banglanewspaper

কোটা থাকুক এতে কারো সমস্যা নেই। কিন্তু এর একটা যৌক্তিক সংস্কার হোক। যেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশ আজ স্বাধীন সেই একই বৈষম্য কি আবার থাকা চলে? অনেকে ই এই ব্যাপারটা কে ঘোলা করে ফেলছে। আচ্ছা আমরা কি একবার ও বলেছি যে আমরা কোটা বিরোধী? কোটা তুলে দেওয়া হোক এটা বলেছি?

আমরা বলেছি যে মেধার কদর করা হোক এবং এই জন্য ই সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার করা হোক। অনেক বুদ্ধিজীবী দেখছি বলছেন যে সকলের কেন সরকারি চাকরি করতে হবে? দেশে তো অনেক প্রাইভেট কম্পানি আছে বেকার না থেকে মেধাবীরা সেখানে চাকরি করলেই তো পারে। তাদের উদ্দেশ্যে একটা কথা ই বলার, আচ্ছা আপনার কোন যুক্তিতে এই কথা বলেন? আপনাদের কি মনে হয়না যে এই ৫৬% কোটা সংস্কারের প্রয়োজন আছে?

আচ্ছা ধরুন আপনি যেই পদে আসীন আছেন সেই পদ থেকে যদি পদত্যাগ করে আপনাকে একটা কম্পানির চাকরি দেওয়া হয় আপনি সেটা করবেন?
হুম এবার আপনি নিশ্চুপ। আপনি কি জানেন না নাগরিকের কি কি অধিকার আছে? সরকারি চাকরিতে সবার সমান অধিকার।

আপনারা কি জানেন না যে, যার যে যোগ্যতা তাকে সেখানে নিয়োগ দিতে হয়? যারা বলছেন মেধাবীদের সরকারি চাকরি ই কেন করতে হবে,অন্য চাকরি তো আছেই।

তাদের উদ্দেশ্যে, আচ্ছা তাহলে সরকারি চাকরি কাদের জন্য বরাদ্ধ? সরকারি চাকরি কি তাহলে ৫৬% কোটার মধ্যে সীমা বদ্ধ থাকবে? মেধা দিয়ে তাহলে কি হবে? মেধাবীদের কে হয় হাতে ভিসা ধরিয়ে দিন নয় তো গুলি করে মেরে ফেলুন। এখন মনে হচ্ছে এদেশে মেধাবী হয়ে জন্মানো পাপ আবার কোটাহীন ভাবে জন্মানো ও ভয়াবহ পাপ।

সবাই শুধু নিজের স্বার্থের কথা ভাবে। সিভিল সার্ভিসে মেধাবিদের নিয়োগ না দিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অমেধাবীদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। কোটার প্রার্থী পাওয়া না গেলে পদ গুলো শূণ্য রাখা হচ্ছে এতে কি দেশ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে না? যার যেমন যোগ্যতা তার তেমন চাকরি পাওয়া উচিৎ। আবার অনেকেই দেখি শুধু বলে যাচ্ছেন যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে কথা বলছি আমরা। সংস্কারের কথা বলার জন্য দেশদ্রোহী খেতাব ও কপালে জুটছে। দেশে বর্তমানে ৫৬ % কোটা ব্যবস্থা চালু আছে।

এর মধ্যে ৩০% মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০% জেলা কোটা, ১০% নারী কোটা, ৫% উপজাতি কোটা, ১% প্রতিবন্ধী কোটা। মোটা ৫৬%।

কোটা ব্যবস্থা একটা দেশে তখনই প্রচলিত থাকে যখন সেই দেশের একটা পিছিয়ে পড়া মানবগোষ্ঠীকে এগিয়ে আনার জন্য বাড়তি সুবিধা প্রদান করা হয়।

প্রথমে আসি নারী কোটায়। একটা সময় ছিল যখন এদেশের নারীরা শিক্ষা এবং সকল ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে ছিল। নারীদের কে এগিয়ে আনতে সরকার কোটা ব্যবস্থা চালু করেন। নারীরা এখন শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে পুরুষের সাথে সমান ভাবে এগিয়ে গিয়েছে। তার প্রমাণ স্বরূপ, নারী নেতৃত্বে আজ বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে।

দেশের প্রধান প্রধান পদগুলো নারীদের দখলে। সে দিক থেকে দেখলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো আমাদের থেকে অনেক পিছিয়ে। কারণ কোন নারী এখনো পর্যন্ত মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে পারেনি। নারী নেতৃত্বে তারা আস্থা রাখতে পারেনি এখনো। সেই হিসেবে আমরা ট্যাবু মুক্ত।

নারীদের কে আজ আর পিছিয়ে পড়া মানব গোষ্ঠী হিসেবে দেখার দিন শেষ। নারীরা নিজেদের মেধার যোগ্যতায় এত দূর এসেছে, বাকিটা পথ ও এভাবে এগিয়ে যাবে।
নারী কোটা কমিয়ে ২% কমিয়ে আনা হোক, কারণ গ্রামীণ সমাজের প্রেক্ষাপটে নারীরা এখনো কিছুটা পিছিয়ে আছে। তবুও সেটা খুব কম। 

এবার আসি জেলা কোটায়। মুক্তিযুদ্ধের পরে বাংলাদেশের কিছু জেলা অন্যান্য জেলা গুলোর তুলনায় শিক্ষাদীক্ষা সহ সকল বিষয়ে পিছিয়ে পড়ে। সেই সকল জেলার মানুষদের কে জেলা কোটা দ্বারা জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন, শিক্ষার দিকে আনয়ন এবং চাকরিতে প্রবেশের জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয় যাতে তারা সহজেই নিজেদের অবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে অন্য জেলা গুলোর সাথে তালমিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। এখন বাংলাদেশের সকল জেলার মানুষ ই শিক্ষাগত দিক থেকে এবং জীবন যাত্রার মানের দিক থেকে সমান এগিয়ে। তাই এই জেলা কোটা এখন নিষ্প্রয়োজন।

এবার উপজাতি কোটার কথা বলা যাক। পার্বত্যশান্তি চুক্তিতে উপজাতিদের সমান সুযোগ সুবিধা প্রদানের কথা বলা আছে। অর্থনৈতিক, সামাজিক দিক থেকে তাদের অবস্থান কিছুটা অনগ্রসর। কিন্তু তাদের কে যদি সমান সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয় তাহলে তারা নিজেরাই নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে। বর্তমান সময়ে আমাদের দেশের উপজাতিরা ও পিছিয়ে নেই। সকল ক্ষেত্রে তাদের বিচরণ এটা প্রমাণ করে যে তারাও তাদের জিবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছে।

তবুও কিছু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আছে যারা কিছুটা অনগ্রসর। তাদের ক্ষেত্রে কিছু সুযোগ সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে।

সমাজে সব থেকে বেশি অবহেলিত প্রতিবন্ধীরা। তারা ই প্রকৃত পক্ষে কোটা অর্থাৎ রাষ্ট্র প্রদত্ত বাড়তি সুযোগ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। কারণ তারা শারীরিক এবং মানসিক ভাবে অক্ষম। একটা আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে সেদিন কোটা সংস্কার আন্দোলনে এক প্রতিবন্ধী ভাইকে দেখলাম। তিনিও চান কোটা সংস্কার হোক। কত বড় দেশ প্রেমিক হলে এমন কাজ কেউ করতে পারে আমি জানিনা। তাকে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।

তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও চান না যে এত বৈষম্য থাক। তিনি দেখতে পান না তবুও কোটার ভয়াবহতা উপলদ্ধি করে নিজে একজন যোগ্য কোটাধারী হয়েও সংস্কার আন্দোলনে যোগদান করেছেন। সকল প্রতিবন্ধী ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, আসল প্রতিবন্ধী তো তারা যারা চোখ থাকতেও অন্ধ সেজে আছেন। কোটার ভয়াবহতা উপলদ্ধি করেও চুপ আছেন। 

সব শেষে আসি মুক্তিযোদ্ধা কোটায়। আচ্ছা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যদি শুধু মাত্র সমাজ সেবা মূলক কাজে করার সুযোগ পাওয়া যেত তাহলে কয়জন এই কোটা ব্যবহার করতেন? অনেকেই দেখি বলছেন যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা সম্পর্কে কথা বলা মানেই মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করা। সেই সব বুদ্ধিজীবীদের বলছি আপনারা কি জানেন মুক্তিযুদ্ধ কেনো হয়েছিল? কেনো মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছিল? কেনো ৩০ লক্ষ প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছিল? কেনো আমাদের মা বোনেরা তাদের সম্মান হারিয়েছিল?

কেনো স্বাধীন হয়েছিল দেশ? কেনো কেনো কেনো?

আর মুক্তিযোদ্ধা কোটা দিয়েই যদি আপনারা ভাবেন যে তাদের সম্মান দিচ্ছেন তাহলে ভুল ভাববেন। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা কোন সুবিধাই পাচ্ছেনা। আর মুক্তিযোদ্ধারা প্রকৃত পক্ষে অবহেলিত,দেখুন গিয়ে কত মুক্তিযোদ্ধার আশ্রয় আজ বৃদ্ধাশ্রম। সন্তানেরা বাবা মা কে এখন বোঝা ভাবে। যেখানে সুবিধা পাবার কথা ছিল বীর সৈনিক দের, যারা দেশের জন্য লড়াই করে ছিনিয়ে এনেছি স্বাধীনতা। সেখানে তাদের কোন রকম ভরণ পোষণের দায়িত্ব না নিয়েও তাদের উত্তরসূরি রা মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়ে কত সুযোগ সুবিধা হাতিয়ে নিচ্ছেন। তারা তো মুক্তিযোদ্ধাদের নয় বরং তাদের কোটা কে ভালবাসে। যারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলো তাদের খোঁজ কেউ রাখেনা।

অনেকেই ভিক্ষা করেন। এই লজ্জা কাদের? জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা খাবারের অভাবে ভিক্ষা করে। এই আমাদের দেশ। এ যুগে অনেকে শেষ বয়সের বৃদ্ধ বাবা-মা কে ই দেখে না, সেখানে নাতিরা কি দেখবে?নাতিরা কি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কিছু করছে? তারা শুধু নিজেদের টা দেখছে। দিন দিন কোটা আরো ডালপাল গজাচ্ছে ,আপনারা কোটা সংস্কারের কথা বললে রাজাকার বানিয়ে দেন, অথচ দেশ স্বাধীন ই হয়েছিল বৈষম্যমুক্ত একটা নতুন স্বপ্নের দেশ গড়ার লক্ষ্যে। আপনাদের অবস্থা হচ্ছে, "বিচার মানি কিন্তু তালগাছ আমার" এই টাইপ।

আচ্ছা যুদ্ধের সময় যেই ৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল তারা যদি একেকজন একেক পরিবারের ও হয় তাহলে দাঁড়ায় ৩০ লক্ষ পরিবার। তাহলে সেই ৩০ লক্ষ পরিবারের মানুষের কোটা কে দেবে? তাদের জীবনের কি কোন মূল্য নেই? যে সব মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে তাদের পরিবারের কোটা কে দেবে? সেই সময়ের ৭ কোটা মানুষের তাদের পরিবারের কেউ না কেউ যুদ্ধ করেছিল। প্রায় সবাই যুদ্ধে সাহায্য করেছিল কিছু নরকের কীট বাদে। আবার অনেকেই রাজারকার সেজে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছিল তাহলে তারা কেন কোটা পাবেনা? অনেকে ধরা পড়ে নির্মমভাবে খুন ও হয়েছে তাহলে কি অন্যায় ছিল তাদের? কেন তারা কোটা পাবেনা?

নিরপেক্ষ ভাবে বিচার করলে ৭ কোটি মানুষ ই কোটা ব্যবস্থার আওতাভুক্ত। তবুও কেন জনসংখ্যা কে দুই ভাগে ভাগ করতে হবে? কেন করতে হবে? বৈষম্য কি আদৌ কমেছে? আমরা কি প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন হতে পেরেছি? স্বাধীনতার চেতনা কি ছিল? কি বা ছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শ? আজ স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ যেই বৈষম্য দূর করতে এত রক্ত দিতে হলো এখনো সেই এক ই শোষণ চলছে। ৫৬% কোটাধারীদের মধ্যে নারী, জেলা, উপজাতি সহ প্রতিবন্ধী সকলেই কোটা সংস্কার চায়। মুক্তিযোদ্ধারা ও কোটা সংস্কার চায়,অনেকে মুক্তিযোদ্ধা এই কোটা সংস্কারের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। তাহলে চায় না কারা?

যদি মুক্তিযোদ্ধাদের ও কোটা সংস্কারের পক্ষে সম্মতি থাকে তাহলে এই ব্যাপারে স্রোতের বিপরীতে কারা? হাজার হাজার ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা ধরা পড়ছে এখন।
এদের কি বিচার হতে পারে? এরা তো দেশদ্রোহী। কারণ মুক্তিযুদ্ধের মত একটা পবিত্র জিনিষ কে এরা নিজেদের স্বার্থের জন্য অপবিত্র করছে। এরা কি রাজাকার নয়?

কোটা সংস্কার নিয়ে যাদের অবস্থান নেতিবাচক তারা অধিকাংশ ই মুক্তিযোদ্ধাদের মানে উত্তরাধিকারী প্রথা স্বরূপ কোটা সুবিধা পাচ্ছেন। যেখানে স্বয়ং মুক্তিযোদ্ধারা কোটা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি করছেন সেখানে কিছু সুবিধাভোগীরা নিজেদের স্বার্থের জন্য জাতি কে মেধাশূণ্য করার ষড়যন্ত্রে মেতেছে। কোটা সংস্কার হলে বৈষম্য দূর হয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গঠিত হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, কোটা সংস্কার করে মেধাবীদের অভিশাপ মুক্ত করুন। আজ বুদ্ধিজীবীদের অবস্থা দেখে মনে পড়ে যায় সেই ১৪ ই ডিসেম্বরের কথা "দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ : কে? বাইরে আসুন কথা আছে তার পরেই রক্তমাখা এক কলঙ্কিত ইতিহাস। জাতিকে মেধাশূণ্য করার ষড়যন্ত্রে তারা সফল হয়েছে। তারা খুব ভাল করেই বুঝতে পেরেছিল বুদ্ধিজীবীদের শেষ করে দিলেই এই জাতি আর কোন দিন ও মেধার কদর করতে জানবে না। হুম তারা সফল হয়েছে। 

স্বাধীনতা তুমি এলে, বাবার বুক ঝাঁজরা করে বোনের নগ্নদেহের উপর নৃত্য করে মায়ের পরোনের সাদা শাড়ি হয়ে ভাইয়ের জীবন্ত কবরের উপর দিয়ে হেটে এলে তুমি।

বহুকাল পরে তুমি এলে,কিন্তু নিয়ে এলেনা স্বাধীনতা। নিয়ে এলে দাসত্ব, পরাধীনতার শিকলে বাঁধা পড়ে তুমি এলে। তোমাকে আসতেই হবে,তুমি শুধু পরাধীনতা মুক্ত হয়েই আসবে।

জয় আবার ও হবে।

লেখক

লুৎফুন্নাহার লুমা (নীলা) 

কোটা সংস্কারের আন্দোলন কর্মী।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: Banglanewspaper কোটা সংস্কার চাই