banglanewspaper

যে জেলে নৌকা যেত মাছ ধরতে, তার ফিরে আসা ছিল দৈবের ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের বার্তা না জানতে পেরে শত শত জেলে হারিয়ে যেতেন চিরতরে।
কক্সবাজারের ননিয়াছটা এলাকার জেলে আমানউল্লাহ ২১ বছর ধরে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরেন। আজ থেকে বছর পাঁচেক আগেও কেবল প্রকৃতির ওপর ভরসা করেই চলত তাঁর সমুদ্রযাত্রা। একাধিকবার পড়েছেন ঝড়ের কবলে। বেঁচেছেন ভাগ্যের জোরে। তবে পরিস্থিতি এখন পাল্টে গেছে।  জেলেরা বলছিলেন, ‘এখন আগাম সংবাদ না নিয়ে সাগরে যাই না। মোবাইলে সংবাদ পাই। ঝড়ের সংবাদ থাকলে বেশ আগেই মালিক টিভি দেখে বা রেডিও শুনে জানায়।’
২০১০ সালেও কক্সবাজারে গভীর সমুদ্রে ২১টি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে। নিরুদ্দেশ হন ৪০০ জেলে। জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান গতকাল বুধবার জানান, চার বছর ধরে এমন ঘটনা বছরে তিন-চারটির বেশি হচ্ছে না। এ বছর ট্রলারডুবি ঘটেছে তিনটি। এখন প্রতিটি জেলে নৌকা ঝড়ের বেশ আগে থেকে সংকেত পায়।
গত মাসে (ডিসেম্বরে) একটি মুঠোফোন কোম্পানি এবং একটি বেসরকারি সংস্থা কক্সবাজারে ৩০০ বড় ট্রলারকে ১০০ কিলোমিটার দূর থেকে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় এমন ক্ষমতাসম্পন্ন মুঠোফোন দেয়। কিছুদিনের মধ্যে ৩ হাজার ট্রলারকে এই ফোনসেট দেওয়া হবে। কক্সবাজারের মোট ৭ হাজার মাছ ধরার ট্রলারের মধ্যে বড় ট্রলারের সংখ্যা ৩ হাজারের কিছু বেশি।
মুজিবুর রহমানের আশা, এসব ফোন পেলে এখন জেলেদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বাড়বে। দুর্যোগে ঝুঁকি কমবে।
দুর্যোগের আগাম সংকেত দেওয়া, যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্বেচ্ছাশ্রমের কারণে দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের মিলেছে বিশ্ব স্বীকৃতি। সরকারি-বেসরকারি নানা তৎপরতায়, মানুষের উদ্ভাবনী প্রচেষ্টার ফলে দুর্যোগপীড়িত বাংলাদেশে দুর্যোগে ক্ষতি অনেক কমে এসেছে।
জাতিসংঘের দুর্যোগ-ঝুঁকি প্রশমন কার্যালয়ের (ইউএনআইএসডিআর) হিসাবে, বাংলাদেশে নানা দুর্যোগে যে মৃত্যু হয় এর মধ্যে ঝড়েই মারা যায় ৮৭ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ। বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের (ডিডিএম) হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ১৮২ মানুষ। সে সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ২২৫ কিলোমিটার। ২০০৭ সালে ২৫০ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা ঝড় সিডরে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৩৬৩ জন। ডিডিএমের সূত্রের দাবি, ১৯৯১-এর ঘূর্ণিঝড়ের পরই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে ব্যাপক মাত্রায় ঢেলে সাজানো হয়। ১৯৯০-এর দশকে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ছিল দেড় হাজার। এই সংখ্যা ২০০৫ এসে দাঁড়ায় ২৫৮৩টিতে। এখন সংখ্যা ৭ হাজার ৭৭১।
এক দশকের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি কমে যাওয়ার কয়েকটি কারণ তুলে ধরেন ডিডিএমের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াজেদ। তিনি বলেন, আগে ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত দেওয়ার পর করণীয় কী, তা বলা হতো না। ১৯৯৭ সালের পর করণীয় বলে দেওয়া শুরু হলো। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সব মন্ত্রণালয়কে নিয়োজিত করাও একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থার নাম ঘূর্ণিঝড় নিরাপত্তা প্রকল্প (সিপিপি)। সরকার ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই প্রকল্পে স্বেচ্ছাসেবীরা ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস উপকূলীয় মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। নব্বইয়ের দশকে সিপিপির স্বেচ্ছাসেবীর সংখ্যা ছিল অনিবন্ধিত ৩০ হাজার। এখন নিবন্ধিত ৪৯ হাজার ৩৬৫ জন।
ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরামের সদস্য সচিব গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, কেবল একটি দুর্যোগ (ঘূর্ণিঝড়) মোকাবিলার জন্য এত সংখ্যক মানুষকে সংগঠিত করার ঘটনা বিশ্বে বিরল।
বাংলাদেশের উন্নত দুর্যোগ প্রস্তুতির একটি উদাহরণ ২০১৩ সালে দুর্বল হয়ে যাওয়া ঝড় মহাসেন। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার তিন দিন আগে ১১ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়।
মহাসেনের আগে ২০১২ চালু হয় মুঠোফোনে ঝড়ের আগাম খুদে বার্তা দেওয়া। ডিডিএম সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের জেলে সংগঠনগুলোর একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করা হয়। ঝড়ের আগে প্রায় সব মাছ ধরার নৌকাকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছিল।
ঝড়ের পাশাপাশি বাংলাদেশে বন্যার ক্ষতিও কমে গেছে। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৭০ লাখ ৬১ হাজার ৬৭৮ একর জমির ফসল। ২০০০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ৪১ লাখ ৭৭ হাজার ১৭২ একর জমির ফসল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর, ভূঞাপুর, কালিহাতী, সদর ও নাগরপুর উপজেলায় অন্তত ১৫টি ইউনিয়ন যমুনা ও ধলেশ্বরী নদীর চরাঞ্চলে অবস্থিত। এসব অঞ্চলের মানুষদের প্রতিবছর বন্যা মোকাবিলা করতে হয়। নিজেদের অভিজ্ঞতা আর সরকারি এবং বেসরকারি নানা উৎস থেকে পাওয়া তথ্যে নানা ব্যবস্থা তাঁরা নিচ্ছেন। এতে করে দুর্যোগে অনেক কষ্ট থেকে রেহাই পাচ্ছেন।
কালিহাতী উপজেলার গোহালিয়াবাড়ী ইউনিয়নের আলিপুর গ্রামের খুদে ব্যবসায়ী আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘মানুষ এহন ঘর দেওয়ার সময় ’৮৮ সালের বন্যার লেবেল ধইরা ভিটি বান্দে। টিউবয়েলও উঁচা কইরা বসায়। যাতে বানের পানি আইলেও ঘরে না ঢুকে। খাওয়ার পানিরও অসুবিধা না হয়।’
বন্যায় ক্ষতি কমে যাওয়ার একটি কারণ হিসেবে আগাম বার্তা পাওয়াকে একটি কারণ বলে মনে করেন দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা। আবদুল ওয়াজেদ জানান, ১৯৮৮ সালের আগে মাত্র ২৪ ঘণ্টা অগে বন্যা সতর্কীকরণ বার্তা দেওয়া হতো। এখন সেটি দাঁড়িয়েছে সাত দিন আগে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কাছ থেকে এই তথ্য ডিডিএম ছড়িয়ে দেয় দেশব্যাপী।
রাষ্ট্রীয় ট্রাস্ট সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) এখন প্রতিবছর নদী ভাঙনের আগাম বার্তা দেয়। সিইজিআইএসের সহকারী নির্বাহী পরিচালক মমিনুল হক সরকার জানান, এই আগাম বার্তার ফলে সম্ভাব্য ভাঙন এলাকার মানুষকে সরিয়ে আনা সহজ হয়েছে। সংস্থাটি কেবল বার্তা দিয়েই দায় সারেনি। পাইলট প্রকল্প হিসেবে ফরিদপুর ও সিরাজগঞ্জে একেবারে বাড়ি পর্যন্ত এ ভাঙন-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা করেছে।
অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব হোসেন মনে করেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কারণে প্রাণহানির ক্ষতির মতো সম্পদহানির পরিমাণও কমে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতিতে এর একটি বড় অবদান আছে। দুই দশক আগে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল ৬০ ভাগ, এখন ৩২ ভাগ। আর এই সক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার ফলে ত্রাণমুখীনতা কমে গেছে। দুর্যোগ মোকাবিলার এক দারুণ শক্তি সঞ্চয় করেছে এ দেশের মানুষ।’
সরকারি নানা প্রচেষ্টার বাইরে দেশের মানুষের উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা দুর্যোগ মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম। তিনি জানান, ইঞ্জিন দিয়ে নৌকা চালানো সাধারণ মানুষের উদ্ভাবন। ১৯৮৮ সালের বন্যাতেই নিরাপদে যেতে এই কাজ শুরু করে মানুষ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বন্যাসহিষ্ণু ধান কৃষকই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে। বন্যার শিকার বৃহত্তর বরিশালের মানুষ পানির ওপর ধাপ পদ্ধতিতে সবজি চাষের প্রচলন করেছে। এভাবেই নানা উদ্ভাবনের লড়াইয়ে দুর্যোগকে পরাজিত করে এগিয়ে যাচ্ছে এ দেশের মানুষ।
বিশ্বেরনেতৃত্বেবাংলাদেশ: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতিতে বিশ্ব স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০১১ সালের নভেম্বরে এক নিবন্ধে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেন, অনেক কষ্টের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বিশ্বের নেতৃত্বের আসনে চলে এসেছে।
গত বছরের মে মাসে বাংলাদেশে সফরে এসে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব হাওলিয়াং শু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি ‘রোল মডেল’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ট্যাগ: