banglanewspaper

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার: ১৯৯৪ সালে তিন দিন বয়সী এক কন্যাশিশুকে বাজারে ফেলে গিয়েছিলেন চীনের এক দম্পত্তি। সে দেশে তৎকালীন এক সন্তান নীতিমালা দারিদ্র তাদের এটি করতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু শিশুটির সাথে তারা রেখে গিয়েছিলেন একটি চিঠি। তাতে লেখা ছিল হাংজু শহরের একটি ব্রীজের উপর কখন তারা অপেক্ষা করবেন। এ চিঠির জন্যই এত বছর পর কন্যা শিশুটি ফিরে পেল তার আসল বাবা-মাকে।

চীনে বহুদিন একসন্তান নীতিমালা বলবৎ ছিল, একটির বেশি সন্তান হলে দম্পতিদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হত। জোর পূর্বক গর্ভপাত, সন্তান নেওয়ার ক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়া অথবা জরিমানা করা হত। তাই দম্পতিরা ভয়ে একের অধিক সন্তান হয়ে গেলে তা গোপন করতেন। অথবা কোন উপায় না থাকলে সে সন্তানকে পরিত্যাগ করতেন। জন্মদাতা বাবা বলেন এমনটিই ছিল ১৯৯৪ সালে জন্ম নেওয়া কার্টি পওলারের বেলায়। সে জন্ম নিয়েছিল চীনের লিডা ও ফেংশিয়াং দম্পতির ঘরে।

একটি অনাথ আশ্রম থেকে কার্টিকে দত্তক নিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ডসন উইল শহরের ক্যান-রুত পওলার দম্পতি। শ্বেতাঙ্গ পরিবারে বড় হওয়া চীনা শিশুটি একদিন প্রশ্ন করল সে কোথা থেকে এল। তখন রুত পওলার তাকে জবাব দিতেন তুমি চীন দেশের এক নারীর গর্ভে জন্ম নিয়েছ। কিন্তু আমার হৃদয়ে তোমার জন্ম। কথাটি শুনেই সে খেলতে চলে গেল। মনে হয়েছিল জবাবে সে সন্তুষ্ট হয়েছিল। কিন্তুু সন্তুষ্ট হলেও কৌতুহল তার মিটেনি। জাগতে শুরু করল নিজের অতীত সম্পর্কে আরও বিভিন্ন প্রশ্ন।

যে অনাথ আশ্রম থেকে কার্টিকে দত্তক নিয়েছিলেন ক্যান ও রুত পওলার সেখান থেকেই দিয়েছিলেন সাদা কাগজে লেখা এক চিঠি। সেখানে লেখা ছিল ‘একটি সমস্যার কারণে আমরা তোমাকে ফেলে যাচ্ছি, ছোট্ট বাবু, তোমাকে রাস্তায় ফেলে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় ছিল না। তোমার মনের গভীরে কখনো যদি মা বাবার জন্য কোন অনুকম্পার জন্ম হয় তাহলে আজ থেকে দশ অথবা বিশ বছর পর হাংজু শহরের ভাঙ্গা ব্রীজটির উপরে এসো।’

হাংজু শহরে ভ্রমণ করছিল যুক্তরাষ্ট্রের ক্যান-রুত পওলার দম্পতি। ২০০৪ সাল থেকে প্রতি বছর ওই নির্দিষ্ট দিনে ব্রীজটির উপরে অপেক্ষা করতেন কার্টির বাবা। তিনি জানতেন তাতে কোন লাভ নেই। তবুও হতাশ না হয়ে তিনি অপেক্ষা করেই যেতেন। ভাবতেন যখন তার সঙ্গে দেখা হবে তখন তাকে তিনি কি বলতে পারেন। ওর কাছে যদি আমি হাজার বারও ক্ষমা চাই তা কি যতেষ্ট হবে? কার্টি যদি তাদের কঠিন ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করতে থাকে তা খন্ডন করবেন কিভাবে? সর্বপোরি কার্টি চোখে চোখ রাখতেই তো তাদের লজ্জা ও অপমান বোধ হবে। 

কিন্তু ঠিকই সময়মত কার্টির হাতে চিঠিটি দিয়েছেন তাকে দত্তক নেওয়া বাবা-মা। তার সূত্র ধরেই সে মিলিত হয়েছে তার আসল বাবা মায়ের সাথে। চিঠিটি দেওয়ার সময় পওলার তাকে বলল একটি জিনিস অনেক আগেই তোমাকে দেওয়া উচিত ছিল।

কার্টি বলেছে আমার আসল বাবা-মায়ের সাথে সাক্ষাত নিয়ে আমার ভয় ছিল। কারণ আমার সাক্ষাত যদি তাদের কোন ভাবে হতাশ করে। আমাকে রাস্তায় ফেলে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে হয়ত তারা প্রতিটি মূহুর্ত অপরাধবোধে ভুগেছে। আমি বুঝতে পারি তারা কতটা কষ্টের মাঝে জীবন কাটিয়েছে। সে কষ্টের অবশেষে বুঝি অবসান হলো।

হাংজু শহরের ব্রীজটি তখন আর ভাঙ্গা নেই । ২৩ বছর পর তার উপরই মিলিত হল কার্টি ও তার বাবা-মা।

লেখক: কবি, সাংবাদিক ও উপস্থাপক

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: banglanewspaper মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার