banglanewspaper

মাকসুদা সুলতানা ঐক্য ॥ কোটা নিয়ে এতদিন ধরে এতো তথাকথিত বোদ্ধাগণ এতো বেশী কথা বলে ফেলেছে আজ তাদের কথার জবাব না দিয়ে পারছিনা।
যারা ঢাকা শহরের উচু তলায় বসে এসির বাতাস খাইয়ে নিজের ছেলে মেয়েদের লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়াচ্ছেন অথবা শুধুমাত্র টাকার জোরে বিদেশে নিয়ে পড়াচ্ছেন তাদের মুখে কোটা নিয়ে কথা শুনে শুনে ঘৃণা ধরে গেছে।

মূলত এই ধনাঢ্য মানুষ গুলোই নিজেদের হীন স্বার্থে লক্ষ লক্ষ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে। আদতে তারা ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী এবং তাদের ঔরসে জন্মানো শিক্ষার্থীদদের সনন্বয়ে এলিট শ্রেনী বানানোর চক্রান্ত করেছে। 

আর মফস্বলে জন্ম নিয়ে  জেলা কোটায় ভর্তি হওয়া ঢাকা ইউনিভার্সিটির তথাকথিত মেধাবী গুলো বুঝতেও পারলো না যে, ওদের জীবন নিয়ে কি নোংরা খেলাটাইনা খেলেছে এলিট শ্রেনী।

এতো বছর থেকে ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী খুব সামান্য সংখ্যক শিক্ষার্থী ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পেতো। আর বাকী সিট গুলো ভরে যেতো জেলা কোটা দিয়ে, এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে, যারা ঢাকার বাইরে থেকে আসে তারা তো মেধার মাধ্যমেই আসে। হ্যা তারা অবশ্যই মেধা দিয়ে আসে যেহেতু ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যান্য জেলা কোটাধারীদের মতো বাড়তি সুযোগ ছিলনা আর দেশের অন্যান্য সকল জেলার কোটা গুলো পুরণ করা বাধ্যতামূলক ছিল ঠিক সে কারণেই ঢাকায় লেখা পড়া করা শিক্ষার্থীর তুলনায় কম মেধাবী শিক্ষার্থীরা জেলা কোটার সুযোগে ভার্সিটির বাকী সিট গুলো সহজেই পেয়ে যেতো। অথচ ওদের থেকে বেশী মেধা নিয়েও শুধু মাত্র সিট থাকেনি বলে ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়তে বাধ্য হতে হতো।

এবং এলিট শ্রেনীর সন্তানদের বেশী মেধা নিয়েও ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ বঞ্চিত হতো শুধুমাত্র জেলা কোটা, নারী কোটা সহ অন্যান্য কোটার কারণেই। এভাবে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শুধু কোটার কারণে বছরের পর বছর বঞ্চিত হয়ে যাচ্ছিলো ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী এলিট শ্রেনীর সন্তানেরা। এবং তাদের চোখের সামনে অজপাড়া গাঁয়ের কোন ছেলে এসে যখন বলতো যে, সে ঢাকা ভার্সিটি / বুয়েট বা ঢাকা মেডিকেলের স্টুডেন্ট তখন সেই এলিট বাবা যার সন্তান বাধ্য হয়ে প্রাইভেট ভার্সিটি / মেডিকেল / ইঞ্জিনিয়ারিং বা বিদেশে পড়তে পাঠাতে বাধ্য হয়েছে তখন তার কেমন গা জ্বলুনী টা জ্বলতো একবার ও কি সেটা ভেবে দেখেছেন ? 
এটা তো গেল শুধু শিক্ষা প্রসঙ্গ এবার আসি চাকরীর কথায়।

বাংলাদেশে সবাই তো আর সরকারী চাকরী করেণা অনেকেই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, ব্যাংক, বীমাসহ অন্যান্য প্রাইভেট সেক্টরে সরকারী চাকরী থেকেও চার পাঁচ গুন বেশী টাকা বেতনে চাকরী করে। আর এই চাকরী প্রাপ্তির বেলায় মামা চাচা খালু বাদ দিয়ে যারা যোগ্যতায় পদ পায় তাদের নিয়োগের বেলায় ও নিয়োগদাতারা আগে প্রার্থীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মূল্যায়ন করে। এবং এ ক্ষেত্রেও আবেদনের সময়ই যখন সার্টিফিকেট দেখে ঢাকা ইউনিভার্সিটি লেখা ঠিক তখনি তাকে ইন্টার্ভিউতে ডাকার সিদ্ধান্ত ফাইনাল করে ফেলে। অথচ সেই সার্টিফিকেটধারী দু'কলম ইংলিশ ট্রান্সলেট করতে দু'গ্লাস পানি খায় কিনা ভেবেও দেখেনা। অর্থাৎ তাদের ইন্টার্ভিউ বোর্ডে কল পাওয়াটা ১০০% কনফার্ম থাকে।

এরপর যোগ্যতা থাকলে পদ পায়, অন্যথায় সেকেন্ড অপশন হলো ঢাকা শহরের নামকরা প্রাইভেট ভার্সিটির সার্টিফিকেটধারীদের। এবং প্রাইভেট কোন ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরী দেয়া বা পাওয়ার প্রকৃত বাস্তবিকতা এটাই। জেলা কোটা সহ অন্যান্য কোটা বাদ হওয়ায় মফস্বলের শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ থেকেও বাদ পরলো।

এবার আসা যাক বিসিএস সহ সরকারী চাকরীর নিয়োগের কথায়। এখানেও কিন্তু ভার্সিটির সিটের মতো জেলা কোটা বাধ্যতামূলক থাকায় বাংলাদেশের যে কোন অঞ্চল থেকে আবেদন করলেই তার স্ব স্ব জেলা কোটা সহ অন্যান্য কোটা অনুযায়ী তুলনামূলক কম মেধা নিয়ে শুধুমাত্র নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট দিয়ে আবেদন করে ইন্টার্ভিউ তে কল পাওয়া যেতো। কিন্তু কোটা বাদ হওয়ার কার কতো বড় ক্ষতি হচ্ছে এটা তথাকথিত আন্দোলনকারীরা ভাবার সময় পায়নি! 

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ৬০% ছিল নারীদের দখলে এবার সেটাও গেলো, এসো আন্দোলনে বিজয়িনী নারীরা তোমাদের একটু মালা পরাই! তোমাদের অহংকারের দৌড় এতোই হয়েছিল যে, এতো বড় সম্মান কে অপমান বলে গভীর রাতে রাস্তায় নেমে পরলে!  হ্যা আমি নিজে নারী হয়েই বলছি ওটা কোন করুণা বা দয়া ছিলনা নারী কোটা ছিল মায়ের জাতের প্রতি সম্মান দেখানো এবং লেখা পড়া শেষ হলে স্বামীর ঘরে গিয়ে শুধু সন্তান জন্ম দেয়া আর চুলা ঠেলতে না হয়, যাতে সম্মানের সাথে শিক্ষকতা করে নিজে স্বাবলম্বী হতে পারো তার জন্য অনুকুল ব্যাবস্থা। না সেটাও তোমাদের সইলো না। আরো বেশী করে আন্দোলন করো কিন্তু যানবাহনে উঠে যেন আর লেডিস দখল করোনা, এমনকি লেডিট টয়লেট ই বা কি প্রয়োজন! তোমরা এতো ই মেধাবী হয়ে গেছো যে নারী বলে সম্মান দিলেও তোমাদের অপমান বোধ হয়!  এই হলো তোমাদের মেধার ধার! ছিঃ সারা বাংলার নারীদের তোমরা গুটি কতোক মেধাবী লেবাসধারী মূর্খের দল এভাবে বঞ্চিত করলে ! নারী হয়ে অন্য নারীদের জীবন নিয়ে খেললে শত সহস্র ধিক্কার জানাই তোমাদের মতো নির্বোধ নারীদের।

যারা বিভিন্ন জেলা শহর থেকে নিজেদের মেধাবী দাবী করে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে রাস্তায় নেমেছিল, তাদের জন্য এখন কেবল করুণা দেখানো ছাড়া কিছুই করার নেই। মফস্বলের তথাকথিত মেধাবীরা জানেই না যে, মফস্বলের কলেজ থেকে জিপিএ ফাইভ নিয়ে পাশ করে আসলেও ঢাকা শহরের যে কোন স্কুলের ক্লাস সিক্সের শিক্ষার্থীর শিক্ষা এবং মেধার জোরের সামনে মুখ থুবড়ে পরবে। সেখানে সরকারী চাকরী বা অন্য যে কোন চাকরীর লিখিত পরীক্ষায় কোন ভাবে পার হয়ে গেলেও ভাইবা বোর্ডে গেলে ঢাকার প্রার্থীর সাথে প্রতিযোগিতা করতে এক নদী পানি গলায় ঢেলেও কুল পাবেনা।

এবং অন্যান্য বিভাগীয় শহর গুলোর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা হবে। তবে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে এ মুহূর্তে কিছু বলছি না কারণ, মুক্তিযুদ্ধের স্ব-পক্ষের সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকিবে জাতীয় বীরদের কোন না কোন ভাবে সম্মানীত করবেই। বাকী প্রতিবন্ধি এবং উপজাতিদের ব্যাবস্থা হয়ে যাবে।

শেষ পর্যন্ত চরম নির্বুদ্ধিতা আর এলিট শ্রেনীর ষড়যন্ত্রে তথাকথিত মেধাবীদের আন্দোলনের ফলে সব দিক থেকে বঞ্চিত হবে জেলা কোটা এবং নারী কোটাধারীরা। এবার এলিটের সাথে মেধার যুদ্ধে টাকা জয়ী না মেধা জয়ী সেটা ই দেখার পালা।

 

লেখিকাঃ
সাংবাদিক,
মাকসুদা সুলতানা ঐক্য। 

 

 

 

 

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: banglanewspaper কোটা টাকা