banglanewspaper

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার :

 

তখন আমি মাত্র কৈশরে পা রেখেছি, অধ্যয়ন করছি উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে। তখন কাজ করতাম জেলা শহর থেকে প্রকাশিত স্থানীয় একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায়। তাই আমার সহপাঠী ও অন্যান্য সমবয়সীদের চেয়ে আমি একটু বেশি সচেতন ছিলাম। নিয়মিত ক্লাসে যেতাম বাড়ি থেকে ১০ কিলোমিটারের চেয়েও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে আমাকে ক্লাসে উপস্থিত হতে হতো। মাঝে মাঝে যানবাহনের শ্রমিকদের অশোভনীয় আচরন ও অন্যায়ের শিকার হয়ে একদম অতিষ্ঠ হয়ে যেতাম। 

একদিন ভাবলাম এ ব্যপারে আমরা প্রশাসনের সহযোগীতা নিলেই তো পারি। তাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর একটি অভিযোগপত্র লিখেই ফেললাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য ক্রমে সেদিন নির্বাহী অফিসার অনুপস্থিত ছিলেন। তাই অভিযোগটি থানা পুলিশের ওসির কাছেই নিয়ে গেলাম। থানায় গিয়ে সালাম দিয়ে ওসির রুমে প্রবেশ করতেই তিনি আমার দিকে উল্টো চোখে তাকালেন। মূহুর্তেই আমার উপর চটে গেলেন। 

আমাকে বললেন, তুমি কার অনুমতি নিয়ে এ রুমে ডুকলে? তোমার কাঁধেও একটি ব্যাগ, তুমি তো নাশকতা করার জন্যও আসতে পারো। এরপর ওসি সেন্টিকে ডাকে জোরালো ভাবে একাটা ধমক দিয়ে বললো এসব লোক কিভাবে সরাসরি আমার রুমে চলে আসে খেয়াল করো না? বসে বসে কি করো? এরপর সেন্টি আমাকে বের হয়ে যেতে বললো। আমিও কোন প্রতিক্রিয়া না করে বের হয়ে চলে আসলাম।

সেখান থেকে বের হয়েই খুবই উদ্ধিগ্ন অনুভব হলো, প্রচন্ড অপমানিত ও লজ্জিত বোধ হতে লাগলো। তখন নিজেকে মানুষ ভাবতেই বিবেক বার বার বাধা প্রদান করছিলো। সেদিন আমি জীবনে প্রথম কোন অভিযোগ নিয়ে থানায় গিয়েছিলাম। তারাও খুব ভালো করে আমায় সেবা দিল। 

শেষ পর্যন্ত আমার অপমানজনক মূহুর্ত গুলো প্রকাশ করতে বিশ^স্ত একজনের কাছে গেলাম। আমার সবকিছু শুনে তিনিও একটি দীর্ঘ শ^াস ফেললেন। এরপর বললেন তুমি যদি তখন কোন প্রতিক্রিয়া করতে ঠিকই তারা তোমাকে নাশকতাকারী অথবা মাদক ব্যবসায়ী বানিয়েই ছাড়তো। এগুলো করা তাদের বাণিজ্য। এরপর বড়দের আর শিক্ষকদের আমি ধিক্কার দিতে লাগলাম। কারণ এর আগে পুরো জীবনটা তারা আমাকে কেন মিথ্যা শিক্ষা দিল।

এর আগে আমি যতটুকু শিখে এসেছিলাম তা হলো ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কাজই হলো সাধারণ মানুষের সেবা করা। পুলিশ হলো মানুষের বন্ধু, তাদের কাজই হলো যে কোন বিপদে মানুষের পাশে দাড়ানো। জনগনের দেওয়া করের টাকা থেকেই রাষ্ট্র তাদের বেতন ভাতা প্রদান করে’। কিন্তু আজ তো আমি বাস্তব ও উচিত শিক্ষাটি পেলাম। আমাদের এ জনপদে বহু মানুষ অনাহারে থাকে। প্রশান্তিতে একটু ঘুমাবার স্থান নেই এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। দুর্যোগ প্রবণ এলাকা হওয়া প্রতিনিয়ত এ জনপদের মানুষ অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা, বন্যা, ঘুর্ণিঝড় সহ বহু প্রকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করে। তখনও প্রজান্ত্রের কর্মচারীদের বেতন ভাতা বন্ধ থাকে না। দুর্যোগ উপলক্ষে কোন সুযোগ-সুবিধাও স্তব্দ করা হয়না। আর সে কর্মচারীরাই প্রতিনিয়ত দুর্নীতি, অন্যায় সহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে অমানবিক ব্যবহার ও অত্যাচার করে। 

তাদের বিরুদ্ধে কারো কথা বলারও সাহস নেই। যারা অবৈধ ভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে তারাই পরোক্ষভাবে জনগনের জনতার সে সাহস কেড়ে নেয়। স্তব্দ করে দেয় জনগনের স্বাধীন ভাবে কথা বলার অধিকার। খুন, ধর্ষণের মত অত্যাচারের বিচারও হয় ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছা অনুযায়ী। এমনও ভয়ঙ্কয় মূহুর্তও এ জনপদের এ জনপদের মানুষের জন্য আসে, যে অত্যাচারিত হয়ে দু’ফোটা অশ্রুও ঝরানো যায় না। হাসতে হয় খিল খিল করে। 

আমরা কি ‘সভ্য’ জনপদের বাসিন্দা, বাসিন্দা বললেও ভুল হবে। এটিকে বলতে হবে বসবাসকারী। কারণ বাসিন্দাদের কিছু অধিকার থাকে আর বসবাসকারীরা পায় মাত্র একটু করুণা। আমৃত্যু যে এ দেশে আমাদের পায়ের তলায় মাটি আছে তার জন্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা দরকার। সেদিনই আমি এর আভাস পেয়েছি!
মাঝে মাঝে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের কেউ কেউ পুলিশ, আমলা, সরকারি দলের নেতা ও বিভিন্ন মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে। কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে যিনি থাকেন তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কেউ রাখে না। অথচ তার ইশারায় করা হয় সকল প্রকার বৃহৎ অত্যাচার গুলো। আমরা বুঝতেও পারিনা কে কেড়ে নিল স্রষ্টা কতৃক দানকৃত আমাদের সাহস। কোন অসভ্য রাণীর দেশে আমরা বাস করছি? কি আছে তার মাঝে? যে আমাদের সাহসও কেড়ে নিল? হে আল্লাহ, আমাদের সাহস দাও, এক্ষুণি দাও, তাড়াতাড়ি দাও!

লেখক: কবি, সাংবাদিক ও উপস্থাপক

 

 

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: banglanewspaper আল্লাহ