banglanewspaper

একবার সালামা ইবনে হাতেম আনসারী নামক এক সাহাবী রাসূল (সা) এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল(সা), আমার জন্য দোয়া করুন, যেন আমি অনেক বড় ধনী হতে পারি।

রাসূল(সা) বললেন, আমি যে নীতি অনুসরণ করে চলেছি, তা কি তোমার পছন্দ নয়? আল্লাহর কসম, আমি ইচ্ছা করলে মদীনার পাহাড়গুলো সোনা হয়ে আমার সাথে সাথে ঘুরতো। কিন্তু এমন ধনী হওয়া আমার পছন্দ নয়। এ কথা শুনে লোকটি ফিরে গেল, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আাবার ফিরে এল।

এবার সে বললোঃ হে রাসূল(সা)! আমি ওয়াদা করছি যে, আমি যদি ধনী হয়ে যাই তাহলে প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য হক পৌঁছে দেব। এ কথা শুনে রাসূল(সা) তার বিপুল ধনসম্পদ হোক-এই মর্মে দোয়া করলেন। এর ফলে তার ছাগল ভেড়া প্রভৃতিতে অসাধারণ প্রবৃদ্ধি দেখা দিল। ফলে মদীনার যে জায়গায় সে বাস করতো তাতে আর তার স্থান সংকুলান হতো না।

সে মদীনার বাইরে চলে গেল। তবে যোহর ও আসরের নামায মদীনার মসজিদে নববীতে পড়তো। তার অন্যান্য নামায সে নিজের বাসস্থানেই পড়তো।

এরপর তার গৃহপালিত পশুর সংখ্যা আরো বেড়ে গেল। এর ফলে নতুন জায়গাটিও তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে দাঁড়ালো। তাই সে মদীনা হতে আরো দূরে গিয়ে থাকতে আরম্ভ করলো। সেখান থেকে সে শুধু জুমার নামায মদীনায় এসে পড়তে লাগলো। অন্যান্য নামায নিজের বাসস্থানেই পড়তো। ক্রমে তার সম্পদ আরো বেড়ে গেলে তাকে আরো দূরে চলে যেতে হলো। সেখান থেকে সে জুমার নামাযেও মসজিদে আসতে পারতো না।

কিছুদিন পর রাসূল (সা) সালাবা সম্পর্কে লোকদের কাছে খোঁজ খবর জানতে চাইলেন। তাঁকে জানানো হলো যে, সালাবার সম্পদ এত বেশি হয়েছে যে, শহরের কাছে কোথাও তার স্থান সংকুলান হয় নি। তাই এখন সে আর এদিকে আসে না। এ কথা শুনে রাসূল(সা) তিনবার বললেন, “ইয়া ওয়াইহা সালাবা!” অর্থাৎ সালাবার জন্য আফসোস।

ঠিক এই সময় যাকাতের আয়াত নাযিল হয়। তাতে রাসূল(সা)কে মুসলমানদের কাছ হতে যাকাত আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়। তিনি যাকাত আদায়ের জন্য মুসলমানদের কাছে লোক পাঠালেন। কয়েকজন লোককে সালাবার কাছে পাঠালেন। আর কয়েকজনকে বনু সুলাইমের আর এক ধনীর কাছেও পাঠালেন।

যখন আদায়কারীরা সালাবার কাছে যাকাত চাইল এবং রাসূল(সা) এর লিখিত ফরমান দেখালো; তখন সালাবা বলতে লাগলো, এতো জিযিয়া কর হয়ে গেল, যা অমুসলমানদের কাছ হতে আদায় করা হয়। তারপর বললো, এখন আপনারা যান। ফেরার পথে আসবেন। তখন তারা চলে গেলেন।

পক্ষান্তরে বনু সুলাইমের ধনী লোকটি রাসূল(সা) এর আদেশ শুনে  নিজের গৃহপালিত পশুর মধ্য থেকে বেছে বেছে উৎকৃষ্ট মানের পশু যাকাত হিসেবে দিলেন। আদায়কারীরা বললেন, আমাদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে, উৎকৃষ্টমানের পশু যেন না নিই। বনু সুলাইমের ধনী লোকটি বললো, আমি নিজের ইচ্ছায় দিচ্ছি। দয়া করে গ্রহণ করুন।

অতঃপর আদায়কারীগণ সালাবার কাছে গেলে সে বললো, “কই, দেখি যাকাতের আইন আমাকে দেখাও। তারপর তা দেখে আবার বলতে লাগলোঃ আমি তো মুসলমান। অমুসলমানদের মত জিযিয়া কেন দিতে যাবো? যা হোক, আপনারা এখন যান। আমি পরে ভেবে চিন্তে জানাবো।”

যখন আদায়কারীরা রাসূল(সা) এর কাছে ফিরে গেল তখন সকল বৃত্তা্ন্ত শুনে রাসূল(সা) আবার তিনবার বললেন, “সালাবার জন্য আক্ষেপ!” আর সুলাইমের জন্য দোয়া করতে লাগলেন। এরপর সালাবার প্রতি ইঙ্গিত করে সূরা তাওবার একটি আয়াত নাযিল হয়। তাতে এই ধরনের লোকদের নিন্দা করা হয়, যারা সম্পদশালী হলে হকদারদের হক দিবে বলে ওয়াদা করেছে, কিন্তু পরে সেই ওয়াদা ভুলে গিয়ে কৃপণতা করতে আরম্ভ করেছে। আয়াতে বলা হয় যে, এই ধরনের লোকদের মনে আল্লাহ মোনাফেকী গভীরভাবে বদ্ধমূল করে দিয়েছেন।

রাসূল(সা) যখন সালাবার জন্য তিনবার আক্ষেপ প্রকাশ করলেন এবং কুরআনের আয়াতও নাযিল হলো, তখন সেখানে সালাবার একজন আত্মীয় ছিলো। সে গিয়ে সালাবাকে সব জানালো এবং তাকে তার আচরণের জন্য তিরস্কার করলো। সালাবা ভীষণ ঘাবড়ে গেল এবং মদীনায় হাজির হয়ে বললো, “হে রাসূল! আমার যাকাত গ্রহণ করুন। রাসূল(সা) বললেন, আল্লাহ তোমার যাকাত গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। এ কথা শুনে সালাবা আফসোস করতে লাগলো।

রাসূল (সা) বললেন, “এটা তো তোমার নিজের কৃতকার্যের ফল। আমি তোমাকে হুকুম করেছিলাম। তুমি তা মাননি। এখন আর তোমার যাকাত কবুল হতে পারে না। তখন সালাবা অকৃতকার্য হয়ে ফিরে গেল। এর কিছুদিন পরেই রাসূল (সা) ইন্তিকাল করেন।

এরপর সালাবা যথাক্রমে হযরত আবু বকর ও ওমর(রা) কে যাকাত গ্রহণ করতে আবেদন জানায়। কিন্তু তারা রাসূল(সা) এর নীতি অনুসরণ করেন। হযরত ওসমানও তার যাকাত গ্রহণে অস্বীকার করেন। হযরত ওসমানের খেলাফতকালেই তার মৃত্যু হয়।(মাআ’রেফুল কুরআন এর সৌজন্যে)।

শিক্ষাঃ হালাল সম্পদে ধনী হওয়ার চেষ্টা করা ও আশা করা যদিও বৈধ, তবুও এত বেশি সম্পদের লোভ করা উচিত নয়, যা মানুষকে ইসলাম হতে দূরে সরিয়ে দেয়। আর প্রাপ্ত সম্পদের যাকাত ও সদকা দিতে বিন্দুমাত্র কুন্ঠাবোধ করা উচিত নয়।

ট্যাগ: Banglanewspaper অধিক সম্পদ মোহ কৃপণতার পরিণাম