banglanewspaper

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়: মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক দেশ গঠনের লক্ষ্যে সমাজে পিছিয়ে পড়া সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রতিভা বিকাশের প্রত্যয় নিয়ে ‘সহ শিক্ষাযুক্ত অপরাধ মুক্ত শিক্ষার্থী ঐক্য’ স্লোগানে এক ঝাঁক মেধাবী তরুণ ও যুবকের স্বেচ্ছাশ্রম ও অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতিষ্ঠিত আজকের এই শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র।

১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙ্গালির নিশ্চিত বিজয় বুঝতে পেরে পাকিস্থান সামরিক যান্তা বাহিনী এদেশে তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তিবাহিনীর সহযোগিতায় দেশকে প্রকৃতি অর্থে বাকলিঙ্গ ও মেধাশূন্য করার প্রয়াসে মহান বিজয় অর্জনের ঠিক দু’দিন আগে ১৪-ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের কে হত্যা করে। জাতিকে মেধাশুণ্য করার যে চেষ্টা করেছিল পাকিস্থান হানাদার বাহিনী দেশ যেন মেধা শুণ্য না থাকে সেই ভবিষ্যৎ বুদ্ধিজীবী ও দেশের নেতৃত্ব তৈরি করার উদ্দেশ্যে ২০১৪ সালের  ১৪ ডিসেম্বরে হতদরিদ্র, শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত ও সমাজে পিছিয়ে পড়া শিশুদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মেধা বিকাশের লক্ষ্যে ‘শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র’র যাত্রা শুরু হয়।

শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র’র প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে এই শিশুদেরকে একজন দেশপ্রেমিক ও আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, সমাজের অধিকার থেকে বঞ্চিত এই শিশুদের অবিভাবক রুপে তাঁদের পাশে থেকে তাদেরকে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তিতে বিকশিত করা তারা যেন কখনও উপলব্ধি করতে না পারে তারা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও হত দরিদ্র পরিবারের সন্তান, তাঁদের পাশে কেউ নাই।

শিশুদের নিয়ে কাজ করা এই সংগঠনটির বর্তমানে প্রায় ১২টি জেলায় (ঢাকা, খুলনা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, রংপুর পটুয়াখালী ও নোয়াখালীর হাতিয়ায়) ১৩ টি কেন্দ্রে ৮৬০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কার্যক্রম চালু রয়েছে। এই ৮৬০ শিক্ষার্থীকে শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র বই-খাতা, জামা-কাপড় থেকে শুরু করে শিক্ষা উপকরণের যাবতীয় সামগ্রী বিনামূল্যে বিতরণ করছে।

গাইবান্ধার সদর উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নের মৌজা মালিবাড়ি গ্রামের চর এলাকায় সংগঠনটির সাংস্কৃতিক বিভাগের পরিচালক সুজাউর রহমান শীষ এর দান কৃত দশ শতাংশ জমিতে নিজস্ব স্কুল ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছে সংগঠনটি। এই স্কুলে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশুনার সুযোগ পাবে। এছাড়াও মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলায় নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়েছে এসপিবিকে শিক্ষালয়ের নিজস্ব স্কুল ভবন। পটুয়াখালীর সদর উপজেলায় ঢাকাস্থ এক হোটেল কর্মচারীর দান করা জমিতে এসবিপিকে শিক্ষালয় নির্মানেরও প্রস্তুতি চলছে। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশীতে জালাল উদ্দিন নামের একজন ব্যবসায়ীর জমিদানের প্রক্রিয়া চলছে, প্রক্রিয়া শেষ হলে স্কুল নির্মাণের কাজ শুরু করবে সংগঠনটি।

শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র’র প্রধান উপদেষ্টা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল এমপি বলেন, সুবিধা বঞ্চিত ও সমাজের মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদেরকে সাধারণ জীবন যাপনে ফিরিয়ে এনে মানবিক বিকাশের জন্য উচ্চতর সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র।  তিনি শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্রে’র সাফল্য কামনা করে সমাজের সকল পেশার মানুষদের সংগঠনটির পাশে থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবার আহ্বান করেন।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধিত শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র’র শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্য প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও প্রকাশনা নামের পাঁচটি আলাদা বিভাগ রয়েছে।

শিক্ষা বিভাগে নিয়োজিত এক দল মেধাবী তরুণ স্বেচ্ছাশ্রমে বিনাপারিশ্রমিকে সপ্তাহে চার দিন বাংলা ইংরেজি ও সাধারণ গণিত টিউশনি করছে এসপিবিকে শিক্ষালয়ের শিক্ষার্থীদের।

রাজধানীর উত্তরার কেসি হাসপাতালের সহযোগিতায় ও ডাঃ সনজিদ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে কার্যক্রম চলছে স্বাস্থ্য বিভাগের। তবে অতি শিঘ্রই শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্রের নিজস্ব হাসপাতাল নির্মান করা হবে বলে জানায় সংগঠনটি যেখানে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা হবে সমাজে নিন্মবিত্ত আয়ের মানুষের। দেশব্যাপী স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রম চালানোর চেষ্টাও অব্যাহত আছে বলে জানা যায়।

তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের কার্যক্রমে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে রাজধানীর ফার্মগেইটে এসপিবিকে আইটি ইনস্টিটিউট’’ নামের একটি প্রশিক্ষণশালা যেখানে রয়েছে ২০টি কম্পিউটার ও আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ ল্যাবরেটরি এবং আইটি প্রশিক্ষণে পারদর্শী সংগঠনটির আইটি বিভাগের এক দল স্বেচ্ছাসেবক তরুণ যারা এসপিবিকে শিক্ষালয়ের শিক্ষার্থীদের বাইরেও মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান নাতি-নাতনী ও সরকারী কর্মচারীর সন্তানদের বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র’র শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ও আইটি বিভাগের বাইরে রয়েছে সংস্কৃতি বিভাগ যা ‘এসপিবিকে শিল্প নিকেতন’ নামে শিশুদের গল্প, কবিতা, গান, অভিনয় ও চিত্রাঙ্গন প্রতিযোগিতা এবং জাতীয় দিবস পালন ও জাতীয় দিবসে বিভিন্ন প্রদর্শনী থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক চর্চার যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এসপিবিকে শিল্প নিকেতন প্রধানত দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশে শিশুদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করে। কিছু দিন আগে ‘টুনির মহাকাণ্ড’ নামে এসপিবিকে শিল্প নিকেতনের একটি নাটক মঞ্চায়িত হয়েছে।

এছাড়াও রয়েছে আলাদা প্রকাশনা বিভাগ। ‘কলেজ ক্যাম্পাস’ নামে মাসিক পত্রিকা বের হয় যেখানে কবিতা, গল্প, চিত্রাঙ্গন, গদ্য কার্টুন, ফিচারসহ বিভিন্ন বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও মনীষীদের জীবনী এবং শিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হয়।  কলেজ ক্যাম্পাস পত্রিকাটির সাংবাদিক শিক্ষার্থীরাই এবং পাঠক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কলেজ ভিত্তিক যেসব পত্রিকা বের হয় ইতিমধ্যে সেগুলোকে  টপকিয়ে পত্রিকাটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্রের উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটে প্রেস সেক্রেটারি আশরাফুল আলম খোকন বলেন, মেধাবীরাই সমাজের নিষ্পেষিত মেধাকে মূল ধারায় তুলে আনতে পারে। শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র সে কাজ করে যাচ্ছে এক ঝাঁক মেধাবী ছাত্রলীগের সেচ্ছাশ্রমে। ছাত্রলীগের শত শত ভাল কাজ থাকা সত্যেও গুটিকয়েক সমালোচিত কাজ কে সমাজে মানুষের কাছে তুলে ধরা হয়। মিজানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তানদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞান বিজ্ঞানে তাদের প্রতিভা বিকাশে যে কাজ করে চলছে তা রোল মডেল হয়ে থাকবে। তিনি শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র’র উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করে সমাজের সকল পেশার মানুষদের সংগঠনটির সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিয়মানুসারে শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র’র রয়েছে ১১ সদস্য বিশিষ্ট্য উপদেষ্টা পরিষদ, ২১ সদস্য বিশিষ্ট্য কেন্দ্রীয় কমিটি ও নির্বাহী সদস্য রয়েছে ৯ জন। এছাড়াও সংগঠনটির রয়েছে ১৯ সদস্য বিশিষ্ট্য জেলা কমিটি।

এসপিবেকে শিক্ষালয়ের শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের বাইরেও বিভিন্ন অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের মাঝে শীত বস্ত্র ও প্রতিটি ঈদ ও পূজায় পোশাক ও প্রয়োজনীয় খাবার সরবরাহ করে আসছে সংগঠনটি। এছাড়া বন্যা ও খড়ার মত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে নিয়মিত ছুটে যান এর কর্মীরা। গত শীতে প্রায় দুই হাজার শীতবস্ত্র জামালপুর, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জে বিতরণ এবং  মাস দুয়েক আগে রোহিঙ্গাদের মাঝে ঔষুধ বিতরণ করে এসপিবিকে। সুবিধা বঞ্চিত শিশু ও প্রতিবন্ধী শিশুদের কে সমাজে মূল ধারার সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্যে ও এদের প্রতিভাকে বিকশিত করার উদ্দেশ্যে পার্বত্য অঞ্চলের খাগড়াছড়ির সদর উপজেলায় আদিবাসী শিশুদের নিয়ে কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র। ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিটি বিভাগে নিজস্ব কার্যালয় ও এসপিবিকে শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করা এবং পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলা গুলোতে এর বিস্তৃতি করার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে এই শিশু সংগঠনটি।

সংগঠনটির চেয়ারম্যান ও ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, একা উদ্যোগে কোন কাজ আরম্ব করা গেলেও তা টিকে থাকতে দশের সহযোগিতা প্রয়োজন। সমাজের ঝোরে পড়া, ও বঞ্চিত শিশুদেরকে মূল ধারার সঙ্গে যুক্ত করতে এবং তাদের মেধা বিকাশে শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র সাধ্যমত কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্রকে ট্রাস্টে পরিণত করার আশা ব্যক্ত করে বলেন, পরিবারের প্রতি আমাদের যেমন দায়বদ্ধতা রয়েছে, সমাজের প্রতি সেই একই দায়বদ্ধতার যায়গা থেকে এই শিশুদের নিয়ে আমরা কাজ করে চলেছি। জাতির স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ও শিশু বান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লক্ষ্যকে সফল করতে শিক্ষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তিতে এই শিশুদের প্রতিভাকে বিকশিত করে ভবিষ্যৎ দেশের নেতৃত্ব তৈরি দেশের একজন আদর্শবান ও দেশপ্রেমিক সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক একদল ছাত্রলীগের স্বেচ্ছাশ্রমে ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কাজ পরিচালিত করছে শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র।

তিনি ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে মনে করেন প্রত্যেক মানুষেরই এই ভাল কাজ গুলো করা উচিত। তিনি দেশের মানুষের প্রতি আহ্বান জানান শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্রেকে সহযোগিতা ও উৎসাহ প্রদানের জন্য।

সংগঠনটির নির্বাহি পরিচালক আব্দুল্লাহ আল নোমান জানান, দেশের যে কোন শিক্ষার্থীই স্বেচ্ছাশ্রমে আমাদের সংগঠনের সাথে যুক্ত হতে পারে। মাদক মুক্ত ও আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতেই ঝোরে পড়া শিশুদের নিয়ে আমাদের কাজ।

ট্যাগ: bdnewshour24 প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ছাত্রলীগ মিজানুর রহমান