banglanewspaper

মজিবুর রহমান, কেন্দুয়া (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি: নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে মাছুয়াইল বিলে কয়েক শতাধিক একর বোরো ফসল তলিয়ে নিমর্জিত হয়েছে।

প্রতিবছর এভাবে ওই বিলপাড়ের কৃষকদের সীমাহীন ক্ষতিগ্রস্থ্য হলেও তাদের দুঃখ-দুর্দশা দেখার যেন কেউ নেই। এবার বোরো মৌসুমে কৃষি কর্তার দেখা পেলেন না এখানকার কৃষকরা। টানা ফসল হারিয়ে কৃষকেরা দিশেহারা। মাত্র এক কিলোমিটার খাল খনন করা হলে হাজারো কৃষক পরিবারে মুখে হাসি ফুটতো।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টির পানিতে থৈ থৈ করছে বোরো ফসলের মাঠ। পানির নিচে বোরো ধান মুক্তার দানা ন্যায় জ্বলমল করছে। বহু ফসলী জমি কচুরীপানায় ঘিরে ফেলেছে। কেউ কেই কোমর ও বুক পানিতে ভিজে তাদের কষ্টার্জি স্বপ্নের ফসল পানির নিচ থেকে সংগ্রহ করতে দেখা যায়। অনেকেই শ্রমিক সংকটে তাদের ফসল তলিয়ে যাওয়ায় আশা ছেড়ে দিয়েছেন।

উপজেলা কৃষি অফিসের কোন কর্তা ব্যক্তির বোরো মৌসুমে এলাকায় না যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এলাকাবাসী। কৃষকেরা আরো জানায়, গত বছর অকাল বন্যায় ফলে দেশীয় জাত ধানের বীজ পর্যন্ত সংগ্রহ করতে পারেননি। এবছর তাই হয়েছে।

কেন্দুয়া উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে প্রায় ১০/১২ কিলোমিটার দুরে এ বিলটি অবস্থান। বিলের সিংহভাগ অংশটি পড়েছে উপজেলার রোয়াইলবাড়ি ও সান্দিকোণা ইউনিয়নের সীমানায়। বাকি সামান্য অংশটুকু পাশ্ববর্তী ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ি ইউনিয়নের সীমানায় পড়েছে।

এই বিলপারের রোয়াইলবাড়ি ইউনিয়নের কৈলাটি, ফতেপুর, দ্বিগর ও সান্দিকোনা মোকন্দাবাদ, হারারকান্দি, বিরামপুর এবং আঠারবাড়ি ইউনিয়নের স্ত্রীদেবপুর, রায়পুর, বাগড়াসহ আশপাশের আরো কয়েকটি গ্রামের হাজারো কৃষকের বোরো ফসলের একমাত্র অবলম্বন হলো এই মাছুয়াইল বিল (হাওড়)। বিলের সাথে সংযুক্ত বেতাই নদীসহ কয়েকটি খাল দিয়ে উজানের পানি এ বিলে নির্ঘিত হয়। আর একটি মাত্র রঙ্গিখাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন হয়। ফলে বর্ষা মৌসুমে কিংবা আগাম বন্যায় পানি সময়মত নিষ্কাশন না হওয়ায় এই দুর্যোগের কবলে পড়েন এলাকার কৃষকেরা। 

এদিকে পানি নিষ্কাশনের রঙ্গিখালী খালটিতে পলি জমে বিলের চেয়ে উচুঁ এবং পাশ্ববর্তী কাকিনা বিলের অংশটুকু দখল হওয়ায় কয়েক বছর ধরে শুকনো মৌসুমেও এই বিলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। যার কারণে এখন আর আগের পুরো বিলে বোরো আবাদ করা সম্ভব হয় না। 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, কৃষকদের আর্তনাদ ও তাদের দুঃখ দুর্দশার কথা কেউ শুনেন না। এই বিলের সমস্যা-সম্ভাবনাসহ রঙ্গিখালী খালটি খননের দীর্ঘদিন ধরে দাবী জানিয়ে আসছে এলাকাবাসী কিন্তু কোন মহলেই তা কর্ণপাত করছেন না। এ বিল এলাকার কৃষকের দুর্দশা নিয়ে একাদিকবার গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হলেও প্রশাসনের সুনজরে পড়েনি আজোও।

স্থানীয়রা জানায়, এবছর কয়েক’শ কৃষকের প্রায় ৫ শতাধিক একর বোরো ফসল ক্ষতি হয়েছে।

কৃষক আব্দুল হান্নান জানান, প্রায় ২৫ কাটা (২৫০ শতক) জমিতে গাজী, হাইব্রিড ও দেশী জাতের ধান রোপন করেছিলেন। এর মধ্যে ২/৩ কাটা জমির ফসল কাটতে পেরেছেন তিনি। বাকি ক্ষেত তলিয়ে গেছে তাই কাটাও সম্ভব হবে না। 

তিনি আরো বলেন, শুধু তার নয় বহু মানুষে ক্ষেত পানির নিচে। এই গুলি ক্ষেত কাটার শ্রমিক পাওয়া যায় না। তাই তলিয়ে যাওয়া ওই গুলো ক্ষেতের আশা ছেড়ে দিয়েছে সবাই। গত বছরও এভাবে তাদের হারিয়েছে জানিয়ে হান্নান আরো বলেন, গত বছর কেই দেশীয় জাত ধানের বীজ রাখার ধানও পর্যন্ত কাটতে পারেননি। এবছর অন্য এলাকা থেকে দেশীয় জাতের ধানের বীজ সংগ্রহ করে রোপন করেছিলেন। এই বোরো মৌসুমে কোন কৃষি অফিসা এলাকায় আসতে দেখেননি হান্নান। এই বোরো মৌসুমে এলাকায় কোন কৃষি আসতে দেখেনি রোয়াইলবাড়ি ইউপির ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবেদ আলী ও সান্দিকোনা ইউপির ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মাছুয়াইল বিলপাড় বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা মনির খানসহ অনেকেই এ প্রতিবেদকে জানিয়েছেন।

রোয়াইলবাড়ি ১নং ওয়ার্ডে ইউপি সদস্য সুরুজ আলী বলেন, বিলের পানি নিস্কাশনের একমাত্র রঙ্গিখালী খালটি কাকিনা বিলের অংশটুকু ভরাট করে বোরো ফসলের ক্ষেত তৈরী করায় বোরো মৌসুমে খালের সাভাবিক পানি চলাচল একেবারে বন্ধ থাকে। তাই সামান্য বৃষ্টি হলে উজান থেকে নেমে আসা পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে বিলে বন্যা রূপ ধারণ করে। যার ফলে প্রতি বছর কৃষকরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এ বছর অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতেই বোরো ধানের বীজ বপন শুরু করেন তারা।

কিন্তু বীজতলায় অঙ্কুর গজাতেই নিন্মচাপের প্রভাবে সামান্য বৃষ্টিতে বীজতলা তলিয়ে নষ্ট হয় বীজতলা। পরে পুনরায় বীজ বপন করে বোরো ধান আবাদ করে কৃষকরা। গত বছর একমুঠ (একমুষ্ঠি) ধান ঘরে তুলতে পারেনি কেউ। বিষয়টি স্থানী সংসদ সদস্য, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও নির্বাহী অফিসারকে লিখিতভাবে জানিয়ে ছিলাম গত ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু ৫ মাসেও এই লিখিত আবেদনের কোন সাড়া পেলাম না।

সুরুজ আলী আরো জানান, পানি নিষ্কাশনের একমাত্র খালটি দখল মুক্ত করে খনন করে খনন করা হলে কৃষকরা প্রতি বছর এ ক্ষতির সম্মূখীন হতেন না। বিলটিতে হাজার হাজার মণ ধান উৎপাদন হতো। এতে সমাজ ও জাতির উপকার হতো। এলাকায় দায়িত্বরত কৃষি অফিসারকে চিনেন জানিয়ে সুরুজ আলী আরো বলেন, এই বোরো মৌসুমে এলাকায় কোন কৃষি অফিসার আসেনি।

এব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চন্দন কুমার মহাপাত্রের কাছে মুটোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন,তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। এলাকায় দ্বায়িত্বেরত কৃষি অফিসাগণ এলাকায় যায়নি কৃষকের এই অভিযোগের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন,দুইজন উপসহকারী দ্বায়িত্বে আছেন এবং তারা প্রতি নিয়তই এলাকায় যান।

এই বিলের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিয়ে ইউপি সদস্যের আবেদনের বিষয়টি জানতে চাইলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিরিন সুলতানা বলেন, বিষয়টি দেখতে আমি লোক পাঠাচ্ছি।

ট্যাগ: Banglanewspaper কেন্দুয়া