banglanewspaper

দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম পুলিশ। জনগণের জানমালের নিরাপত্তাকারীদের নাম পুলিশ। এমনটাই জেনেছিলাম। কিন্তু এখন এই ধারণা একদমই পাল্টে গেছে। এখন পুলিশ শব্দটা শুনলেই ভুগী নিরাপত্তাহীনতায়। ভাবি এই বুঝি পকেটে কিছু একটা দিয়ে ফাঁসিয়ে ফায়দা লুটতে এসেছে। এই বুঝি অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে এসেছে। এই বুঝি লাঞ্ছিত হতে হবে জনসম্মুখে। কিন্তু কেন, পুলিশের প্রতি এমন ধারণা হওয়ার কারণ কি? 

দেশের সাধারণ মানুষের কথা নাইবা বললাম, কিন্তু যাদের বলা হয় জাতির বিবেক, যাদের বলা হয় কলম সৈনিক, যাদের বলা হয় সমাজ পরিবর্তনকারী। হ্যাঁ, আমি সাংবাদিকদের কথাই বলছি। আজ তাদেরও কেন যেখানে সেখানে পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত হবে। এখন প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে দেখতে পাই দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ কর্তৃক সাংবাদিক লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা। কিন্তু সাংবাদিক কর্তৃক পুলিশ লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা কেন শুনতে পাই না? 

শনিবারও (২৪ ফেব্রুয়ারী) বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে দৈনিক সমকালের স্টাফ রিপোর্টার কামরুল হাসান ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলাদেশ জার্নালের স্টাফ রিপোর্টার কিরণ সেখের ওপর পুলিশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ২৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ডিবি পরিচয়ে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন পুলিশ কামরুল হাসানকে আটক করে হোটেল ভিক্টরীর গলিতে নিয়ে যায়। সেখানে কামরুলকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে এবং তার সাথে থাকা মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। এরপর তার ফেসবুক আইডি ঘাঁটাঘাঁটি করে। পরিচয়পত্রের ছবি তুলে বলে ‘তোকে টার্গেটে রেখেছি।’ এর কিছুক্ষণ পর একই বিটে কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতিবাদের মুখে কামরুলকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে কিরণ শেখকে নির্যাতন করে পুলিশ। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও পল্টন থানা পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) কুবায়েত কিরণ শেখের ওপর নির্যাতন চালায়। কিরণ শেখ বলেন, বিএনপির কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ করতে নয়া পল্টনে দলটির কার্যালয়ের সামনে আসামাত্রই কয়েকজন পুলিশ সদস্য আমাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তারা আমার পরিচয় জানতে চাইলে আমি আইডি কার্ড দেখাই। এরপর পুলিশ অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালিসহ কিল, ঘুষি ও লাথি মেরে তারা আমাকে মাটিতে ফেলে দেয়। এরপর শার্ট ধরে টেনে তোলে। মারধরের কারণ জানতে চাইলে পুলিশ গালে চড় দিয়ে বলে, ‘একদম চুপ, কোনও কথা বলবি না।’

শুধু এরাই নয়, গত কয়েকদিন আগে বিএফইউজে-বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের সদস্য মনজুরুল আহসান বুলবুল ও মহাসচিব ওমর ফারুক ঢাকার বেইলি রোডের ভিকারুন্নিসা নূন স্কুলের সামনে এক ট্রাফিক সার্জেন্টের কাছে লাঞ্ছিত হন। সেই সময় সেখানে সার্জেন্টের পেইড সোর্সের মাধ্যমে ভিডিও ধারণ করা হয়। এরও কিছুদিন আগে রাজধানীর মৎস্য ভবনের সামনে দৈনিক মানবজমিনের ফটো সাংবাদিককে প্রকাশ্য রাস্তায় মারধর করেন ট্রাফিক সার্জেন্ট মুস্তাইন। প্রেস ক্লাব থেকে অফিসে যাওয়ার পথে মৎস্য ভবনের সামনে সাংবাদিক নাসিরকে আটকে গাড়ির কাগজপত্র দেখতে চান মুস্তাইন। কাগজপত্র ঠিক থাকলেও তার সঙ্গে হেলমেট না থাকায় একটি মামলা দিতে চান ট্রাফিক সার্জেন্ট মুস্তাইন। মামলা না দেওয়ার অনুরোধ করলেও তিনি তা শোনেননি বরং মামলাই দিয়ে দেন। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নাসির তার ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করলে, সঙ্গে সঙ্গে তার জামার কলার ধরে চড়-থাপ্পড় মেরে পুলিশ বক্সে নিয়ে যান ওই সার্জেন্ট।

সাংবাদিকরা মারামারি বা মিছিল-মিটিং করে আসেনি বলেই কি প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত হবেন ভেতরে-বাইরে। এভাবে আর কত লাঞ্ছিত হবেন জাতির বিবেকগণ। কেন আজ আমরা নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারি না। এটা কি সেই স্বাধীন বাংলাদেশ, যে স্বাধীনতার জন্য ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। ইজ্জত হারিয়েছিল ২ লাখ মা-বোন। যাদের এই ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ পেয়েছিল লাল শবুজের একটি পতাকা। আজ কেন কুলশিত হচ্ছে সেই পতাকার মর্যাদা? এ সকল প্রশ্নের উত্তরই আমাদের জানা, কিন্তু বলার সুযোগ নেই। কেননা, আমাদের কণ্ঠকেতো রুদ্ধ করা হয়েছে। দমিয়ে রাখা হয়েছে আমাদের কলমের শক্তি। কি করে বলবো আমরা, আমাদেরও যে পরিবার আছে। আমরাও কোনো মায়ের সন্তান। প্রতি মুহূর্তেই নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয় নিয়েই কাটে প্রতিটি ক্ষণ। কার কাছে চাইবো বিচার, কি হবে বিচার চেয়ে।

লেখক : এস এম শামীম
সহ-সম্পাদক, ভোরের পাতা।
ই-মেইল :s.m.s.journalist.bd@gmail.com

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: banglanewspaper সাংবাদিক পুলিশ