banglanewspaper

প্রফেসর ড. মাহবুবর রহমানকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সেরা প্রক্টর হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তিনি দুই দফায় প্রায় ৩ বছর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টরের মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সাথে পালন করেছেন। তার সময়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্জন রয়েছে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তম চতুর্থ সমাবর্তনের সফল আয়োজন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিক্রিয়াশীল শিবিরের রাজনীতি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, মাদক-সন্ত্রাস- জঙ্গীবাদ নির্মূলে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন, নির্ভেজাল ভর্তি পরীক্ষা গ্রহন ও যেকোন দূর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশাসনের জিরো টলারেন্স নীতিতে প্রত্যক্ষ ভুমিকা পালন করেন।

শিক্ষার সুস্থ্য পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সহ নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাসের অন্যতম রূপকার মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারীসহ অন্যান্য কর্তাব্যাক্তিদের অন্যতম সহযোগি হিসেবে তাকে আখ্যায়িত করা হয়। আন্তর্জাতিক করণের পথে ইবির যে পথচলা বর্তমান প্রশাসনের তিন কর্তাব্যাক্তির মাধ্যমে তার অন্যতম সহযোদ্ধা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সফলতম প্রক্টর প্রফেসর ড. মাহবুবর রহমান।

প্রক্টরের দায়িত্ব ছাড়াও ১৯৯৯ সালে ফলিত পদার্থবিজ্ঞান, ইলেক্ট্রনিক্স এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (বর্তমান ইইই) বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করার পর থেকে বিভাগের সভাপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ন হল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রভোস্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত সফলতার সাথে। সম্প্রতি তিনি কথা বলেন বিডিনিউজআওয়ারের সাথে। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন সাজু আহমেদ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি ও সফলতার কথা তুলে ধরেন তিনি। সাক্ষাৎকারটির বিশেষ অংশ তুলে ধরা হলো:

বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের হঠাৎ পরিবর্তনের হাওয়া এর পেছনে কারণ কী?

ড. মাহবুবর রহমান: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। হাটি হাটি পা পা করে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠটি চার দশক পার করেছে। দীর্ঘ চরাই-উৎরাই পার করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে দেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। এবং আন্তর্জাতিক করণের পথে এখন অনেকটাই এগিয়ে। আর পরিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া, ঠিক হঠাৎ কোন বিষয় নয়। প্রশাসনের দীর্ঘদিনের নিরলস পরিশ্রমের ফসল বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অগ্রযাত্রা। আর এর পেছনে অবশ্যই বড় ভূমিকা পালন করেছেন বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় ভিসি স্যারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তি।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে আধুনিক করে গড়ে তুলতে বর্তমান প্রশাসন কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করছে?

ড. মাহবুবর রহমানঃ দেখুন অবস্থানগত কারণে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় অনেকটাই মফস্বল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় আজ আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যলয় হিসেবে গড়ে ওঠার পথে। শিক্ষার সঠিক পরিবেশ আমরা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন ধরণের সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখতে পেরেছি, নিরাপদ নান্দনিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে সার্বক্ষনিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নতুন ও আধুনিক বিভাগ ও কোর্স চালু সহ নতুন ফ্যাকাল্টি ও হল নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রতিটি অনুষদ, হল সহ গুরুত্বপূর্ণ সকল ভবণ ওয়াইফাইয়ের আওতায় আনা হয়েছে। দেশী ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সেমিনারের আয়োজন করা হচ্ছে। প্রশাসনিক গতিশীলতার ফল স্বরূপ সেশন জট শুণ্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। দেশের পরিমন্ডলের বাইরে বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং আশাব্যঞ্জক সাড়া পাওয়া গেছে। বেশ কিছু বিদেশী শিক্ষার্থী এ বছর ভর্তি হয়েছে। আশা করছি আগামিতে এ সংখ্যা আরো বাড়বে।

এতদিন বিদেশী শিক্ষার্থী কেন ভর্তি হয়নি? এখন কেন হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?

ড. মাহবুবর রহমা্নঃ আসলে এতদিন নানা সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা বিদেশী শিক্ষার্থীকে আকৃষ্ট করতে পারিনি, কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের দীর্ঘ মেয়াদী নানামুখী উদ্যোগের ফলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি। সেশনজটমুক্ত নিরাপদ ও সুস্থ্য পরিবেশ আমরা শিক্ষার্থীদের উপহার দিতে পেরেছি। শিক্ষার এই সুষ্ঠু পরিবেশই মূলত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করেছে।

প্রক্টর হিসেবে এবং অন্যান্য পদে দায়িত্ব পালনে আপনি কতখানি সফল বলে মনে করেন?

ড. মাহবুবর রহমা্নঃ নিজের সফলতা নিজের মুখে বর্ণনা করা শক্ত। তবুও কিছু কথা না বললে নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রভোস্টের দায়িত্ব পালনকালে প্রবল আপত্তির মুখে জাতির পিতার ম্যুরাল ও বাংলাদেশের মানচিত্র স্থাপন আমার প্রথম সফলতা। দ্বিতীয়তঃ নিরাপত্তা ব্যায় যেকোন সময়ের চেয়ে কম অথচ সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পরিবর্তনের কথা বলছেন এ পরিবর্তন হঠাৎ কিংবা আলাদিনের চেরাগের মত দূর্দৈবক্রমে আসেনি। দীর্ঘ ১৬ বছর ইবিতে সমাবর্তন আয়োজন করা সম্ভব হয়েছিল না, বর্তমান প্রশাসন সে পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে এবং অত্যন্ত সফল, সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের আয়োজন আমরা করতে সমর্থ হয়েছি।

ইবির ঐতিহাসিক চতুর্থ সমাবর্তনে মহামান্য রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে একটি ভাল মানের আয়োজন সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। প্রতিক্রিয়াশীল হিংস্র রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছাত্র শিবিরের রাজনীতি বর্তমান প্রশাসন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে সামর্থ হয়েছে। ফলে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রয়েছে। এছাড়া গত এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন ধরণের সহিংস ঘটনা ঘটেনি। এর ফলে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনণগুলো নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে। ক্যাম্পাসে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা আমরা করতে সক্ষম হয়েছি।

হলে হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা প্রদান ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্বিঘ্নে হলে ওঠার পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছি। বহিরাগত ও অযাচিত অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে আমরা সমর্থ হয়েছি। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো ক্যাম্পাস সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহন করেছি, ফলে অপরাধের মাত্রা কমে এসেছে। ক্যাম্পাসে শোভা বর্ধনে ফোয়ারাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল “মৃতুঞ্জয়ী মুজিব” স্থাপন করার মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পেরেছে।

জাতীয় ও অন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া অনুষ্ঠানের বেশ কটি সফল আয়োজন আমরা করেছি।  দেশের সর্ববৃহৎ মাদক-সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদ বিরোধী র‌্যালি হয়েছে, হলে হলে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য সেমিনার, আলোচনা সভা অব্যাহত রয়েছে।  বিভিন্ন জাতীয় উৎসবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এখন আগের চেয়ে অনেক নিরাপদ ও বর্ণিল।
 
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের তৎপরতা বন্ধ করতে এতো সময় লাগার কারণ আসলে কী?

ড. মাহবুবর রহমা্নঃ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলে দীর্ঘদিন প্রতিক্রিয়াশীলতার চর্চা হয়েছে। আমি দায়িত্ব নেবার পর থেকে তাদের অপতৎপরতা বন্ধ করার দিকে মনোনিবেশ করেছি।যেহেতু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু ইসলামী বিভাগ চালু রয়েছে ফলে বিপুল সংখ্যক মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। তারা এখানে এসে শিবিরে জড়িয়ে পড়েছে এমন নয়, আগে থেকেই শিবিরের রাজনীতিতে যুক্ত ছিল অনেকেই।

তাই শিবির মুক্ত করতে প্রশাসনকে অনেক কৌশলি হতে হয়েছে।জঙ্গি বিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচি, সুস্থ্ ধারার সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের হল প্রশাসনের মাধ্যমে সিট বরাদ্দ প্রভৃতি কার্যক্রম হাতে নেবার মাধ্যমে শিবিরের রাজনীতি বন্ধ হয়েছে। এছাড়া নতুন নতুন বিভাগ চালু করার মাধ্যমে অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী ভর্তি হবার ফলে মাদ্রাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থীর অনুপাত কমে এসেছে। ফলে বড় ধরনের সহিংস ঘটনা ছাড়াই প্রশাসনিক তৎপরতায় আমরা শিবিরের রাজনীতি বন্ধ করতে সমর্থ হয়েছি। এখানে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের ভূমিকাও প্রশংসনীয়।

একটু অন্য প্রসঙ্গ। আপনাকে অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মরা গাছের প্রক্টর বলে রসিকতা করে, কারণ কী?

ড. মাহবুবর রহমা্নঃ আসলে বিষয়টি রসের ছলে কেউ কেউ বলে। মূলতঃ কতৃপক্ষ আমাকে প্রধান করে ক্যাম্পাসের মরা গাছ সংরক্ষনের একটি কমিটি গঠন করেন। আমি স্টেট ও প্রকৌশল অফিসের সহায়তায় মরা গাছ কেটে ডাল ও ছাল বিক্রি করে লেবার-মিলের খরচের পরও অতিরিক্ত অর্থ ও বিপুল পরিমাণ কাঠ জমা করি।  পরবর্তিতে উপাচার্য মহোদয়ের অনুমোদনে যা বিভিন্ন বিভাগ-লাউঞ্জ-ক্যাফে-অফিসে নানা ধরনের দৃষ্টি নন্দন, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র তৈরীর কাজে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এখনো করা হচ্ছে। উদ্বৃত অর্থে ক্যাম্পাসে লিচু বাগান করেও বাঁকি অর্থ কোষাগারে জমা দেয়া হয়েছে। ইবির ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল বলে অনেকে রসিকতা করে বলে থাকতে পারে।

বর্তমান প্রশাসন এত অল্প সময়ে সর্বমহলে গ্রহনযোগ্য হওয়ার মূল কারন কি?

ড. মাহবুবর রহমানঃ নির্ভেজাল ভর্তি পরীক্ষা গ্রহন, যেকোন দূর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশাসনের জিরো টলারেন্স নীতি এবং মাননীয় উপাচার্য- উপ উপাচার্য- ট্রেজারার মহোদয় ব্যাক্তিগত এজেন্ডা নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকে মুখ্য মনে করাই বর্তমান প্রশাসন সর্বমহলে গ্রহনযোগ্য হওয়ার মূল কারন হিসেবে আমি মনে করি।

যদি ব্যর্থতার কথা বলতে হয়?

ড. মাহবুবর রহমা্নঃ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করতে গেলে প্রক্টরিয়াল বডিকে নানা ধরণের প্রতিকূলতার সম্মুখিন হতে হয়, অপরাজনীতির শিকার হতে হয়। তবুও আমি চেষ্টা করেছি বিতর্কের উর্ধে থেকে নিজ দায়িত্ব পালন করতে। আমি মনে করি আমার উপর প্রশাসন যে আস্থা রেখেছে সততা, নিষ্টা, স্বচ্ছতা ও কর্মদক্ষতা দিয়ে আমি তার প্রতিদান দেবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। যদিও মাঝেমাঝে সেটি আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদক মুক্ত ক্যাম্পাস ঘোষণা এখন বড় চ্যালেঞ্জ, যা পুরোপুরি অর্জনে সফল হতে পারিনি। তবে চেষ্টা অব্যহত রয়েছে,এক্ষেত্রে সকলের সহায়তা জরুরী।

স্যার মুল্যবান সময় দেবার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

ড. মাহবুবর রহমানঃ আপনাকেও ধন্যবাদ।

ট্যাগ: Banglanewspaper ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়