banglanewspaper

সাবনাজ সিকদার : মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবো, সিরিয়ার অবস্থান ঠিক মাঝখানে। ছয় বছর আগে ৭২ হাজার ৪৮৯ বর্গমাইল আয়তনে ও ২ কোটি ৩১ লাখ জনসিংখ্যা অধ্যুসিত সিরিয়া ছিল মোটামোটি সমৃদ্ধ দেশ। যার চারপাশ ঘিরে ছিলো ইরাক, তুরষ্ক, লেবানন, ইসরাইল, ফিলিস্তিন, জর্ডান, মিশর, সৌদি আরব আর ইরান।

যুদ্ধ সেই প্রাচীন জুয়ারি, যে থামতে পারেনা। যতই হারে ততই আরো বড় বাজি সে ধরে। যতই তার জেতার ইচ্ছা ততই সে হারে। যতক্ষণ না সব হারায়, ততক্ষণ খেলারাম খেলে যায়। ঠিক তেমনি হয়েই চলছে সিরিয়ানদের সাথে। বিগত ৬ বছর ধরে হয়ে আসা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে ৮ লক্ষের বেশি সিরিয়ানদের হত্যা করা হয়েছে এবং এখনোও গণহত্যা চলছেই।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ কিভাবে শুরু হইলো, কারা চাপাইয়া দিলো, ও তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই বা কি ছিলো? তা ভেবে দেখলেও এই যুদ্ধ অবসানের কোন সম্ভাবনা নেই। সিরিয়ার প্রেসেডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যেমন শিয়া সুন্নির দ্বন্দ্ব আছে। তেমনি আছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও। এইসব দ্বন্দে রাশিয়া, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব প্রভৃতি জড়িত।

কোন যুদ্ধের ইতিহাস লেখা আমার বিবেচ্য নয়। তবে যুদ্ধের কারণে একটি দেশের শিশুদের জীবনে কি নির্মমতা নেমে এসেছে সে বিষয়টি তুলে ধরাই আমার এ লেখার লক্ষ্য। সিরিয়ার জনগনের সংগে আমাদের ভৌগলিক সীমারাখা নেই। তাতে কি আসে যায়! তারাও তো মানুষ! নিকট অতীতে বিশের কোটি কোটি মানুষ একাত্ন হয়ে কেঁদেছে শিশু আয়নালের
বাবা আব্দুল্লাহার সঙ্গে। আয়নালের মৃত্যু হয় তুরষ্কের উপকূলে। এই শিশুর ছোট্ট দেহটি বেঁচে থাকাকালীন সিরিয়ার
জনগনকে নাড়া দিতে না পারলেও তার মৃত্যুর পর সারা বিশের বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে সত্যিই নাড়া দিয়েছে।
আলেপ্পো জনবসতির সংখ্যা বিবেচনায় সিরিয়ার বৃহত্তম নগরী। কিন্তু চলমান এই যুদ্ধ সিরিয়ার এ প্রায় জীবনের
সব রুশ নাম করে দিয়েছে। শিশু হত্যা সেখানে প্রাত্যাহিক বোমা ও গোলা বর্ষণের নিশ্চিত ফল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আচ্ছা, এই যুদ্ধে কি শিশুদের কোন অপরাধ ছিলো? তাদের কিন্তু তেমন কোন অপরাধই ছিলনা। নাকি অপরাধ
একটাই, তারা সিরিয়ায় বসবাস করে। সেজন্যই কি তাদেরকে বলি হতে হচ্ছে।! প্রতিনিয়ত তারা হত্যা, সংঘাত,
আক্রমণ, বোমাবর্ষণ ও দুর্ভোগের মুখোমুখি হচ্ছে। সিরিয়ার প্রায় শহরগুলো এখন শিশুদের কবরস্থানের রুপ ধারণ
করেছে। এ অমানবিক ট্রাজেডির দায়ভার কার? আর কতদিন সিরিয়ার শিধুদের রক্ত ঝড়বে, প্রাণ হারাবে? র কেউ
তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপও করবে ন? বিশ্ববিবেক কখনো জাগবে?

শিশুদের উপর নির্যাতনের মাত্র কত হলে একটা শিশু সৃষ্টিকর্তার কাছে বিচারের দাবি করে! এ কেমন অন্যায়
অমানবিক অত্যাচার যেখানে একটি শিশুকে ভাবতে শেখায় মরে যাওয়াই ভাল। সাম্প্রতিক শুরু হয়েছে শিশুদের উপর
গ্যাস হামলা। এতে প্রায় সবাই মারা যাচ্ছে। আর যারা বেঁচে থাকছে তারা না বাঁচার মত। আবার তাদেরকে ভাবতেও
হচ্ছে কেন বেঁচে গেলাম, মরলেই তো ঠিই হত। বেহেস্তে তো আর খাবারের অভাব নাই। সাম্প্রতিক ঘটা এক সিরিয়
কিশোরি বোনের ত্যাগ স্বীকারের সাথে আমরা মোটামোটি সবাই পরিচিত। কিশোরি বোনটি দুধের বাচ্চা ভাইটিকে
কোলে নিয়ে আকাশপানে খোদার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ ততক্ষণে মরে গেছে প্রায়, কিন্তু তখনো একমাত্র গ্যাস
মাসকটা ভাইয়ের মুখে ধরা। যাতে ভাইটি অন্তত বাঁচে। কোমল বোনটি মাআ যাবে জেনেও অক্সিজেন মাসকটা নিজে না
নিয়ে ছোট ভাইটির মুখে লাগিয়ে রেখেছিলো, মরে যাওয়ার পরেও তার হাত সরেনি। মস্তিষ্কের তখনো ভাইটিকে
বাঁচানোর নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছিলো মেয়েটির হাতকে। 

একজন ক্ষুধার্ত মার কাছে তার ক্ষুধার্ত শিশুর করুণ মুখটা দেখা যে কতটা বেদনার তা শুধু সেই মাত্রই অনুভব করতে
পারে। খিদের জ্বালায় রাতে যখন কাদছিলো চার সিরিয় শিশু তখন তার মাকে বাধ্য হয়ে সংবাদপত্রের পাতা ছিড়ে জলে
ভিজিয়ে সন্তানদের খাওয়াতে হয়েছিলো শুধুমাত্র কান্না বন্ধ করার জন্য। আবার কখনো কখনো দিনের পর দিন
খাবার না পেয়ে ও খিদের জ্বালা সহ্য না করতে পেরে যখন সন্তান মাটি থকে খুটে খহুটে খাচ্ছে আবর্জনা, কিন্তু
তখন মা সেখানে কিছু না করতে পেরে নিরুপায়ের মত দেখে চলে সেই দৃশ্য। এ সবই ঘটছে পেটের দায়ে। এমন করুণ
বাস্তবতা কি মেনে নেওয়া যায়?

শিশুদের জন্য এমনকি স্কুলগুলোও নিরাপদ নয়। আবার অধিকাংশ শিশুদের হত্যা করা হচ্ছেস্কুলের ভিতরে এবং তার
আশপাশ এলাকা থেকে। শিশুদের আবার জীবন্ত কবরও দেয়া হয়েছে অনেক, এবং যখন নিষ্পাপ ও নিরাপরাধ শিশুরা
তাদের কবর ও শরনার্থী শিবির থেকে চিৎকার দিয়ে বলছে; আমাদের উদ্ধার করো, আমাদের নিরাপদে বসবাস
করতে দাও; তখন তাদের চিৎকার কারোও কর্ণগোচার হয়না।কারণ সবাই ছুটছে নিজের জীবনেরর নিশ্চয়তা
খুঁজতে।এই যুদ্ধে মৃত্যু না হলেও শিশু যদি দীর্ঘকাল যুদ্ধাতংকেই ঘুরপাক খায় তাহলে জীবনে নেমে আসতে পারে
বিপর্যয়। সিরিয়ার অনেক শিশু নিজের কিংবা বন্ধুর বাবা মায়ের মৃত্যু, স্কুল পুড়ে যাওয়া, ঘড়ছাড়া হওয়া বা এমন

কোন বড় ভীতিকর স্মৃতি নিয়ে বড় হচ্ছে। এমন দুঃসহ স্মৃতির প্রভাব পড়ছে শিশুর মনে। ফলে অনেক শিশুই সর্বক্ষণ
আতংকগ্রস্থ এবং তীব্র মানসিক চাপে ভুগছে। দ্রুত এই শিশুদের পাশে না দাঁড়ালে, তাদের সহায়তা না দিলে বড়
আকারের ক্ষতির সম্ভাবনা আছে।এর ফলে দেশটির পুরো একটি প্রজন্ম ভিন্ন রকমের মনোভাব নিয়ে বেড়ে উঠবে।
যা পরবর্তী জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। 

শিশুরা মর্ত্যের দুনিয়ার আসা একটুকরা স্বর্গ, বিশুদ্ধ মানবতার মন, প্রাপ্তবয়ষ্কদের মানবিক রাখার প্রেরণা।
তাদের হত্যা মেনে নিলে মানবতার ধ্বংস অনিবার্য।

 

লেখকঃ
সাবনাজ সিকদার
গণ বিশ্ববিদ্যালয়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: banglanewspaper সিরিয়া