banglanewspaper

ইমাম মেহেদী: নূতন সূর্য উদিত হচ্ছে। নতুন উদ্যমে আবহমান গ্রামবাংলার বুকে নেমে আসে পয়লা বৈশাখ। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, মাসের পর মাস গড়িয়ে আসে বাঙালির প্রাণের উৎসব, গানের উৎসব, রঙের উৎসব পয়লা বৈশাখ বা বর্ষ বরণ। উৎসবে উৎসবে আমদে আনন্দে বারোটি মাস পেরিয়ে চৈতী বিদায়ের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে বর্ষের।

বর্ষ বরণ উৎসব বা নববর্ষ উদযাপন একটি জাতির নিজস্ব সংস্কৃতির পার্বণ। তেমনি বাংলা নববর্ষ ও বৈশাখী বরণ উৎসব উদযাপন আবহমানকাল ধরে বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। পুরাতন বছরের জীর্ণ-শীর্ণ-ক্লান্ত রাত্রির অন্তিম প্রহর হল ঘোষিত। তিমির রাত্রি ভেদ করে প্রভাতী আলোয় পূর্ব দিগন্তে উদিত হয়ে আসে নতুন বছরে পয়লা বৈশাখের সূর্য।

প্রকৃতির নিঃশব্দ, নীরব, নিঃস্বর্গ, নিভৃতে মঞ্চে ধ্বনিত হলো নব জীবনের সংগীত। প্রকৃতি সাজলো নতুন সাজে। পত্রে পত্রে তার স্পন্দন, পুলকে পুলকে শিহরণ। গাছে গাছে পাখির কণ্ঠে নব বন্দনার গান। দিনের আলো শুরু হতে না হতেই আরম্ভ হয়ে যায় বর্ষ বরণের গান। পয়লা বৈশাখ বা বর্ষবরণ এর উৎপত্তি সম্বন্ধে বাঙালি ও বাংলা সাহিত্যের মধ্যে দু-ধরনের দুটি মতবাদ চালু আছে। প্রথমত প্রাচীন বঙ্গদেশের গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক তাঁর রাজত্ব কালে আনুমানিক ৫৯০-৬২৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন। তবে ধারণা করা হয় যে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সোমবার ১৪ এপ্রিল ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, মধ্যযুগে কৃষি ও ভূমি অর্থাৎ হাল চাষের পর ভূমি কর আদায় করা হতো ইসলামিক হিজরী বর্ষপঞ্জি অনুসারে। বাংলার মুঘল সম্রাট আকবর ১০/১১ মার্চ ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এই বর্ষপঞ্জিকা সংস্কার ও সংশোধনের উদ্যোগ নেন এবং সেই সময় যার নাম দেওয়া হয়েছিল ফসলী সন। তারপর সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের পর থেকে বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন গণনা শুরু হয়।

এই বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ একটি সৌর পঞ্জিকা ভিত্তিক বর্ষ পঞ্জিকা। তারপর বাংলা ১২টি মাসের নামকরণও করা হয়েছিলো নক্ষত্রমন্ডলে চন্দ্রের অবস্থানের বিশেষ বিশেষ তারার অবস্থানের উপর ভিত্তি করে। এবং ১২টি মাসের নামকরণ করা হয়েছিলো জ্যোর্তিবিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ ‘সূর্য সিদ্ধান্ত’ থেকে। পরে পর্যায় ক্রমে বিশাকা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠা থেকে জৈষ্ঠ্য, উত্তারাষাঢ় থেকে আষাঢ়, শ্রবণা থেকে শ্রাবণ, পূর্বভাদ্রপদ থেকে ভাদ্র, অশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, মৃগশিরা থেকে অঘ্রায়ন, পূষ্যা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, উত্তরাফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন, চিত্রা থেকে চৈত্র। তাছাড়া সপ্তাহের ৭টি দিনের নামকরণও করা হয়েছিলো সৌরমন্ডলের সদস্যের নাম অনুসারে। শুধু ৭টি দিনের মধ্যে সোম, নামটি নেওয়া হয়েছে সোম বা শিব থেকে। তাছাড়া রবি নামকরণ করা হয়েছে রবি বা সূর্য থেকে। এভাবে পর্যায়ক্রমে মঙ্গলগ্রহ থেকে মঙ্গল, বুধগ্রহ থেকে বুধ, বৃহস্পতি গ্রহ থেকে বৃহস্পতি, শুক্র গ্রহ থেকে শুক্র এবং শনি গ্রহ থেকে শনিবার।
 
শুরুটা যে কোন একভাবেই হয়েছিল। হয়তোবা জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ১৪ এপ্রিল থেকে অথবা বাদশা আকবরের সিংহাসনে বসার দিন থেকে সেটা বড় কথা নয়। আজকের এই বর্ষবরণ বা পয়লা বৈশাখ উদযাপন অনুষ্ঠান বাঙালি গ্রহণ করেছে অত্যন্ত নিখুতভাবে ও নিজের সংস্কৃতিকে মনে করেই। আজ পয়লা বৈশাখ, চৈতী বিদায়, বর্ষবরণ, হেমন্ত উৎসব, বর্ষার বারি, শ্রাবণও সন্ধ্যা, বসন্তের গান, শীত পার্বণ, বৈশাখ থেকে চৈত্র ১২টি মাস ও সপ্তাহের ৭টি দিনই হলো বাঙালির সৃষ্টি, কৃষ্টি ও নিজস্ব ঐতিহ্যের এক মহামূল্যবান সম্পদ। 
 

ট্যাগ: Banglanewspaper বৈশাখ চৈত্র শনি শুক্র বৈশাখী