banglanewspaper

আলফাজ সরকার আকাশ, শ্রীপুর (গাজীপুর): গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সিংহশ্রী ইউনিয়নের কুড়িয়াদী গ্রামের উমেশ চন্দ্র বর্মনের ছেলে পরেশ চন্দ্র বর্মন। বয়সের কোটা ছেষট্রি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখনও পরেশ মাঝির শ্রম থেমে থাকেনি।

সারাদিন এ বাড়ি ও বাড়িতে গৃহস্থালীর কাজের পর রাত নেমে আসলেই তিনি নিজের নৌকা নিয়ে ঘাটে চলে আসেন, আর অবস্থান করেন ভোরের আলো দৃশ্যমান হওয়ার সময় পর্যন্ত। অন্যের কষ্ট লাগবের কথা চিন্তা করে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবেনি কখনও।  নিজের স্বজন ও সম্পদ বলতে তেমন কিছুই আর অবশিষ্ট নেই, থাকার মধ্যে আছে একটি ঘর যেখানে বসবাস করেন  স্ত্রীকে নিয়ে। তাঁর সংসারে সন্তান এসেছিল কয়েকবার কিন্তু ভাগ্যের কাছে হেরে তাঁরা পরপারে। বারবার নিয়তির কাছে পরাজিত হয়ে নিজেকে সমর্পণ করেছেন মানবসেবার মধ্যে। আর এ কাজ করছেন তিনি দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে। 

পরশ মাঝি ছোটকাল থেকেই একজন পরোপকারী, কারো কষ্টের সময় নিজেকে তিনি আর ঠিক রাখতে পারেন না। দারিদ্রের কষাঘাত তাকে এ কাজে কখনও দমাতে পারেনি। তার কাছে মানুষের ভালবাসাটাই সবচেয়ে বড়। এখানে টাকা পয়সার কোন স্থান নেই।

পরেশ মাঝি জানান, তিনি ছোটকাল থেকেই দেখে আসছেন খেঁয়া পাড় হওয়ার জন্য ঘাটে কতজন কত কষ্ট করছে। সন্ধ্যার পর সে কষ্ট বেড়ে হয় দিগুণ। মানুষের বিপদের কথা ভেবেই তিনি নিজের জমানো দুই হাজার টাকা দিয়ে একটি নৌকা কিনেন, আর সে নৌকায় তাঁর মানবসেবার একমাত্র হাতিয়ার। আর এ কাজ করছেন দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে। এলাকায় এখন পরেশ রাতের মাঝি। পরেশের কাছে সেবার কোন মূল্য হয় না, তাই কারো কাছে খেঁয়া পাড়াপাড়ের জন্য  তিনি কিছু চেয়ে নেন না তবে কেউ যদি খুশি হয়ে কিছু দেন তাহলে তা ফিরিয়েও দেন না।

কুড়িয়াদী খেঁয়াঘাটের ইজারাদার তৌফিক হোসেন জানান, আগে একটি প্রবাদ ছিল সারা রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি, গোদারাঘাটে এসে গড়াগড়ি, কারন ঘাটে রাতের বেলায় কোন মাঝি থাকতো না। কিন্তু আমাদের এই ঘাটে এই প্রবাদটা প্রচলিত নয় পরেশ মাঝির কল্যাণে। সে কতদিন ধরে রাতের বেলায় ঘুমান না, এর হিসাব আমরা করতে পারব না। রাত দশটার পর সারাদিন কাজ শেষে অন্য মাঝিরা চলে গেলে পরেশ এসে হাজির হন। এ কাজে কোন প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি হয়নি কখনও তাঁর।

পরেশ মাঝির স্ত্রী ছায়া রানী বর্মণের মতে, বিয়ের পরই দেখে আসছেন তাঁর স্বামী সারারাত নদীর খেঁয়া ঘাটে বসে থাকেন। রাত নেমে আসলেই শত চেষ্টা করেও তাকে বাড়িতে রাখা দায়। তাঁর কথা মানুষ আমাকে না পেলে কষ্ট করবে। প্রতিকূল আবহাওয়াও তার কাজে বাধার সৃষ্টি করতে পারেনি। কিন্তু শেষ বয়সে তাঁর স্বামীর শরীরে বাসা বেধেছে নানা রোগ, এসব নিয়েই সে তাঁর কাজ করে যাচ্ছে। তাকে নিয়েই এখন আমার যত ভয়।

সিংহশ্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ উদ্দিন খান আলামিন জানান,পরেশের এমন মহৎ  কাজের সুখ্যাতি সবার মুখে মুখে। কিন্তু পরিবারটি খুবই হতদরিদ্র বিধায় তাকে আমি বিভিন্ন সময় সাহায্য করে আসছি। সামনে সরকারের সামাজিক কর্মসূচীতে তাঁর নাম অন্তর্ভূক্ত করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করব।
 

ট্যাগ: Banglanewspaper নদী মানবসেবা পরেশ মাঝি বছর