banglanewspaper

আলফাজ সরকার আকাশ, শ্রীপুর (গাজীপুর): “ছেলে আমার মস্ত বড়, মস্ত অফিসার-মস্ত ফ্লেটে যায়না দেখা এপার-ওপার,নানান রকম জিনিস ও আসবা দামি দামি, সবচেয়ে কমদামি ছিলাম একমাত্র আমি, ছেলে আমার আমার প্রতি অগাত সম্ভ্রম, আমারও ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম.........নচিকেতার এ গানে হয়তো নিঃস্ব বাবা বৃদ্ধাশ্রম পেয়েছে কিন্তু এখানে এক বাবার ভাগ্যে মিলেছে গৃহপালিত হাঁস-মুরগীর থাকার ঘরটি। তিন ফিট-চার ফিটের একটি ঘর। যেখানে থাকার কথাছিল গৃহপালিত হাঁস-মুরগীর। কিন্তু ভাগ্য বিড়ম্বনায় সেই ঘরটিতে স্থান হয়েছে সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ শুক্কুর আলী’র। নিয়তীকে মেনেই নিয়েছিলেন, জীবনের আর যে কদিনই বেঁচে আছেন কস্ট করে হলেও রাত কাটাবেন ওই ছোট্ট ঘরেই।

কিন্তু ক্ষুধা তো আর মনে কথা বুঝে না। ক্ষুধার জ্বালায় খাবার চাইলেই মিলতো শারিরীক নির্যাতন আর তা করত ছেলের বৌ ও তাঁর পুত্র। গত শনিবার (০৫মে) দুপুরে খাবার চাওয়ায় ছেলে, ছেলের বউয়ের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন এ বৃদ্ধ। নির্যাতনের এক পর্যায়ে বৃদ্ধের মাথা ফেটে যায়। রক্তে ভেসে যায় বাড়ির পুরো আঙ্গিনা। এ ঘটনায় বৃদ্ধকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়ির একটি ঘরে গতকাল থেকেই আটকে রাখা হয়, যাতে কেউ এ ঘটনা সম্পর্কে কিছু না জানতে পারে।

অবশেষে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা এঘটনার সংবাদ পেয়ে রবিবার দুপুরে বৃদ্ধের বাড়ীতে উপস্থিত হলে ছেলে ও ছেলের বউ পালিয়ে যায়। গত শনিবার ঘটনাটি ঘটে শ্রীপুর পৌর শহরের কেওয়া পূর্ব খন্ড (কলিম উদ্দিন চেয়ারম্যান মোড়) গ্রামে।

ছেলে বউয়ের হাতে নির্যাতনের শিকার শুক্কুর আলী (৭০) স্থানীয় ইউসুফ আলীর ছেলে। অভিযুক্ত শামসুন্নাহার তাঁর একমাত্র ছেলে আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী।

শুক্কুর আলী জানান, তিনি তাঁর একমাত্র পুত্র আনোয়ার হোসেন, পুত্রবধূ ও নাতনীকে নিয়ে এবাড়ীতে বসবাস করে আসছিলেন। গত একবছর আগে ছেলে আনোয়ার হোসেন জোর করে তাঁর কাছ থেকে সমস্ত জমিজমা লিখে নেন। এরপর থেকেই শুরু হয়েছে তাঁর উপর অত্যাচার। ছেলের বউয়ের অত্যাচারে টিকতে না পেরে গত তিন মাস আগে তাঁর স্ত্রী এক মেয়ের বাড়ীতে আশ্রয় নেয়। তাদের হাঁসমুরগী থাকার ঘরে গত ছয়মাস আগে থেকে তাকে আশ্রয় দেয়া হয়। যেখানে রাতে  বৃষ্টি ও মশার কামড় উপেক্ষা করে তাকে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে কিছু চাইলেই তার উপর নেমে আসতো অমানুষিক নির্যাতন। গত শনিবার দুপুর তিনটা পেরিয়ে গেলে তাকে খাবার না দেয়ায় তিনি নিজের খুপরি থেকে বের হয়ে ছেলের ঘরে সামনে এসে খাবার চান। এ অপরাধে বৃদ্ধ শ্বশুরের উপর লাঠি দিয়ে নির্যাতন শুরু করেন ছেলের বৌ।

এরই একপর্যায়ে ছেলে আনোয়ার হোসেনও এসে যোগদেয়। লাথি দিয়ে ছেলে তাকে মাটিতে ফেলে দেয়, ছেলের বউ লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে। পরে ঘরে থাকা দড়ি দিয়ে তাকে বেঁধে ঘরে ঝুলানোর প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু মাথা ফেটে অতিরিক্ত রক্ত বের হওয়ায় পরে তাকে আর ঝুলাননি তাঁরা। এদিকে এঘটনায় তিনি চিৎকার চেচামেচি শুরু করলে তাকে একটি ঘরে নিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখে। পরে গভীর রাতে বাড়ীতে এক পল্লী চিকিৎসক এনে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। এসময় তাঁর মাথায় ৫টি সেলাই দেয়া হয়। ঘটনার পরপরই তাঁর ছেলে ও ছেলের বউ এঘটনা সম্পর্কে কাউকে কিছু না বলার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন।

বৃদ্ধ শুক্কর আলীর কন্যা মাজেদা বেগম জানান, তাঁর বাড়ী বাবার বাড়ীর পাশে হওয়ায় স্থানীয় একজনের মাধ্যমে রবিবার সকালে এখবর শুনতে পান। পরে সকালে বাড়ীতে আসলে তাঁর বাবাকে তালাবদ্ধ ঘরে দেখতে পান। এসময় তাঁর ভাই জানান পা পিছলে তার বাবার মাথা ফেটে গেছে। পরে সে প্রতিবাদ করলে তাকে বাড়ি থেকে বের করে মুল ফটকে তালা দিয়ে দেন তাঁর ভাই।

স্থানীয় এক প্রতিবেশী জানান, প্রায় সময়ই আনোয়ার হোসেন তাঁর বাবার উপর অত্যাচার করতো। তাঁদের কথা আনোয়ার শুনতো না। বিভিন্ন সময়ে বৃদ্ধের চিৎকারে আশপাশের লোকজন জমে যেত। স্থানীয়ভাবে চেষ্টা করেও এর সমাধান করা যায়নি।

তবে বৃদ্ধের ছেলে আনোয়ার হোসেনের মুঠোফোনে একাধিক বার ফোন করা হলে তার স্ত্রী শামসুন্নাহার রিসিব করে তাঁর শশুরের উপর নির্যাতনের কথা অস্বীকার করে জানান, তাঁর শশুর পা পিছলে বাড়ির আঙিনায় পড়ে গেলে তাঁর মাথা ফেটে যায়। বাড়ীতে ভাড়াটিয়ার চাহিদা বেশি থাকায় শশুরকে ঐ ঘরে (গৃহপালিত হাঁস-মুরগীর থাকার ) আপাতত থাকতে দেন বলে জানায় সে।এ ছাড়াও এটা পারিবারিক বিষয় বিকেলে স্থানীয়রা বসে এটার সমাধান করে দিবেন।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান জানান, এ ঘটনা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত পুলিশকে কেউ অবহিত করেনি। তবে সংবাদ পাওয়া মাত্রই একজন পুলিশ অফিসার ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে।

ট্যাগ: banglanewspaper শ্রীপুর