banglanewspaper

মেহেদী হাসান মাসুম: পাহাড়ের চূড়ায় উঠে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখেনা এমন মানুষ খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে। সবার মাঝেই কিছু লুকায়িত স্বপ্ন থাকে। মানুষ ভেদে স্বপ্ন, ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। অনেকেরই ইচ্ছাকরে মেঘের রাজ্যে হারিয়ে যেতে। কেউ কেউ প্রাকৃতিক সৌন্দার্য্যরে লীলায় মিশে খুঁজে পায় নিজের স্বার্থকতা। আবার ছোটবেলায় অনেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা শিক্ষক হবার স্বপ্ন দেখলেও কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত আসতে আসতে তা পরিবর্তন হয়ে যায়।

তবে সমাজে এখনো অনেককেই খুঁজে পাওয়া যাই যাদের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে নতুনত্ব সৃষ্টি করা। সেজন্যই অদম্য নেশায় পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া মাউন্ট এভারেস্টে বাংলাদেশের পতাকাও উড়িয়েছেন এদেশের কয়েকজন। চিরচারিত স্বপ্নের পাশাপাশি কিছু মানুষের স্বপ্নই থাকে এমন ব্যতিক্রম কিছু করার। ঠিক তেমনই একজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম অভি। যার স্বপ্নজুড়ে কেবলই জলের নেশা।

বগুড়ার জলেশ্বরি তলার ছেলে রফিকুল ইসলাম অভির বাল্যকাল আর পাঁচটি গ্রামীণ ছেলের মতোই কাটলেও স্বপ্ন ছিল বিশাল । পুকুর কিংবা বাড়ির পাশে বিল ও নদীতে সাঁতার কাটা ছিলো অভির  নেশা। সময়ে অসময়ে ঝাঁপিয়ে পড়তো পানিতে । ছোট বেলায় এ দূরন্তপনা ও একমাত্র সন্তান হওয়ার  কারণে মা-বাবা কড়া শাসনে রাখতো তাকে। এমন অনেক দিন গেছে সাঁতার কাটতে না দেওয়ার জন্য কক্ষে তাকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।

২০০৭ সালে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সাঁতারে ব্যর্থ হন। এই ব্যর্থতাই তাকে সফলতার জন্য প্রেরণা জোগায়। কেননা এরপর থেকে পরিবারের কাছ থেকে আর বাঁধা আসে নি। সাঁতার যে শুধুমাত্র জীবন রক্ষার জন্য- এ ধারণা বদলে তিনি সাঁতারে ক্যারিয়ার গড়ার যে সুযোগ আছে তা সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। সেই থেকে ধরা বাঁধা স্বপ্নের বাইরে গিয়ে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন ।

২০১২ সালে তিনি ‘বাংলা চ্যানেল’ সাঁতার প্রতিযোগিতা সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপর থেকে তিনি ব্যাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করে। তিনি দীর্ঘ ৬ বছর পর ২য় রাবিয়ান হিসেবে ২০১৮ সালে ১৯ মার্চ বাংলা চ্যানেল পারি দিয়ে তিনি তার স্বপ্ন পূরণের যাত্রা শুরু করেন।

‘ষড়জ অ্যাডভেঞ্চার এন্ড এক্সট্রিম বাংলার’ আয়োজনে বাংলা চ্যানেলের আবিষ্কারকের স্মরণে ১৩ তম আসর অনুষ্ঠিত হয় গত ১৯ মার্চ। এতে অংশ নেয় ২৮ জন প্রতিযোগী। তাদের মধ্যে সফলভাবে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিতে পারে ১৮জন। এই ১৮ জনের মধ্যে রাবির অভি চতুর্থতম স্থান অধিকার করেন। ১৬ দশমিক ১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিতে তাঁর সময় লেগেছিল ৩ ঘন্টা ৫৬ মিনিট ৪ সেকেন্ড।

সফলভাবে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়া অভিই ছোটোবেলায় দৌড়াতে পারতেন না বলে গ্রামের প্রচলিত কোনো খেলাতেই তাঁকে খেলতে নিতো না। কিন্তু এখন তাঁর যে ফিটনেস; তিনি একটানা সারাদিনও দৌঁড়াতে পারেন। প্রতিদিন সকালে উঠে ৪/৫ কিলোমিটার দৌড়ানো তাঁর কাছে যেন অনেকটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। তিনি এই চ্যানেল পারি দেওয়ার জন্য দৈনিক ৪ থেকে ৫ ঘন্টা সাঁতারের অনুশীলন করতেন বলে জানিয়েছেন।

অভির অর্জনের পাল্লাটাও নেহায়েত খারাপ নয়। তিনি ২০০৯ সালে জাতীয় জুনিয়র সাঁতার প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জ ও আন্তঃবিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় সোনা জিতেন। ২০১০ সালে জুনিয়রে ২ টা রৌপ্যপদক ও আন্তঃবিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় আবারো সোনা জিতেন। ২০১১ তেও সেই অর্জন অক্ষুণœ রাখেন। ২০১২ তে ২টি সোনা জিতেন। ২০১৩ সালে জাতীয়তে ২ টা রৌপ্যপদক। ২০১৬ সালে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় ৭ টি স্বর্ণ, ৪ টি রৌপ্য ও ২ টি ব্রোঞ্জ জিতেন। ২০১৭ সালে ৫টি স্বর্ণ, ৪টি রৌপ্য ও ৬টি ব্রোঞ্জ জিতেন। এছাড়া তিনি ২০১০ সালে আন্তঃবিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় সাঁতার ক্যাটাগরিতে আগের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়ে নতুন রেকর্ড করেন। যা এখন পর্যন্ত কেউ ভাঙ্গতে পারেনি।

বগুড়ার আনসার অ্যাকাডেমির মাসুদ রানা তার সাঁতার প্রশিক্ষণের গুরু। অভি তার অর্জনের কৃতিত্ব অনেকখানিই দেন তার গুরুকে। সাঁতারকে অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে নেয়া অভি বলেন, ‘অ্যাডভেঞ্চার আমার কাছে একটা নেশার মতো। দৌড়, সাঁতার সবই করতে ভাল লাগে। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, নতুন যেকোন চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করি। কঠিন যেকোন একটা অ্যাডভেঞ্চারে সফল হতে পারলে মানসিক শক্তি অনেক বেড়ে যায়। জীবনে চলার পথে সবক্ষেত্রে সেটা কাজে লাগে।’

বাংলা চ্যানেলে সাঁতরানোর ব্যাপারে তিনি বলেন ‘বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিয়েছি সম্পূর্ণ আমার নিজের উদ্যোগে। সেখানে গিয়ে নিজের ভিতরে একাকিত্ব বোধ করছিলাম। সমুদ্রে সাঁতরানোর একটা সময় মনে হয়েছে আমি আর পারবো না। আমার সাথে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোচ থাকলে আমি আরো ভালো করতে পারতাম। আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পর্যাপ্ত সুবিধা দিলে আমি আমার স্বপ্নগুলোকে আরো মেলে ধরতে পারবো। কেননা এখন আমার স্বপ্ন ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া।’

২০০৬ সালের ১৪ জানুয়ারি বাংলা চ্যানেলের যাত্রা শুরু হয়। মূলতঃ এটি টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত ১৬.১ কিলোমিটার দীর্ঘ পানিপথ। এটির স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন প্রয়াত কাজী হামিুল হক। যিনি নিজেও একজন বিখ্যাত আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার ও স্কুবা ডাইভার এবং নানাবিধ অ্যাডভেঞ্চার এর সাথে জড়িত ছিলেন। তাঁর তত্ত্বাবধানেই প্রথম বারের মতো ফজলুল কবির সিনা, লিপটন সরকার এবং সালমান সাঈদ ২০০৬ সালে 'বাংলা চ্যানেল' পাড়ি দেন। এরপর থেকে প্রতিবছরই এই আয়োজন করা হয়ে থাকে এবং আস্তে আস্তে এটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পায়।

যার স্বপ্ন প্রখর সে সাময়িক ব্যর্থ হলেও একদিন ঠিকই সফল হয়। অভি ছোটবেলায় সাঁতারে ব্যর্থ হয়েই বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেবার সাহস করতে পেরেছে। এখন নতুন স্বপ্নের হাতছানি তার সামনে। আলোকরশ্মি যতই লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন। আলো বের হবার জন্য  যেখানেই ফাঁকা পায় ঠিক তার রশ্মি ছড়িয়ে দেয় বাইরের জগতে। তেমনই এক জলের আলোকরশ্মি অভি।

ট্যাগ: banglanewspaper নেশা সাতার