধ পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়েছেন। চিরশত্রু কিউবার সঙ্গে অতীত তিক্ততার সম্পর্ক ভুলে নতুন করে সম্পর্ক গড়ার কথা বলছেন তিনি।

জীবনে বহুবার ফিদেল গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন। সংগ্রামের প্রতীক এই বিপ্লবী সম্প্রতি আবারও আলোচনায় আসেন প্রেসিডেন্ট ওবামার নেওয়া নীতির ব্যাপারে খোলামেলা কিছু মন্তব্য করে। পরিবর্তন প্রত্যাশী ওবামার দর্শন তাকে নাড়া দিয়েছে। ওবামার শপথ অনুষ্ঠানটিও তাই তিনি টেলিভিশনে সরাসরি দেখতে ভোলেননি। শপথের দিন ফিদেল তার ভাষণের প্রশংসা করে ইন্টারনেটে লিখিত বিবৃতিও দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই বিশ্লেষকরা বলতে শুরু করেন, গত ৫০ বছরের বরফ এবার বুঝি গলতে শুরু করল। ক্ষমতার শেষভাগে এসে ওবামা আবার তার ঘোষণা বাস্তবায়নের কথা ফের স্মরণ করিয়ে দিলেন মার্কিনিদের।

১৯৫০-এর দশক। ফিদেল তখন টগবগে যুবক। নিজে আইনজীবী ছিলেন বলেই কিনা সমাজের বৈষম্যটা তার চোখে পড়েছিল বেশি। ১৯৫৯ সালে তৎকালীন মার্কিন সমর্থিত একনায়ক ফুলজেনসিও বাতিস্তা সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় আসেন তিনি। অবশ্য ১৯৫৩ সালেই ফিদেলের বিপ্লবের প্রথম উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। বাতিস্তার অন্যতম সামরিক ঘাঁটি মোনাকাদা ব্যারাকে ওই বছর ২৬ জুলাইয়ের ব্যর্থ হামলাটির পরিকল্পক ছিলেন তিনি। তবে অভিযানে ব্যর্থতার মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল সাফল্যের বীজ। কিউবাবাসী তখন অবাক-বিস্ময়ে লক্ষ্য করল, গুটিকয়েক গেরিলা সেনার ছদ্মবেশে কিভাবে সামান্য ক্ষুদ্রকায় রাইফেল নিয়ে বৃহৎ একটি সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণ করল। তারা বুঝতে পারল, খুব শীঘ্রই দেশে পরিবর্তন আসছে। ওই সময় গ্রেফতার এবং পরে নির্বাসনে যেতে হয় ফিদেলকে। এক পর্যায়ে ১৯৫৬ সালে কাস্ত্রো মেক্সিকাের নির্বাসন থেকে সহযোদ্ধাদের নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। তার সঙ্গে যোগ দেন আরেক কিংবদন্তি গেরিলা এরনেস্তো চে গুয়েভারা। ১৯৫৯ সালে মাত্র নয় হাজার গেরিলা নিয়ে তারা হাভানা আক্রমণ করেন। ক্ষমতাচ্যুত হন বাতিস্তা। পরে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তিনি। এরপর ফিদেলের দেশ গড়ার পালা।

দেশ পরিচালনার দীর্ঘ সময়ে বহির্বিশ্বের, বিশেষ করে মার্কিনি আগ্রাসন থেকে কিউবাকে রক্ষায় এক অসম লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন ফিদেল। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছোটভাই রাউল কাস্ত্রোর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত তিনি দেশকে আগলে রাখেন শিশুসন্তানের মতো।

ফিদেল তার রাষ্ট্র পরিচালনায় অনেক সময় অনেক কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এসব সিদ্ধান্তের সমালোচনা হয়েছে। তবে একটা কথা ফিদেল বারবার বলেছেন, \'আমাকে ঘৃণা কর, কোনো সমস্যা নেই; তবে দেশের কল্যাণে যেসব সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস সেই নিরিখে ইতিহাস আমাকে মার্জনা করবে।\' কাস্ত্রোর রাজনৈতিক দর্শন এমনই। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপখাইয়ে নিতে তিনি তার কমিউনিস্ট শাসনের নানা নীতির পরিবর্তন করেছেন। মিত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে কিউবা। তখন তিনি ভেনেজুয়েলার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে সেই পরিস্থিতি সামাল দেন। এখনো কিউবার বড় অর্থনৈতিক সহযোগী ভেনেজুয়েলা। ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নিজের ট্রেডমার্ক জলপাই রঙের সেনা পোশাকের বদলে স্যুট-টাই পরে হাজির হয়েছিলেন তিনি। অনেকে মনে করেন, বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য শুরুর ইঙ্গিত দিতেই ফিদেল ওই কাজ করেন। বর্তমান সময়ে গোটা বিশ্ব যখন অর্থনৈতিক মন্দায় ধুঁকছে, কিউবা কিন্তু নিজেকে সেই বিপদ থেকে ঠিকই রক্ষা করেছে। লন্ডনভিত্তিক নিউ-ইকোনমিক ফাউন্ডেশনের মতে, কিভাবে বিরূপ পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হয় কিউবা তারই শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

ফিদেলের শাসনকালে কিউবার স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। লাতিন আমেরিকার মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার কিউবাতেই সবচেয়ে কম। পোলিও নির্মূল করা হয়েছে সেই ১৯৬২ সালেই। এরপর ডিপথেরিয়া, হাম, মাম্পস রোগ নির্মূল করা হয়েছে। নিজের দেশের স্বাস্থ্যসেবা ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৩৪ হাজারেরও বেশি কিউবান বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কাজ করছে। জনসংখ্যার অনুপাতে দেশটিতে পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসকও রয়েছে। শিশু মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণেও ঈর্ষণীয় সাফল্য লাভ করেছে কিউবা। বর্তমানে সেখানে শিশু মৃত্যুহার প্রতি হাজারে পাঁচ দশমিক আট যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও অনেক কম। সর্বোপরি কিউবার স্বাস্থ্যসেবার মান সুইডেন ও সিঙ্গাপুরের সমপর্যায়ের। কিউবার এসব সাফল্য অর্জিত হয়েছে মার্কিন তথা বহির্বিশ্বের বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই।

কাগজে-কলমে কিউবার ক্ষমতায় নেই ফিদেল। তবে দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ফিদেলের পরামর্শ নিয়ে কাজ করেন ভাই রাউল। রাউল সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, ওবামার সঙ্গে তিনি যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। ফিদেলও রাউলের এমন উদ্যোগে সম্মতি দিয়েছেন। ফিদেলের বর্তমান স্লোগান- \'একটি সুন্দর পৃথিবী গড়া খুবই সম্ভব\'। ওবামাও পরমাণু অস্ত্র ও হানাহানিমুক্ত এমন একটি পৃথিবীর কথাই বলছেন। ফিদেল যদি ততদিন বেঁচে থাকেন, নিশ্চয়ই তিনি সেই পৃথিবী দেখে যেতে পারবেন- যার জন্য একবার তিনি বিপ্লবের দীর্ঘ পথে হেঁটেছিলেন।

ট্যাগ: