banglanewspaper

লেখা: শামিমা হ্যাপী
ছবি: রফিক মাসুম


ঢাকার নাগরিক জীবনের  যন্ত্রণা থেকে আমাদের একটু মুক্তি পাওয়ার আকুতির কোন শেষ নেই, ঢাকার ছোট বড় পার্ক, বিনোদন কেন্দ্রে, কিংবা কোন কৃত্রিম লেকের ধারে প্রতিদিন হাজার হাজার শহুরে মানুষ ছুটে যায় একটু কনক্রিটের কঠিন জীবন থেকে মুক্তি পেতে কিন্তু  সেখানেও মুক্তি মেলেনা জনসংখ্যায় ঠাসা ঢাকার নগর জীবন থেকে।

এই কঠিন নগর জীবন থেকে থেকে একটু মুক্তি পেতে এবং প্রকৃতির অতি কাছে যেতে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন মিরপুরের ন্যাশনাল বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে। এটি ঢাকার মিরপুরে চিড়িয়াখানার পাশে অবস্থিত। ১৯৬১ সালে প্রায় ২০৮ একর (৮৪ হেক্টর) জায়গা জুড়ে নয়নাভিরাম উদ্যানটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

শীত কিংবা  অন্য ঋতুতেও  বোটানিক্যাল গার্ডেন বেশ সজীব ও সবুজ কিন্তু  বর্ষার শুরুতে  যেন একেবারে নবযৌবনা। সবুজ পল্লবে, কৃষ্ণচূড়া, হিজল - জারুলে যেন চারদিকে শুধু সুন্দরের পসরা সাজিয়ে বসে আছে প্রকৃতি। পুকুরে পুকুরে শাপলা -কচুরি কিংবা দূরন্ত বালকের গাছ থেকে পানিতে লাফালাফি আপনাকে বাল্যকাল স্মরণ করিয়ে দিবে। রয়েছে উঁচু উঁচু টিলা ও রাস্তা। যেন পাহাড়ের দেশ। 

প্রবেশপথেই চোখে পড়বে ফুল বাগান এখানে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল রয়েছে যা দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে, সৌন্দর্য পিপাসু মনকে ভুলিয়ে দিবে নাগরিক জীবনের গ্লানি, যন্ত্রনা। দুই পাশে নান্দ্যনিক দুটি পুকুর। পুকুরের পাড়ে অনেকেই আয়েশ করে বসে গল্প করছেন আপন মনে, যেন কোন গ্রামিণ পুকুরপাড়ে বসে আছে্ন, করছেন খোশ আলাপ। আপনি যে পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল ব্যস্ত নগরীর মধ্যে আছেন তা ভুলে যাবেন। বালকেরা এখানে একটু গরমের স্বস্তি পেতে গাছ থেকে পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি করে আনন্দ উপভোগ করে। আর এ দৃশ্য আপনাকে ছেলেবেলার দস্যিপনার কথা স্মরণ করিয়ে দিবে।

প্রতি বছর সাধারণ উদ্ভিদপ্রেমীসহ শিক্ষা ও গবেষণা কাজে এ উদ্যান পরিদর্শনে আসেন প্রায় ১৮ লাখ লোক। বর্তমানে ১৩৪ উদ্ভিদ পরিবারভুক্ত ১১০০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে উদ্যানে। এগুলোর মধ্যে ৩০৬ প্রজাতির ৩৩ হাজার ৪১৩টি বৃক্ষ, ২০১ প্রজাতির ১৩ হাজার ৯২টি গুল্ম, ৪৪১ প্রজাতির ২০ হাজার ৭৪৬ বিরুত্ ও ৬২ প্রজাতির ১ হাজার ১৯০টি লতা জাতীয় গাছ আছে। সদর রাস্তা ধরে একটু সামনে এগোলেই পাওয়া যাবে অস্ট্রেলিয়ার সিলভার ওক, জাকারান্ডা ও ট্যাবে বুইয়া, জাপানের কর্পূর, মালয়েশিয়ার ওয়েল পাম, থাইল্যান্ডের রামবুতাম। রাস্তার দুই পাশে রয়েছে দেবদারু ও অস্ট্রেলিয়া থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন প্রজাতির ইউক্যালিপটাসের সমারোহ। চৌরাস্তা থেকে উত্তরের রাস্তা ধরে এগোলে আছে কর্পূর, ম্যাগনোলিয়া, শ্বেত চন্দন, গিলরিসিডিয়া, ফার্ন কড়ই, তুন, কেশিয়া নড়ুসা, ট্যাবেবুইয়া ও চেরি গাছ। এখানে আছে ক্যাকটাসের এক বিশাল সংগ্রহ চোখে পড়বে। আরও দেখা যাবে ওল্ডম্যান, ফিশহুক ক্যাকটাস, ম্যামিলারিয়া, ক্ষেপালিয়া, মেলো ক্যাকটাস, গোল্ডেন ব্যারেল, সিরিয়াম হেক্সোজেনাস, র্যাট টেইল, আপাংসিয়া সিডাম, হাওয়ার্থিয়া, পিকটোরিয়া রাখা হয়েছে স্বচ্ছ কাচঘরে। উদ্যানের গোলাপ বাগানের ভেতর শান বাঁধানো জলাধারে আছে ব্রাজিলের জলজ উদ্ভিদ আমাজান লিলি। অফিস আঙিনা ঘেঁষে আছে নেট হাউস ও নার্সারি। রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির চারা, বিক্রিও করা হয়। উদ্যানের অফিস এলাকার পশ্চিম পাশে অর্কিড হাউস। সঙ্গেই রয়েছে অ্যামহাসটিয়া অ্যাভোকাডো, বেগুনি এলামান্ডা, থাইল্যান্ডের গন্ধরাজ। গর্জন বাগানের উত্তর পাশে ভেষজ উদ্ভিদ বাগান। কালো মেঘ, তুলসী, আতমোরা, শতমূলী, পুনর্নভা, থানকুনি, কুমারি লতা, বাসক, বচসহ আছে হরেক ভেষজ উদ্ভিদের সংগ্রহ। 

বাঁশ ও বেতের বাগান:
বোটানিক্যাল গার্ডেনের মাঝ বরাবর রয়েছে একটি বিশাল বাঁশ বাগান। এখানে রয়েছে দেশী বিদেশী ২২ প্রজাতির বাঁশ ও ঘন বেত গাছ।  বাশ বাগানে একটু দাঁড়িয়ে অনেকেই গ্রামীণ আবহ  খুঁজে পাবেন। মন প্রাণ শীতল হবে বাঁশ বাগানের স্নিগ্ধ হাওয়ায়। পাশেই রয়েছে শাপলা পুকুর। বিভিন্ন প্রজাতির শাপলা বোটানিক্যাল গার্ডেনের শোভা যেমন বাড়িয়েছে তেমনি দর্শনার্থীদের জন্য এ যেন হারিয়ে ফেলা গ্রামীণ জীবণ। এটাই তো প্রতিনিয়ত খুঁজে ফেরে নাগরিক জীবনে অতিষ্ট মানুষগুলো।

তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়েঃ শপিং মল কিংবা বিনোদন কেন্দ্রে্র আর্টিফিশিয়াল তাল গাছ দেখে দেখে যখন বিষিয়ে উঠেছে মন , তখন এখানকার সুবিশাল তাল ও পাম বাগানে ঢুকলে আপনার মন আর বাহিরে ফিরে যেতে চাইবেনা। সারি সারি তালগাছ দেখে ছেলেবেলার তাল কুঁড়ানোর দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দিবে।

গোলাপ বাগান:
এখানে রয়েছে একটি সুবিশাল গোলাপ বাগান। এখানে রয়েছে প্রায় ২০০ প্রজাতির গোলাপ। গোলাপের সৌরভ ও সৌন্দর্য আপনার যৌন্দর্য পিপাসু মনকে ভরিয়ে রাখবে। পাশেই রয়েছে  সুবিশাল বিনোদন কেন্দ্র। ছেলে-মেয়েদের উদ্ভিদ চেনানোর পাশাপাশি প্রকৃতির ভেতরে একটু পরিচিত বিনোদনও দিতে পারবেন।

অনিন্দ্য নাগলিঙ্গমের টানে:
রঙিন ও বিশাল এক উদ্ভিদের নাম নাগলিঙ্গম। এর ফুলগুচ্ছ দেখতে সাপের মতো। তাই এই নাম নাগলিঙ্গম। অন্যরা ফোটে গাছের শাখায়, আর এই ফুল কাণ্ড ফুঁড়ে ছড়ার মতো বের হয়। বর্ষায় ফুলভর্তি গাছ দেখলে অনেকেরই মনে হতে পারে,  কেউ বুঝি গাছের কাণ্ড ফুটো করে ফুলগুলোকে গেঁথে দিয়েছেন।বিশাল লম্বা গাছের নিচে পড়ে থাকা ফুল  মনে হবে যেন ফুলের বিছানা। জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে নাগলিঙ্গমের সঙ্গে দেখা। ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে গাছের কাণ্ড। ছয়টি পাপড়ি মেলে যেন সাপের ফণার মতো উদ্যানের দর্শনার্থীদের দিকে তাকিয়ে। গাঢ় গোলাপি আর হালকা হলুদ রঙের মিশ্রণ শরীরে। উদ্যানের বিদেশি বৃক্ষের সারিতে পরপর দুটি নাগলিঙ্গমেই ফুল ফুটেছে। ফুলের পাশেই ঝুলছে ফলগুলো। তবে গোল জাম্বুরার মতো দেখতে এর ফলগুলো দেখলে অবাক হতে হয়। ফলগুলো কামানের গোলার মতো দেখতে বলেই ব্রিটিশরা এর নাম দিয়েছে ক্যাননবল।  হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শিবপূজায় নাগলিঙ্গম ফুল ব্যবহার করেন।

গাছ চেনা ও  আনন্দ নেওয়া:
জাতীয় উদ্ভিদ  উদ্যান বা বোটানিক্যাল গার্ডেন একদিকে যেমন একটি নির্মল বিনোদন কেন্দ্র, অন্যদিকে ছোটদের বিভিন্ন গাছের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে এখানে যেতে পারেন। বর্তমানে গ্রামেও আর সব গাছের দেখা মেলেনা, কিন্তু এখানে যেহেতু গাছ সংরক্ষণ করা হয় তাই সব ধরণের গাছের দেখা মেলে আর এসব গাছে্র সাথে পরিচিত হলে ছেলেমেয়েদের প্রকৃতি বিষয়ক জ্ঞানের পরিধি বেড়ে যাবে।   এ ছাড়াও দেখা মিলবে একেবারে প্রাকৃতিক কোন জীবজন্তু যা সহসা সেখা মেলেনা শহুরে জীবনে।

পাশেই বেঁড়িবাঁধ ও গ্রামিণ খাবার:
বোটানিক্যাল গার্ডেনের পশ্চিম গেট দিয়ে বের হলেই তুরাগ নদী ও নদী রক্ষাকারী বেঁড়িবাঁধ।এখানকার পানি অনেকটায় স্বচ্ছ তাই নৌকায় ঘুরাঘুরি করে মজা পাবেন। আর বাঁধের পাশে ছোট বড় বশ ক’টি বাংলা খাবারের  হোটেল রেস্টুরেন্ট রয়েছে যেখানে হরেক পদের ভর্তাভাত ও দেশী মাছের স্বাদ। অত্যন্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে গ্রামিণ খাবার খেয়ে মন ভরে যাবে।

পরিবেশ ও নিরাপত্তা:
এক সময় বোটানিক্যাল গার্ডেনে প্রবেশ করা যেতনা বিভিন্ন প্রকারের হকার, বাটপারদের কারণে। কিন্তু বর্তমানে এর পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। রয়েছে প্রশাসনের বেশ কড়াকড়ি। নেই কোন হকারের হাকডাক অত্যাচারে। তবে এর ভেতরে কোন খাবারের দোকান নেই তাই এখানে দীর্ঘসময় কাটানোর জন্য বাসা থেকে খাবার ও পানীয় সংগে আনতে পারেন।  

যাতায়াত ব্যবস্থা অত্যন্ত সহজ, ঢাকার সব যায়গা থেকেই চিড়িয়াখানায় নিয়মিত বাস চলাচল করে থাকে।ন্যাশনাল বোটানিক্যাল গার্ডেন সপ্তাহে সাত দিনই খোলা থাকে। 

তাই আজই ঘুরে আসতে পারেন মনোমুগ্ধকর ন্যাশনাল বোটানিক্যাল গার্ডেনে।

 

 

 

ট্যাগ: banglanewspaper