banglanewspaper

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি: চলতি বছর রাজস্ব আয়ে রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতাল। গত ৫ বছরে এ হাসপাতালে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ বেড়েছে ৩ কোটি টাকা থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকা। পাশাপাশি প্রাচীন এ হাসপাতালকে আধুনিক করা, সুচিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা নিশ্চিতসহ ইতিবাচক পরিবর্তন এনে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করে সব মহলেই প্রশংসিত হয়েছেন এ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন আহমেদ। 

পরিবর্তনের এমন পালায় ক্ষুব্ধ হয়েই ‘রোগী দরদী’ এ হাসপাতাল পরিচালককে বিতর্কিত করতে সক্রিয় হয়ে ওঠেছে একটি বিশেষ চক্র। এ চক্রটি আউটসোর্সিং, যন্ত্রপাতি কেনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কথিত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন। 

হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, ছলে-বলে কৌশলে হাসপাতাল পরিচালকের গায়ে দুর্নীতির কলঙ্ক তিলক এঁটে দিতেই ভেতরে-প্রকাশ্যে সোচ্চার হয়ে ওঠেছে ওই চক্রটি। মূলত হাসপাতালে শতভাগ ওষুধ সুবিধা নিশ্চিত হওয়া, আগের চেয়ে রোগীর পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, ফার্মেসী ও ক্লিনিক মালিকদের ব্যবসায় ধ্বস নামাসহ ইত্যাকার কারণে অনেক দিন যাবতই হাসপাতাল পরিচালকের ওপর ক্ষুব্ধ তাঁরা। 

সূত্র মতে, ওইসব ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে ওই চক্রটি হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিনকে পুনরায় বদলী করতেই নানামুখী প্রপাগান্ডা চালিয়ে আসছেন। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে নামে-বেনামে চিঠি দিয়ে হাসপাতাল পরিচালকের সুনামহানি করে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে তাকে নাজেহাল করার অপপ্রয়াস নিয়েছে। 

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০১৫ সাল থেকে এ হাসপাতালে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ অস্থায়ী ও বেসরকারিভাবে চুক্তিভিত্তিক জনবল নিয়োগ করা হয়। সেই সময় এখানে মাত্র ১২৮ জন আউটসোর্সিং কর্মী ছিলেন। ওই সময় বৈধ কোন চুক্তিনামা ছিল না। কথিত দুর্বল সেই চুক্তিনামায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা ঠিকাদারদের কোন স্বাক্ষর ছিল না। 

৫ থেকে ৬ বছর যাবত একই চুক্তিনামায় কাজ চলছিল। ওই সময় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হলেও কেউ কোন কথা বলেনি। ওই সময় মাত্র ৪ জন ওয়ার্ড বয়, ১৩ জন নিরাপত্তা প্রহরী ও ১২০ জনের মতো পরিচ্ছন্নতা কর্মী হাসপাতালের বেতনভুক্ত ছিলেন।  

সূত্র মতে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন আহমেদ যোগ দেয়ার পর সরকারি নিয়ম মেনে ২০১৬ সালের মার্চ মাসের দিকে আউটসোর্সিং চালু করেন। প্রথমে সরকারিভাবে ৭৩ জনকে চুক্তিভিত্তিক জনবল নিয়োগ দেয়া হয়। 

এ ৭৩ জনের বেতন দিয়ে সেই সময়ে কমপক্ষে আরো ৭৭ জনের বেতনের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতি কর্মীকে ৭ হাজার টাকা করে বেতন দেয়া হয়। হাসপাতালের রক্ষণাবেক্ষণ ফান্ড থেকে তাদের এ টাকা দেয়া হয়। 

সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে এসে হাসপাতালের সকল বিভাগের চাহিদা হিসেব করে ২৫০ জনের মতো জনবল নিয়োগ করা হয়। হাসপাতালের নিরাপত্তার জন্য ৭০ জন আনসার সদস্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে আউটসোর্সিং থেকে ২০ জন আনসারকে মাসিক ১৫ হাজার টাকা করে বেতনের ব্যবস্থা করা হয়। একই সঙ্গে তাদের ঈদ বোনাস ও অন্যান্য সরকারি ভাতাও প্রদান করা হয়। 

একই সূত্র জানায়, হাসপাতালের ৪০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে প্রতি মাসে ১২ হাজার টাকা করে বেতন দেয়া হচ্ছে। এছাড়া ১৩ জন অন্যান্য কর্মী ১৪ হাজার ৯০০ টাকা করে বেতন পাচ্ছেন। বাকী ৩’শ পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে ৬ হাজার টাকা করে বেতন দেয়া হয়। হাসপাতালের নিজস্ব ফান্ড থেকে ৭০ জনের বেতন এবং আরো ৭০ জনের বেতনের অংশ বিশেষ হাসপাতাল ও ক্লিনিং সার্ভিস (৬ হাজার টাকা প্রতিজন) থেকে দেয়া হচ্ছে। সব টেকনেশিয়ানদের বেতন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই বহন করছে।  

হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, দিন-রাত ২৪ ঘন্টা হাসপাতালে সব ধরণের রোগীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে মাস ছয় আগে চালু হওয়া ওয়ান স্টপ সার্ভিসে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ১৪ জন চিকিৎসককে। টেকনেশিয়ান ও সাপোর্ট স্টাফদের প্রত্যেককে ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা করে বেতন দেয়া হয়। একজন চিকিৎসকে ৬০ হাজার এবং বাকী চিকিৎসকদের ২০ হাজার টাকা করে এ মাস থেকে বেতন দেয়া হবে। 
এক্ষেত্রে হাসপাতালের নিজস্ব রক্ষণাবেক্ষণ ফান্ড থেকে ১৪ জন ডাক্তার ও ১৪০ জন কর্মচারী (টেকনিশিয়ান ও সাপোর্ট স্টাফ) প্রায় ৮ লাখ টাকার মতো বেতন দেয়া হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওয়ান স্টপ সার্ভিসের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার থেকে ১০ পার্সেন্ট রক্ষণাবেক্ষণ চার্জ কেটে রাখছে বেতন ও রিএজেন্ট বাবদ। এটি হাসপাতালের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন ক্রমেই করা হচ্ছে। 

দায়িত্বশীল ওই সূত্রটি জানায়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথম দুই থেকে তিন মাস বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে ৩০ পার্সেন্টের মতো টাকা নিয়েছে। তবে এ থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়েই ৪৮ লাখ টাকায় তিনটি আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন কেনা হয়েছে। দু’টি সিআর মেশিনকে ডিজিটাল এক্সরে মেশিনে রূপান্তরিত করতে চারটি ফ্ল্যাট প্যানেল ডিটেক্টর ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা হয়েছে। আর এটি কেনা হয়েছে চুক্তিতে। ইতোমধ্যে ১৬ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বাকী টাকা আরো ৮ কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে। 

সূত্র মতে, ওই টাকাতেই চারটি বায়োকেমেস্ট্রি এনালাইজার প্রতিটি ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা করে কেনা হয়েছে। এছাড়া ছোটখাটো আরো অনেক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে বিধি মেনে, কমিটি ও নোটশিটের মাধ্যমে। সার্ভে কমিটির মাধ্যমে প্রতিটির অডিটও করা হয়েছে। 

দুর্নীতি ও অনিয়ম সংক্রান্ত মহল বিশেষের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘যদি কেউ এক টাকাও আতœসাতের প্রমাণ করতে পারে তবে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড নিতেও প্রস্তুত রয়েছি।’  

তিনি বলেন, কোন দুর্নীতি থাকলে সুনির্দিষ্টভাবে আমাদেরকে জানাতে হবে। আজগুবি অপপ্রচার চালিয়ে হাসপাতালের সুষ্ঠু সেবার পরিবেশ বিঘ্নিত করা কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়।’ 

সরেজমিনে দেখা গেছে, এক সময় এ হাসপাতালটির প্রবেশপথের নামকাওয়াস্তে সাইনবোর্ড ছিল। এখন সেখানে স্থাপন করা হয়েছে ইলেকট্ট্রনিক সাইনবোর্ড। ছিল না সীমনা প্রাচীর। এখন সীমনা প্রাচীরের ওপরে জ্বলছে লাইট। হাসপাতালের ইলেকট্রনিক সাইনবোর্ডে ভেসে ওঠছে নিয়ম-কানুন ও করণীয়। 

বাইরে থেকে এখন এ হাসপাতালটি আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন। ভেতরেও লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। হাসপাতালের সামনে রয়েছে সুদৃশ্য বাগান। প্রশস্তকরণ করা হয়েছে ফুটপাত। সড়ক হয়েছে। আনসার সদস্যদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দৃশ্যমান এসব পরিবর্তনের জন্য যাবতীয় খরচাদি করা হয়েছে হাসপাতালের নিজস্ব তহবিল থেকেই। এছাড়া জরুরি বিভাগ তো বটেই হাসপাতালের প্রতিটি দেয়ালে সাঁটানো হয়েছে ‘সরকারি শতভাগ ওষুধ প্রদান করা হচ্ছে।’ 

খোঁজ খবর নিয়ে দেখা গেছে, এ হাসপাতালের আমুল পরিবর্তন ও সেবার মান বৃদ্ধি পাওয়ায় রোগীর চাপ বেড়েছে। ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোণা, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ তো বটেই সিলেট, সুনামগঞ্জ, রংপুর, গাজীপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রোগীরা এ হাসপাতালে ভিড় করছেন। আগে এ হাসপাতালে গড়ে ১ হাজার ৩’শ থেকে ১ হাজার ৫’শ জন রোগী ভর্তি থাকতো। এখন ২ হাজার ৫’শ থেকে ২ হাজার ৭’শ রোগী ভর্তি হচ্ছে। 

আউটডোরে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ হাজার রোগী আসছে। জরুরি বিভাগের ওয়ান স্টপে আসছে ৪’শ থেকে ৫’শ রোগী। সব মিলিয়ে হাসপাতাল চত্বরে প্রতিদিন ২০ হাজারের বেশি মানুষ অবস্থান করছে। 

হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন গাজীপুর থেকে আসা রোগী রহিমা খাতুন (৫০) বলেন, দুই বছর আগেও এ হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। তখন অপরিস্কার-অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা পরিবেশ ছিল। এখন সবকিছুতেই পরিপাটি ভাব। কোন দুর্গন্ধ নেই। চিকিৎসকরাও আগের চেয়ে অনেক বেশি মানবিক আচরণ করছেন।’ 

হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবন সূত্র জানায়, গত ৫ বছরে এ হাসপাতালে রাজস্ব আয়ের পরিমাণও বেড়েছে। ২০১২-১৩ সালে এ হাসপাতালের রাজস্ব আয় ছিল ৩ কোটি টাকা, ২০১৪-১৫ সালে ৪ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ সালে ৬ কোটি টাকা,  ২০১৬-১৭ সালে ৮ কোটি টাকা এবং ২০১৭-১৮ সালে ১২ কোটি টাকার মতো রাজস্ব আয় হবে। 

হাসপাতালটির প্রশাসনিক ভবনের এক কর্মকর্তা অনুযোগের সুরে বলেন, বর্তমান পরিচালককে দুর্নীতিবাজ প্রমাণ করতে একটি বিশেষ মহল খিস্তিখেউর করে বেড়াচ্ছে। তাঁরা প্রচার করছে গত কয়েক বছরে ১৫ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। কোন হাসপাতালে যদি ১৫ কোটি টাকার দুর্নীতি হয় তাহলে ১২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয় কীভাবে? 

ওই কর্মকর্তাসহ একাধিক কর্মকর্তা বলেন, হাসপাতাল পরিচালক পদে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন দায়িত্ব নেয়ার পর হাসপাতালে রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত শতভাগ সরকারি ওষুধ দেয়া হচ্ছে। এতে করে বেশিরভাগ ফার্মেসীর ব্যবসাই লাটে উঠেছে। রোগীরা ঠিকমতো চিকিৎসা সেবা পাওয়ায় অনেক ক্লিনিক মালিকের ব্যবসাতেও ‘লাল বাতি’ জ্বলেছে। ফলে তারা মহল বিশেষকে ‘হাত’ করেই পরিচালকের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। 

সূত্র মতে, হাসপাতালটিতে দীর্ঘদিনের সব সিন্ডিকেট পরিচালক ভেঙে দিয়েছেন। আগে রোগীদের জন্য সরবরাহকৃত খাবার উচ্চ মূল্যে ক্রয় করতে হতো ঠিকাদারকে। ফলে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হতো রোগীদের। বেশিরভাগ রোগীই ঠিকমতো খাবার পেতো না।  ওই সময় এ নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা ছিল। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন হাসপাতালের পরিচালক পদে দায়িত্ব নিয়ে এ মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়ে সফল হন। 

হাসপাতালের সিসিইউ ইউনিটে চিকিৎসাধীন শফিকুল ইসলাম নামে এক রোগী বলেন, এক সময় খাবার মুখে নেয়ার জো ছিল না। এখন সেই অবস্থা নেই। হাসপাতালের খাবারের মান যেমন উন্নত হয়েছে তেমনি তিন বেলাই মানসম্মত খাবার পাচ্ছি।’

ট্যাগ: banglanewspaper মমেক হাসপাতাল