banglanewspaper

হাফিজুর রহমান হৃদয়, নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: বাল্য বিয়ে ও গৃহকর্মীর করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পেয়ে মাইক্রোসফটের ব্রান্ড এ্যাম্বাসেডর হয়েছে নাগেশ্বরীর ফাতেমা। জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতেও থেমে যায়নি তার পথ চলা। কম বয়সেই অভাবের তারনায় স্কুল ছাড়তে হয় তাকে।

বাল্য বিয়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে আবার শুরু করে লেখা পড়া। আইটিতে দক্ষতা অর্জন করে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে ধীরে ধীরে। ফাতেমা কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার পূর্ব রামখানা গ্রামের আয়নাল হক এবং ফরিদা বেগমের মেয়ে।

ফাতেমা জানায়, ৯ বছর বয়সে বিদ্যালয় ত্যাগ করতে হয় তাকে। তখন ৪র্থ শ্রেনীর শিক্ষার্থী সে। অভাব অনটনের সংসারে মানুষের বাড়িতে ঝি এর কাজ করতো দিনমজুর বাবা, মা। ৪ বোনসহ ৬ সদস্যের পরিবারের মুখে ভাত তুলে দিতে বাবা-মাকে  রাতদিন কষ্টের প্রহর গুণতে হতো। এর মধ্যে বিয়ে হয়ে যায় বড় বোন আমেনার। তার বিয়ের খরচাপাতি যোগাতেও হিমশিম খেতে হয়। টানা পরেনের মধ্যে পরে যায় সংসার।

সে কারণেই সংসারে বাবা-মাকে সহযোগিতা করতে অন্যের বাড়িতে গৃহ কমীর কাজ করতে হয় কিশোরী ফাতেমাকেও। তখন তার বয়স ১১ বছর। সেখানে কাজ করে করে বাড়িতে টাকা দিতে হয় তাকেও। ২ বছর গৃহকর্মীর কাজ করে সে। এরই মধ্যে বাড়ি থেকে ডাক আসে একদিন। সে ভাবে হয়তো আবারও পড়া-লেখা শুরু করবে। কিন্তু বাড়িতে পা রাখতেই দেখতে পায় অন্য কিছু।

চল্লিশোর্ধ পাত্রের সাথে বিয়ের আয়োজন করেছে তার পরিবার। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতোই অবস্থা হয়। দু’চোখে সরষে ফুল দেখতে পায়। কচি মনের সোনালি স্বপ্ন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় ফাতেমার। এমন সময় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আশার আলো পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক বিশ্বজিত বর্মণসহ সংগঠনের কয়েকজন এসে বিয়েতে বাধা দেয় এবং ফাতেমার লেখা-পড়াসহ যাবতীয় খরচের দায়িত্ব নেয়। ভর্তি করে আশার আলো পাঠশালায়। সেখান থেকেই আবারও চলতে থাকে লেখা-পড়া। শুরু হয় নতুন করে পথ চলা।

এ প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রাথমিক, জেএসসি এবং এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে সফলতা অর্জন করে। বর্তমানে সে রায়গঞ্জ ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি ১ম বর্ষে পড়ছে এবং আশার আলোর ওয়ার্ল্ড উইনার আইটি স্কুল এ্যান্ড কলেজের কম্পিউটার প্রশিক্ষক। এখানে সে নিয়মিত শিক্ষার্থীর পাশাপাশি বাল্যবিয়ের সমস্যায় থাকা মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। তার প্রত্যাশা আইটি শিক্ষক হয়ে সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের সহোগিতা করা এবং বাল্য বিবাহ রোধে কাজ করে যাওয়া।

লেখাপড়ার পাশাপাশি আশার আলো পাঠশালার সহযোগিতায় মাইক্রোসফটের দেয়া ল্যাবে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ গ্রহগ করে এমএস ওয়ার্ড, এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্টসহ ব্যাসিক কম্পিউটারে দক্ষ হয়। ২০১৬ সালে মাইক্রোসফট এর নেপাল, ভূটান এবং বাংলাদেশের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সোনিয়া বশির কবির তার দক্ষতা দেখেন এবং জীবনের গল্প শোনেন।

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে মাইক্রোসফট এর তত্ত্বাবধানে ফাতেমাকে নিয়ে তৈরী করেন একটি ডুকুমেন্টারী। যেটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচার করেন তারা। এর পরই তারা তাকে তাদের ব্রান্ড এ্যাম্বাসেডর মনোনিত করেন।

ফাতেমার বাবা-আয়নাল হক ও মা ফরিদা বেগম বলেন, আমাদের গরিব সংসারে বেড়ে উঠা ফাতেমা নিজের ইচ্ছা শক্তি এবং আশার আলো পাঠশালার প্রতিষ্ঠা বিশ্বজিত বর্মনের সহযোগিতায় তার স্বপ্নে পৌছে গেছে। ফাতেমার কৃতিত্বে আমরা অনেক খুশি।

আশার আলো পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক বিশ্বজিত বর্মণ জানায়, চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের  প্রথম সপ্তাহে ফাতেমা মাইক্রোসফট এর ব্রান্ড এ্যম্বাসেডর হিসেবে দায়িত্ব পায়। আমি চাই সে অনেক বড় হোক।

ট্যাগ: banglanewspaper মাইক্রোসফট ব্রান্ড এ্যাম্বাসেডর নাগেশ্বরী ফাতেমা