banglanewspaper

পৃথিবীতে নাকি ভাল মন্দ বলে কিছু নেই, মানুষের চিন্তা ভাবনা সেটাকে ভাল অথবা মন্দে পরিণত করে। আবার এ কথাও সত্যি পৃথিবীর সব মিথ্যা মিথ্যাই আর সত্য সত্যই, হোক না সে সত্য অথবা মিথ্যা খুব নগণ্য। পৃথিবীর সব অন্ধকার মিলেও এক ফোটা আলোকে গ্রাস করতে পারে না কারণ আলো আলোই আর অন্ধকার অন্ধকারই। আমাদের একটা সহজাত অভ্যাস হচ্ছে, সত্য মিথ্যা যাচাই না করে কোন কিছুকে ভাল কিংবা মন্দ বলে বিচার করে ফেলি। তার অনন্য একটি উদাহরণ হচ্ছে পুলিশ। পুলিশ সম্পর্কে ভাল বলেছে এমন লোক আমি খুব কমই দেখেছি হয়তো দেখিনি। যদিও পুলিশকে জনগনের বন্ধু বলা হয় কিন্তু বাস্তবে পুলিশ জনগনের কাছে এক ভয়ংকর আতঙ্কের নাম। আচ্ছা ধরে নিলাম পুলিশ খারাপ। হরহামেশায় পুলিশকে  জাতীয় ইস্যু করা হয় তাদের বিভিন্ন অপকর্মের জন্য কিন্তু খুব কমই পুলিশকে জাতীয় ইস্যু করা হয় তার ভাল কাজের জন্য। তাহলে কি ধরে নিব পুলিশ ভাল কাজ করে না? এটি একটি ধ্রুব সত্য মানুষ ভাল কাজের চেয়ে খারাপ কাজকেই বেশি মনে রাখে। আজকে আপনাদের একজন পুলিশের গল্প শুনাব.....

আমার গল্পটি পুলিশের সাবেক বিভাগীয় কমিশনার ও বর্তমানে র‍্যাবের ডিজি জনাব বেনজীর আহমেদকে নিয়ে। যাকে পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে চৌকস অফিসার মনে করা হয়। তখন সদ্য এস.পি হিসেবে কিশোরগঞ্জ জেলায় যোগদান করেছেন। সেই সময় বাংলাদেশে এসিড সন্ত্রাস ব্যাপক ভাবে বেড়ে গিয়েছিল। হঠাৎ একদিন তিনি খবরের কাগজে এমন একটি এসিড সন্ত্রাসের ঘটনা দেখতে পেলেন। তিনি মনস্থির করলেন স্বচক্ষে  এসিড আক্রান্ত মেয়েটিকে দেখতে যাবেন। সমস্যা হলো এসিড সন্ত্রাসের শিকার মেয়েটির বাড়ি খুবই প্রত্যন্ত এলাকায়। সেখানে যাওয়ার একমাত্র উপায় নৌকা। তবুও তিনি আক্রান্ত মেয়েটিকে দেখতে যাবেন বলে স্থির করলেন। যেই কথা সেই কাজ। ঐ থানার ওসিকে জানালেন তার আগমনের খবর। অবশেষে এসিড আক্রান্ত মেয়ের বাড়িতে গিয়ে যা দেখলেন তা দেখার জন্য তিনি মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। এসিড আক্রান্ত মেয়েটির চিকিৎসার অভাবে মুখে ও শরীরে পচন ধরেছে। তিনি মেয়েটির বাবাকে জিজ্ঞাসা করলেন মেয়েকে কেন চিকিৎসা করানো হয় নি?

মেয়ের বাবা উত্তর দিলেন তিনি সামান্য দিন মজুর, পরিবারের জন্য দুবেলা অন্ন জোগাড় করতে পারেন না তার মধ্যে মেয়ের চিকিৎসা করাবেন কোথা থেকে? 

এই কথা শুনে তিনি তার সাথে থাকা ২ হাজারের মত টাকা ছিল তা মেয়ের বাবার হাতে দিলেন। এ সময় ওসি তার সাথে থাকা হাজার খানেক টাকাও মেয়ের বাবার হাতে দিলেন। তা দেখে তাদের সাথে  থাকা কয়েকজন কনস্টেবল ও তাদের পকেটে যত টাকা ছিল তা দিয়ে দিলেন। 

টাকা পেয়ে মেয়ের বাবা মেয়েকে কিশোরগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করালেন। এর বেশ কয়েকদিন পর কিশোরগঞ্জে এক মন্ত্রী গিয়েছিলেন, বেনজীর আহমেদ তার প্রটোকলের দায়িত্ব শেষে সেই এসিড আক্রান্ত মেয়েটিকে দেখার জন্য হাসপাতালে গেলেন। দেখলেন মেয়ের অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। তিনি কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে জানালেন এখানে এই মেয়ের চিকিৎসা সম্ভব নয়। এখানে শুধু রোগীর মুখের ও শরীরের পচন রোধ করা যাবে, ভাল চিকিৎসার জন্য রোগীকে ঢাকা নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন ডাক্তাররা। 

ঢাকায় নিয়ে যাওয়া মানে তো আবার সেই টাকার প্রশ্ন তাই তিনি মেয়ের বাবাকে পরদিন তার অফিসে দেখা করত বলেন। পরদিন তিনি মেয়ের বাবাকে ডিসি অফিস এবং তার কার্যালয়ের ফান্ড থেকে কয়েক হাজার টাকা দিয়ে আক্রান্ত মেয়েকে ঢাকা পাঠালেন। 

অবশেষে ঢাকায় সুচিকিৎসা শেষে মেয়েটি সুস্থ্য হয়। সুস্থ্য হয়ে মেয়েটি তার বাবাকে বলল, “বাড়ি যাওয়ার আগে আমি আমার বাবার সাথে দেখা করতে চাই।” মেয়েটি আরও বলে তুমি তো আমার জন্মদাতা মাত্র আমার আসল বাবা হলেন তিনি যার জন্য আজকে আমি নতুন জীবন পেলাম। 

তারপর আরও অনেক দিন কেটে গেল। একদিন সেই মেয়েটির বাবা বেনজীর আহমেদের সাথে দেখা করতে আসলেন। যদিও নিরাপত্তা কর্মীরা তাকে ভিতরে ঢুকতে দেয়নি। বেনজীর আহমেদের একটি অভ্যাস ছিল তিনি হুটহাট তার কার্যালয়ের নিচে নামতেন এবং লক্ষ্য করতেন এমন কেউ কি আছে যে কিনা তার সাথে দখা করতে চায় কিন্তু নিরাপত্তা কর্মীরা তাকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। 

ঐ দিন তিনি একটি লোককে দেখতে পেলেন যে কিনা তার সাথে দেখা করতে এসেছেন কিন্তু ভিতরে ঢুকতে পারছেন না। মেয়ের বাবা তাকে দেখে দাড়ালেন, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি লোকটিকে চিনতে পারলেন। ঐদিন সেই দিন মজুর বাবা তার জন্য কিছু পিঠা নিয়ে এসেছিলেন। বেনজীর আহমেদ কিছুটা রাগ করলেন এবং বললেন এগুলো নিয়ে আসার কি দরকার ছিল? আপনি গরীব মানুষ এই পিঠা গুলো আপনার সন্তানদের খাওয়াতে পারতেন, সরকার আমাকে অনেক টাকা বেতন দেয় আর আল্লাহ পাকের রহমতে আমি ভালো আছি। কিন্তু মেয়ের বাবা ছিলেন নাছোড়বান্দা তাই বাধ্য হয়েই পিঠা গুলো রাখতে হয়। এভাবে মাঝে মধ্যে শত নিষেধ উপেক্ষা করে মেয়ের বাবা বিভিন্ন সময় চাল, পিঠা, নারকেল ইত্যাদি নিয়ে চলে আসতেন। 

অবশেষে একদিন বেনজীর আহমেদের বদলির অর্ডার হয়ে যায়। যে দিন তিনি কিশোরগঞ্জ থেকে বদলি হয়ে চলে যাচ্ছিলেন সেই দিনও দিনমজুর বাবা অল্প চাল নিয়ে এসেছিলেন। ঐ দিন বেনজীর আহমেদের স্ত্রী ঐ দিনমজুর লোকটিকে বকাঝকা করতে  নিষেধ করেছিলেন এবং চালগুলো রাখতে বলেছিলেন। কারণ এই উপহার শুধু উপহার নয় এর মধ্যে ছিল কৃতজ্ঞতা মিশানো অকৃত্রিম ভালবাসা। 

বেনজীর আহমেদ এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, “জীবনে পাঁচবার রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছি কিন্তু সেই দিনমজুর বাবার ভালবাসার কাছে এই পাঁচ বারের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার খুবই নগন্য।”  

এতক্ষণ যে মানুষটির গল্প বললাম তিনিও  একজন পুলিশ। জানি তার এই দায়িত্ববোধ, বিনয় আর ভালবাসার কথা কোনদিন কোন পত্রিকায় আসবেনা,  হয়ত কেউ এই গল্প  শুনতেও পারবেনা। আগে আমিও পুলিশকে অপছন্দ করতাম কিন্তু এখন আমিও একজন পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখি একজন বেনজীর আহমেদ হওয়ার…….। 

 

লেখক,

আশরাফুল আলম
৩৬ তম বিসিএস ক্যাডার [সাধারণ শিক্ষা]। 

 

 

 

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: banglanewspaper আলোর পথ আলো