banglanewspaper

‌‍‍‍‌‌‌আলম সাইফ: “এখানকার প্রকৃতির সঙ্গে সেই আমার একটি মানসিক ঘরকন্যার সম্পর্ক। জীবনের যে গভীরতম অংশ সর্বদা মৌন এবং সর্বদা গুপ্ত, সেই অংশটি আস্তে আস্তে বের হয়ে এসে এখানকার অনাবৃত সন্ধ্যা এবং অনাবৃত মধ্যাহ্নের মধ্যে নীরবে এবং নির্ভয়ে সঞ্চরণ করে বেরিয়েছে;এখানকার দিনগুলো তার সেই অনেক দিনের পদচিহ্নের দ্বারা যেন অঙ্কিত।‌” রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’ গ্রন্থের একটি চিঠির অংশ। কথাগুলো রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ বসে তাঁর ভাইঝি ইন্দিরা দেবীকে লিখেছিলেন।

বস্তুত রবীন্দ্রনাথের বিশ্বকবি ‘হয়ে ওঠা’র পেছনে যে জায়গাটির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি তার নাম শিলাইদহ। তাইতো স্থানটিকে বলা হয়, রবিতীর্থ শিলাইদহ। আর এর প্রমাণ পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রের সংকলন ‘ছিন্নপত্র’ গ্রন্থে। কবির জীবদ্দশায় তাঁর ১৫৩টি চিঠিপত্র নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘ছিন্নপত্র’ গ্রন্থ। এই গ্রন্থের বাংলাদেশ অংশের ১১০ টি চিঠির মধ্যে ৬০ চিঠিই শিলাইদহ হতে লেখা। শিলাইদহ অংশের এই চিঠিগুলির সাহিত্যিক এবং ঐতিহাসিক মুল্য পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় শিলাইদহ রবীন্দ্রনাথের জীবনে কতবড় প্রভাব ফেলেছিল। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষ জীবনে (১৯৪০ সালে) শিলাইদহ সম্পর্কে বলেন, “‌আমার যৌবনের ও প্রৌঢ় বয়সের সাহিত্য–রস-সাধনায় তীর্থস্থান ছিল পদ্মা প্রবাহ চুম্বিত শিলাইদহ পল্লীতে।...সেই পল্লীর স্নিগ্ধ আমন্ত্রণ সরস হয়ে আছে আজও আমার নিভৃত স্মৃতিলোকে।‍‍‌‌"

কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ বলেছেন, “আমার ধারণা, বাবার গদ্য ও পদ্য দু’রকম লেখার উৎসই যেন খুলে গিয়েছিল শিলাইদহে। এমন আর কোথাও হয়নি। এই সময় তিনি অনর্গল কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প লিখে গেছেন-একদিনের জন্যও কলম বন্ধ হয়নি।‌’’
রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী, মানস সুন্দরী, উর্বশী, চিত্রা, ক্ষণিকা, গীতাঞ্জলী ও গীতিমাল্যের অনেক কবিতা ও গানই শিলাইদহে রচিত হয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের জমিদারি ছিল উত্তরবঙ্গে। এই জমিদারি রাজশাহী জেলার (বর্তমান নওগাঁ) পতিসর (কালীগ্রাম), পাবনা জেলার শাহজাদপুর, নদীয়া (বর্তমান কুষ্টিয়া) জেলার শিলাইদহ। এই বিস্তৃত জমিদারির মধ্যে শুধু শিলাইদহেই পাকা কুঠিবাড়ি ছিল। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯১ সালে জমিদারি পরিচালনার ভার নেন। তখন থেকে তিনি এই অঞ্চলেই থাকতেন। জমিদারি দেখার জন্য তিনি তিন জেলায় ঘুরে বেড়াতেন- কিন্তু পরিবার নিয়ে বাস করতেন শিলাইদহে। কারণ শাহজাদপুর বা পতিসরে কবির বাসযোগ্য এরকম সুরম্য রুচিসম্মত ভবন ছিল না। পদ্মা–গড়াই তীরবর্তী এই কুঠিবাড়িটি রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত প্রিয় ছিল।

রবীন্দ্র-সাহিত্যকীর্তির শ্রেষ্ঠ অংশ শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে, পদ্মা ও গড়াই নদীর বক্ষে রচিত হয়েছে। কবির প্রথম যৌবনের ছোটগল্পের জন্মস্থান শিলাইদহ । গল্পগুচ্ছের অধিকাংশ গল্পের মাল-মসলা তিনি পান শিলাইদহ হতে। কবি যখন শিলাইদহে আসেন তখন তাঁর পাঁচ পুত্র-কন্যা সবাই জীবিত। তাঁর দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে মধুময় সময় কাটে শিলাইদহে। তাঁর সাহিত্যের ও হৃদয় মনের বিকাশ ঘটে এই সময়ে। এখানেই তিনি বাউল সম্রাট লালন শাহ, কাঙাল হরিনাথ, গগন হরকরা, সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্যকর্মের সংস্পর্শে আসেন। কেউ কেউ লিখেছেন, লালন ফকিরের সাথে রবীন্দ্রনাথের দেখাশুনা ও আলাপ আলোচনা হত।

কুষ্টিয়া অঞ্চল বাউল রাজধনী নামেও অভিহিত। আর রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে এসে এ অঞ্চলের বাউল কবিদের সংস্পর্শে এসেছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায় – ‘আমার লেখা যারা পড়েছেন, তাঁরা জানেন বাউল পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখা সাক্ষাৎ ও আলাপ- আলোচনা হতো। আমার অনেক গানে আমি বহু সুর গ্রহন করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিনীর সাথে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বানী কোন এক সময় আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে, তখন আমার নবীন বয়স শিলাইদহ (কুস্টিয়া) অঞ্চলের এক বাউল একতারা হাতে বাজিয়ে গেয়েছিল –

‘কোথায় পাবো তাঁরে-আমার মনের মানুষ যেঁরে।

হারায়ে সেই মানুষে- তাঁর উদ্দেশ্যে

দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে ‘

(এই গানটি গেয়েছিল-ফকির লালন শাহের ভাবশিষ্য শিলাইদহ ডাকঘরের পোস্টমাস্টার গগন হরকরা। যার আসল নাম বাউল গগনচন্দ্র দাস।)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের ভাষায়, ‘ঐ বাউলের গানের কথা ও সুরের মাধুর্য আমাকে এতোই বিমোহিত করেছিলো যে, আমি সেই সুর ও ছন্দে

বাংলাদেশকে মাতৃরূপ জ্ঞানে লিখেছি –

‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি,

চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস

আমার প্রাণে বাঁজায় বাঁশি

রবীন্দ্রনাথের ছেলে রথীন্দ্রনাথ শিলাইদহের স্মৃতি সম্পর্কে বলেছেন, “শিলাইদহে আমরা যে পরিবেশের মধ্যে এসে বাস করতে লাগলাম কলকাতার পারিবারিক ও সামাজিক জীবনধারা থেকে তা সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের বাড়ী খোলা মাঠের মধ্যে; শিলাইদহের ঘাট থেকে বেশ খানিকটা দূরে। বাবা, মা ও আমরা পাঁচ ভাই বোন বাড়ীতে থাকি। আমার ছোট বোন রাণী ও মীরা আর ছোট ভাই শমী তখনো নিতান্ত শিশু। এই নির্জনতার মধ্যে দিদি (বেলা) আর আমি বাবা ও মাকে আরো কাছাকাছি পেলুম। বাবা তখন আমাদের দুজনকে লেখাপড়া শেখাবার জন্য বিশেষভাবে মনোযোগ দিলেন। বাবা নিজে ইস্কুল-কলেজে বিদ্যার্জন করেন নি।নিজের ছেলে-মেয়েদের ইস্কুলে পাঠাতে তাই গোড়া থেকেই তাঁর আপত্তি ছিল।‌ তাই বাড়ীতেই তিনি গৃহবিদ্যালয় বসালেন। জগদানন্দ রায়, হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়, সিলেট থেকে পণ্ডিত শিবধন বিদ্যার্ণব ও বিলেত থেকে ‘পাগলা সাহেব’ লরেন্স হলেন শিক্ষক। মূলতঃ শান্তিনিকেতনের গোড়াপত্তন এই শিলাইদহ কুঠিবাড়ীতেই। এখানে বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক জগদীশ চন্দ্র বসু , দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, প্রমথ চৌধুরী, কাব্যরসিক লোকেন্দ্রনাথ পালিত, নাটোরের মহারাজ ও সাহিত্যিক জগদিন্দ্রনাথ রায়, দার্শনিক দ্বিজেন্দ্রনাথ ,ভারতের প্রথম সিভিলিয়ান সত্যেন্দ্রনাথ, লেখক জ্যোতিরিন্দ্রনাথ প্রমুখ মনীষী ঘন ঘন শিলাইদহে আসতেন।

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে প্রেরণা ও উৎসাহ উদ্দীপনার অন্যতম প্রধান উৎস ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার বাংলা’ এবং অন্যান্য স্বদেশি সংগীত মুক্তিযুদ্ধের সংগীতে পরিণত হয়েছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রবীন্দ্রনাথকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা গানটি তিনি বরাবরই মনে প্রাণে ভালবাসতেন। এ প্রসঙ্গে আমরা বিখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী সনজীদা খাতুনের স্মৃতিচারণমূলক একটি লেখার উদাহরণ দিতে পারি।

 পঞ্চাশ দশকে একবার- আমার খুব ভাল করে মনে আছে; কার্জন হলে একটা অনুষ্ঠান হচ্ছিলো৷ আমাকে গান গাইতে বলা হয়েছিল৷ আমি খুব বিস্মিত হয়ে গেলাম গান গাইতে৷ কী গান গাইবো? এমন সময় দেখা গেল সেখানে বঙ্গবন্ধু৷ তখন তো তাঁকে কেউ বঙ্গবন্ধু বলে না - শেখ মুজিবুর রহমান৷ তিনি লোক দিয়ে আমাকে বলে পাঠালেন আমি যেন ‘সোনার বাংলা' গানটা গাই - ‘আমার সোনার বাংলা'৷ আমি খুব ঘাবড়ে গেলাম৷ এত লম্বা একটা গান৷ তখন তো আর এটা জাতীয় সংগীত নয়৷ পুরো গানটা আমি কেমন করে শোনাবো? আমি তখন চেষ্টা করে গীতবিতান সংগ্রহ করে সে গান গেয়েছিলাম কোনমতে৷ জানিনা কতটা শুদ্ধ গেয়েছিলাম৷ কিন্তু তিনি এইভাবে গান শুনতে চাওয়ার একটা কারণ ছিল৷ তিনি যে অনুষ্ঠান করছিলেন, সেখানে পাকিস্তানিরাও ছিল৷ তিনি দেখাতে চেষ্টা করছিলেন তাদেরকে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি' কথাটা আমরা কত সুন্দর করে উচ্চারণ করি৷ এই সমস্ত গানটার ভিতরে যে অনুভূতি সেটা তিনি তাদের কাছে পৌঁছাবার চেষ্টা করেছিলেন৷ এবং আমার তো মনে হয় তখনই তাঁর মনে বোধহয় এটাকে জাতীয় সংগীত করবার কথা মনে এসেছিল৷”

তাই আমার সোনার বাংলা যতদিন থাকবে আমাদের জাতীয় সংগীত ততদিন শিলাইদহের নাম বাঙালি জাতির জাতির হৃদয়ে দেদীপ্যমান থাকবে।

বিখ্যাত সাহিত্যিক মৈত্রেয়ী দেবী তাঁর শিলাইদহ রচনায় বলেছেন, তিনি ১৯৭২ সালে রবীন্দ্রনাথের স্বহস্তলিখিত প্রসিদ্ধ কিছু গানের পাণ্ডুলিপি এবং তাঁর (রবীন্দ্রনাথের ) স্বাক্ষরিত একটি ফটোগ্রাফ এক সঙ্গে বাঁধিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেছিলেন। তখন বঙ্গবন্ধু তাঁকে বলেছিলেন, তিনি শিলাইদহে নব শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করবেন।

লেখক নেপাল মজুমদার তাঁর ‘শিলাইদহে দ্বিতীয় শান্তিনিকেতন’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন যে, বঙ্গবন্ধু শিলাইদহকে দ্বিতীয় শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন। 

মজুমদারের ভাষায়, “এটা শুধু মুজিবুর সাহেবের ব্যক্তিগত কথা নয়, সারা বাংলাদেশের মানুষের অন্তরের গোপন ইচ্ছার কথাই তিনি বলেছেন।‌“ 

যতদূর জানা যায়, বঙ্গবন্ধু বিশ্বভারতী ও শান্তিনিকেতনের আদর্শে শিলাইদহকে রবীন্দ্রসাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার সজীব প্রাণকেন্দ্ররূপে প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন। 

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, শাহজাদপুর ও পতিসর রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত হলেও নানাদিক দিয়ে শিলাইদহের স্থান সকলের ওপরে। এ কারণেই রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় ১৯৪০ সালে মার্চ মাসে শিলাইদহে আয়োজিত নিখিলবঙ্গ পল্লী সাহিত্য সম্মেলনে শিলাইদহকে পৃথিবীর কবি ও সাহিত্যিকদের ভবিষ্যৎ তীর্থস্থানরূপে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছিল। তিনদিন ব্যাপী ( ৯,১০,১১ই চৈত্র ১৩৪৬) এই অধিবেশনের বিবরণ ‘প্রবাসী’ ও ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়েছিল।

পরিশেষে, বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী কুষ্টিয়ায় অবস্থিত রবীন্দ্র স্মৃতি বিজড়িত শিলাইদহে শান্তিনিকেতনের আদর্শে একটি সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে বাস্তব রূপদান করবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।

লেখকঃ প্রকৃত নাম: শ.ম. সাইফুল আলম, উপপ্রকল্প পরিচালক , উচ্চ মাধ্যমিক উপবৃত্তি প্রকল্পে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: banglanewspaper শিলাইদহ