banglanewspaper

অধ্যাপক ডঃ আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার : আজ ১৪ মার্চ। আন্তর্জাতিক নদী কৃত্য দিবস। অন্যভাবে বলা যায় আন্তর্জাতিক নদী রক্ষায় করণীয় দিবস। এই দিবসটি আন্তর্জাতিক নদী নেটওয়ার্ক এর আহবানে সারা বিশ্বে বে-সরকারি পর্যায়ে পালিত হয়ে আসছে। ১৯৯৭ সালের মার্চে ব্রাজিলের কুরিতিয়া শহরে অনুষ্ঠিত হওয়া একটি আন্তর্জাতিক সমাবেশ থেকে আন্তর্জাতিক নদী কৃত্য দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নদীর প্রতি আমাদের করণীয় কী, নদী রক্ষায় আমাদের কী দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা কতটুকু এ বিষয়গুলো স্মরণ করিয়ে দিতেই এ দিবস পালনের সূচনা।

নদী মাতৃক বাংলাদেশের ভূখণ্ডের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ২৩০টি-র অধিক নদী। এই সব নদীর জীববৈচিত্র পরিবেশ এর ভারসম্য রক্ষার অন্যতম ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের নদী কেন্দ্রিক মানুষের জীবিকা উপার্জন নির্ভর করে এই সব নদীর উপর। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি নদী কোন না কোনভাবে পরিবেশ ও মানুষের উপকার বয়ে আনে। বিশেষ করে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা এই তিনটি বড় নদীর নিম্ম প্রবাহ হচ্ছে বাংলাদেশ, যার ফলে প্রতি বছর বন্যার সময় প্রচুর পরিমাণ পলি বাংলাদেশের ভূমিতে জমা হয়। ফলশ্রুতিতে কৃষক তথা দেশের মানুষের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সচল থাকে। বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে এসেছে বিশেষ করে শিল্প কলকারখানার উন্নয়ন অনেকাংশে বেড়েছে। আর বাংলাদেশের ৭০ -৮০ ভাগ কলকারখানা গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম এর দিকে থাকলে দেখ যায় কর্ণফুলী, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ নদীর তীর ঘেঁষে প্রচুর পরিমাণ শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। 

বাংলাদেশ নদী-নালা, খাল-বিল ভরা একটি দেশ। আরো সঠিক হবে বললে যে, ভরা ছিল একটি দেশ। এজন্যই “নদীমাতৃক” দেশ বাংলাদেশ। বর্তমান সময়ে আমরা কঠিন কঠিন বিদেশী শব্দ রপ্ত করতে পারলেও “নদীমাতৃক” কথাটির গভীরতা কিংভা এর ব্যঞ্জনা আমরা আজো বুঝিনি। নদীমাতৃক কথাটার সোজা মানে হচ্ছে, নদী যেখানে মাতা বা জননী। আমরা সেই জননীকে প্রতিনিয়ত গলা টিপে হত্যা করছি। 

প্রমত্তা সব নদীকে পরিণত করছি রবি ঠাকুরের ছোট নদীতে। অবম্য রবি ঠাকুরের ছোট নদীতেও বৈশাখ মাসে হাঁটুজল থাকতো। আর এখন বৈশাখ মাসে নদীর বুকে বোরো ধান ফলে। জীবনানন্দের ধানুসুঁড়কে আমরা খালে পরিণত করেছি। মধুসূদনের কপোতক্ষ এখন হারিয়ে যাওয়া নদ। আর মানিকের পদ্মায় কুবেররা এখন ইলিশ পায় না।  

বুড়িগঙ্গা ছিল এক সময় বিশাল, গভীর  আর প্রশস্ত এক নদী। এ নদী দয়ে বিশাল বিশাল বাণিজ্য জাহাজ চলাচল করত। বুড়িগঙ্গার স্রোত কেড়ে নিয়েছে অনেকের ধন দৌলত আবার দিয়েছে ও অনেককে। এ নদী দিয়েই সওদাগার, পরিব্রাজক ও ব্যবসায়ীরা ব্যবসা বাণিজ্য করতে আসতো। ঢাকার তথা বাংলার ব্যবসা বাণিজ্য এবং যোগাযোগ বুড়িগঙ্গা দিয়েই পরিচালিত হতো। ফলে বুড়িগঙ্গা হয়ে উঠে এ অঞ্চলের মানুষের আর্শীবাদ স্বরূপ। রাজধানী ঢাকার রূপকার ইসলাম খান ১৬১০ সালে বুড়িগঙ্গা দিয়ে ঢাকায় এসে পৌঁছেন। মোগলদের যুগেই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল বুড়িগঙ্গা। এ নদীর তীরে সৃষ্টি হয়েছিল জনপদ, তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এ বাংলার ঝীবিকা, চলাচল, পরিবহন, কৃষ্টি, শিল্প, সভ্যতা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন। 

একটা মহানগরকে যে নদী এত কিছু দিল, এত বছর ধরে বুকে আগলিয়ে রাখছে সেই নদীকে আমরা সবাই মিলে হত্যা করতে বসেছি। এ নদীর পানিকে নষ্ট করে, দখল করে নদী হত্যায় আমরা হাত পাকাচ্ছি। বুড়িগঙ্গার পানি দূষিত হয়ে বীভৎস হয়ে গেছে। দূষণের ফলে পানির ঘনত্ব বেড়ে গেছে। এর মধ্যে কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। এমনকি নদী পার হবার সময় অন্তরে যদি সাধ জাগে এক আঁচল পানি হাতে তুলে নেবেন নিশ্চিত করে বলা যায় সেই আশাও দুরাশা। পানিতে রাসায়নিক বর্জ্যরে উপস্থিতিটা আরো মারাতœক আকার ধারণ করেছে।

ছোট বড় অনেক কারখানা গড়ে উঠেছে এই ২টি নদীর পাড়ে। কারখানাগুলো উৎপাদনের কাজে পানি ব্যবহার করে, পরবর্তীতে কোন প্রকার পরিশোধন ছাড়াই পানি নদীতে ছেড়ে দিচ্ছে। BCAS এর একটি জরিপ মতে জানা যায় যে, মাত্র ৪০% কারখানা পানি পরিশোধন করে নদীতে ছাড়ে আবার এর মধ্যে অনেক কারখানা শুধুমাত্র দিনের বেলায় ETP চালু রাখে, যার ফলে নদী তার ভারসম্য হারাচ্ছে। সিউইয়েজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট এর অভাব নদী দূষণের অন্যতম কারণ। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর জরিপ মতে বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশে প্রায় ১৩ ফুট পুরু পলিথিনের স্তর রয়েছে এবং নদীতে শিল্প কারখানা ৬০ ভাগ বর্জ্য এবং ঢাকা ওয়াসা ও সিটি কর্পোরেশন এর ৩০ ভাগ বর্জ্য পতিত হয়। চট্টগ্রাম এর মত বাণিজ্যিক শহরও কোন প্রকার পরিশোধন করা ছাড়াই সিউয়েজ বর্জ্য নদীতে ছেড়ে দিচ্ছে, এই বর্জ্য মল-মূত্র ছাড়াও মারাত্মক ক্ষতিকর ভারী ধাতব পদার্থ বহন করে। ফলস্বরূপ নদী হারাচ্ছে তার নাব্যতা, জলজ প্রাণী হারাচ্ছে আবাসস্থল, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশে। 

হাজারীবাগ ট্যানারি শিল্পকে সাভার এ স্থানান্তর করেও কোন প্রকার লাভ হচ্ছে না, বরং বুড়িগঙ্গা বদলে নতুন করে ধলেশ্বরী নদী হত্যা শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ইটভাটা নির্মাণ এর ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে ভূ-পৃষ্টস্থ পানি দূষণ। বিভিন্ন ধরণের তেল ও পণ্য পরিবহনকারী জাহাজ ডুবির কারণে নদীর বাস্তুসংস্থান অনেকাংশে ধ্বংস হয়ে গেছে। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় দেখা যায় যে কর্ণফুলী নদীর অনেক পয়েন্ট এ pH মানমাত্রা কমে গেছে অর্থাৎ এসিডিটির পরিমাণ বেড়ে গেছে। অ-পরিকল্পিতভাবে নদী শাসন ও ড্রেজিং এর ফলে পাল্টে যাচ্ছে নদীর গতিপথ। সব কিছু মিলিয়ে চিন্তা করলে বুঝা যায়, মনুষ্য সৃষ্ট কারণগুলো নদীর স্বাভাবিক অবস্থা পরিবর্তন এর জন্য দায়ী। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর তথ্য অনুযায়ী গত এক হাজার বছরে হারিয়ে গেছে ১৫০০ নদী। 

নদীর জন্য হুমকি সরূপ বিষয়গুলো কমিয়ে আনার জন্য প্রতি বছর ১৪ মার্চ “বিশ্ব নদী রক্ষা দিবস” (International Day of Action for River) পালন করা হয়। পরিবেশবাদী সংগঠন ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করে এমন এনজিও সহ সারা বিশ্বব্যাপী নদী প্রেমী মানুষেরা এই দিবসে নদী রক্ষার জন্য আওয়াজ তোলে।  বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ২০০৪ সাল হতে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাথে নিয়ে এই দিবসটি প্রতি বছর পালন করে। এ বছরও দিবসটি কেন্দ্র করে সোরা দেশব্যাপী নানা কমসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের নদ-নদী দূষণের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এর জন্য বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী শাস্তির বিধান রয়েছে, ৯ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যদি কোন প্রতিষ্ঠান কোন প্রকার দূষক নদীতে ছেড়ে দেয় তাহলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদন্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দণ্ডিত হতে পারে। শিল্প কারখানায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিবেক ও সচেতনতা বোধ-ই পারে বাংলাদেশের প্রাণ নদীগুলোকে রক্ষা করতে, আমরা সবাই চেষ্টা করলে এখনও হয়ত শীতলক্ষ্যা বা কর্ণফুলীর মত নদীগুলোকে রক্ষা করতে পারব।

সহ লেখকঃ আব্দুল্লাহ আল নাঈম, মোঃ নাছির আহম্মেদ পাটোয়ারী।
লেখকরা স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে, শিক্ষকতায় ও গবেষণায় সংযুক্ত।

 

 

 

 


 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: banglanewspaper